আসলে অধিনায়ক সেটাই করতে চেয়েছিল, আর সেটা করতে না পারায় সে এত বেশি দুঃখিত হয়েছে যে তার হচ্ছে হচ্ছে বুঝি সেই কাজটিই সে করতে পেরেছে। নাকি সত্যি সত্যি কি তাই ঘটেছিল। কী ঘটেছিল আর কী কী ঘটে নি–এই ডামাডোলের মধ্যে তা কি কেউ ঠিক ঠিক জানে?
সে আরো বলল, ভালো কথা ইয়োর এক্সেলেন্সি, আপনাকে জানাতে চাই যে, দলখভ নামক যে অফিসারটির পদাবনতি ঘটেছিল, আমার উপস্থিতিতেই সে একজন ফরাসি অফিসারকে বন্দি করে নিজেকে বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য করে তুলেছে।
প্রিন্স ব্যাগ্রেশন বৃদ্ধ কর্নেলের দিকে ঘুরে বলল : মহাশয়গণ, আপনাদের সকলকেই ধন্যবাদ, পদাতিক, অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ–সব সৈন্যই সাহসের পরিচয় রেখেছেন। কিন্তু ব্যূহের মাঝখানে দুটো কামান পরিত্যক্ত হল কেমন করে? যেন কোনো একজনের খোঁজ করেই সে প্রশ্নটা করল। তারপর কর্তব্যরত স্টাফ অফিসারের দিকে ফিরে বলল, মনে হচ্ছে আপনাকেই আমি পাঠিয়েছিলাম?
স্টাফ-অফিসার জবাব দিল, একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, অন্যটার কথা আমি জানি না। সারাক্ষণই আমি সেখানে দাঁড়িয়েই হুকুম জারি করছিলাম, আর সবেমাত্র স্থানত্যাগ করেছি… একথা ঠিক যে জায়গাটা তখন বেশ গরম হয়ে উঠেছিল, সে বিনীতভাবে যোগ করল।
একজন জানাল, ক্যাপ্টেন তুশিন গ্রামের কাছেই কোথাও রাত কাটিয়েছে, তাকে ডাকতে লোক গেছে।
প্রিন্স আন্দ্রুকে লক্ষ্য করে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন বলল, ওঃ, কিন্তু তুমি তো সেখানে ছিলে?
সকলেই চুপচাপ। দরজায় তুশিনকে দেখা গেল। ভীরু পায়ে সে অধিনায়কদের পিছন থেকে এগিয়ে এল। ঊর্ধ্বতন অফিসারদের সামনে সে সবসময়েই বিব্রত বোধ করে, এখনো তাই হল, খেয়ালের অভাবে পতাকা দণ্ডটাতে পায়ে মাড়িয়ে দিল। কয়েকজন হেসে উঠল।
যারা হাসল তাদের মধ্যে সব চাইতে উচ্চকণ্ঠ ছিল ঝেরকভ। যত না ক্যাপ্টেনের দিকে তার চাইতে বেশি যারা হেসেছিল তাদের দিকে ভুকুটি করে ব্যাগ্রেশন প্রশ্ন করল, একটা কামান পরিত্যক্ত হল কেমন করে?
কঠোর কর্তৃপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে দুটো কামান ফেলে এসেও এখনো বেঁচে থাকার অপরাধ ও লজ্জা এই প্রথম তুশিনের কাছে অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে দেখা দিল। সে এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল যে এ কথাটা এতক্ষণ তার মনেই পড়েনি। ব্যাগ্রেশনের সামনে দাঁড়িয়ে তার নিচের চোয়াল কাঁপতে লাগল, কোনোরকমে তো-তো করে বলল :
আমি জানি না… ইয়োর এক্সেলেন্সি… আমার সৈন্য ছিল না… ইয়োর এক্সেলেন্সি।
সাহায্যকারী সৈনিকদের ভিতর থেকে কয়েকজনকে তুমি নিতে পারতে।
সত্য হলেও এ কথাটা তুশিন বলতে পারল না যে সাহায্যকারী কোনো অফিসার বিপদে পড়ে যায়। ভুল করে স্কুলের ছাত্র যেভাবে পরীক্ষকের দিকে তাকায় তেমনিভাবে সে একদৃষ্টিতে ব্যাগ্রেশনের দিকে তাকিয়ে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ সকলেই চুপচাপ। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন কঠোর হতে চায়নি, তারও আর কিছু বলার ছিল না, অন্য কেউ কিছু বলতে সাহস করল না। প্রিন্স আন্দ্রু ভুরুর নিচে দিয়ে তুশিনের দিকে তাকাল, তার আঙুলগুলো আপনা থেকেই কুঁকড়ে আসছে।
সেই নীরবতা ভেঙে প্রিন্স আন্দ্রু দুম করে বলে উঠল, ইয়োর এক্সেলেন্সি! আপনি অনুগ্রহ করে আমাকে ক্যাপ্টেন তুশিনের কামান-মঞ্চে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখলাম, দুই-তৃতীয়াংশ সৈন্য ও ঘোড়া মারা গেছে, দুটো কামান নষ্ট হয়েছে, আর কোনোরকম সাহায্যই পাওয়া যায়নি।
চাপা উত্তেজনার সঙ্গে বলকনস্কি কথাগুলি বলে গেল, প্রিন্স ব্যাগ্রেশন ও তুশিন সমান আগ্রহে শুনতে লাগল।
সে বলতে লাগল, আর ইয়োর এক্সেলেন্সি যদি আমার কথা শোনেন তো বলি, ওই কটি কামান এবং ক্যাপ্টেন তুশিন ও তার দলের সাহসিকতাপূর্ণ কাজই আজকের জয়লাভের প্রধান কারণ। কথা শেষ করে কোনো জবাবের জন্য অপেক্ষা না করেই প্রিন্স আন্দ্রু টেবিল ছেড়ে উঠল।
তুশিনের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন মাথাটা নুইয়ে বলল, সে যেতে পারে। তাকে সঙ্গে নিয়ে প্রিন্স আ বেরিয়ে গেল।
তুশিন বলল, তোমাকে ধন্যবাদ, তুমি আমাকে রক্ষা করেছ প্রিয় বন্ধু!
প্রিন্স আন্দ্রু চোখ তুলে তাকাল, কিন্তু না বলেই চলে গেল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। সব কিছুই যেন অদ্ভূত, যেমনটি সে আশা করেছিল তেমনিট ঘটল না।
ওরা কারা? এরা এখানে কেন? এরা কি চায়? কতক্ষণে এ সবকিছু শেষ হবে? সামনের চলমান ছায়াগুলোর দিকে তাকিয়ে রস্তভ ভাবতে লাগল। তার বাহুর যন্ত্রণা ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। একটা দুর্বার তার ভার তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে, লাল বৃত্তগুলি নাচছে চোখের সামনে, শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে একটা নির্জনতাবোধ। আহত ও অক্ষত এইসব সৈনিকরাই তার পেশীগুলোকে চেপে ধরে মুচড়ে দিচ্ছে, তার মচকে যাওয়া হাত ও ঘাড়ের মাংস ঝলসে দিচ্ছে। এদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য সে চোখ বুজল।
মুহূর্তের জন্য সে ঝিমতে লাগল, কিন্তু সেই স্বল্প সময়ের মধ্যেই অসংখ্য জিনিস স্বপ্নের মধ্যে তার সামনে হাজির হল, মায়ের মুখ ও লম্বা সাদা হাত, সোনিয়ার ছোট কাঁধ, নাতাশার চোখ ও হাসি, দেনিসভের কণ্ঠস্বর ও গোঁফ আর তেলিয়ানিন এবং বগদানিচের যত সব কাণ্ড কারখানা।
সে চোখ মেলে তাকাল। কাঠকয়লার আগুনের গজখানেক উপরে নেমে এসেছে রাতের কালো চন্দ্রাতপ। সে আগুনে পড়ন্ত বরফের টুকরোগুলো ঝলসে উঠছে। তুশিন ফিরে আসেনি, ডাক্তার আসেনি। এখন সে একা, শুধু একটি সৈনিক আদুল গায়ে আগুনের ওপাশে বসে তার সরু হলুদ শরীরটাকে গরম করছে।
