আগুন জ্বালানো হয়েছে। কথাবার্তা আরো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সৈন্যদের যথাযথ নির্দেশাদি দিয়ে ক্যাপ্টেন তুশিন একজন সৈনিককে পাঠাল শিক্ষার্থীটির জন্য কোনো ড্রেসিং স্টেশন অথবা ডাক্তারের খোঁজে। তারপর রাস্তার উপরে সৈন্যরা যেখানে আগুন জ্বেলেছে সেইখানে গিয়ে বসল। রস্তভও নিজেকে টেনে নিয়ে সেখানেই গেল। যন্ত্রণায়, ঠাণ্ডায় ও স্যাঁৎসেঁতে আবহাওয়ায় তার সারা শরীর কাঁপছে। একটা অনিবার্য তন্দ্রার ভাব যেন তাকে পেয়ে বসেছে, শুধু বাহুতে একটা সঁচ বেঁধার মতো যন্ত্রণায় ফলেই সে জেগে আছে, হাতটাকে কোনোভাবে রেখেই স্বস্তি হচ্ছে না। একবার চোখ বুজছে, আবার আগুনের দিকে ও তুশিনের চাওড়া কাঁধ মূর্তির দিকে তাকাচ্ছে। তুশিনের বুদ্ধিদীপ্ত দুট বড় বড় চোখ সহানুভূতি ও সমবেদনায় রস্তভের উপর নিবদ্ধ, রস্তভও বুঝতে পারছে যে সমস্ত অন্তর দিয়ে তুশিন তাকে সাহায্য করতে চাইছে, কিন্তু পারছে না।
চারদিকেই পদাতিকবাহিনীর পায়ের শব্দ ও আলোচনা শোনা যাচ্ছে, তারা কেউ হাঁটছে, কেউ ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ বসে আছে। নানা কণ্ঠস্বর, কাদার ভিতর দিয়ে চলমান ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ, জ্বলন্ত কাঠের ফটফট আওয়াজ–সব মিলেমিশে একটা ঐকতান গড়ে তুলেছে।
সেনাদলকে এখন আর অন্ধকারে একটি অদৃশ্য প্রবহমান নদী বলে মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে, একটা উদ্বেলিত অন্ধকার সমুদ্র ঝড়ের পরে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে। রস্তভ উদাসীনভাবে চারদিকে তাকাল, কান পেতে সবকিছু শুনতে লাগল। একটি পদাতিক সৈন্য আগুনের কাছে এসে গোড়ালির উপর বসে আগুনের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিল।
তুশিনকে বলল, কিছু মনে করছেন না তো ইয়োর অনার? আমার কোম্পানিটা হারিয়ে ফেলেছি। কোথায়
যে আছে তাও জানি না…মন্দ ভাগ্য আর কি!
সৈনিকটির সঙ্গে গালে ব্যান্ডেজ-বাঁধা একটি পদাতিক অফিসারও আগুনের কাছে এসে তুশিনকে বলল, কামানগুলোকে একটু সরিয়ে তাদের গাড়িটাকে যাবার মতো জায়গা যেন করে দেওয়া হয়। তারা চলে যাবার পরে দুটি সৈন্য আগুনের কাছে ছুটে এল। দুজনই একটা বুটকে চেপে ধরে সেটাকে ছিনিয়ে নেবার জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই করছে।
তুমি এটা কুড়িয়ে পেয়েছ?…আমি বলছি! তুমি খুব চালাক! একজন কর্কশগলায় চেঁচিয়ে বলল। তারপরই রক্তাক্ত পায়ের পট্টি দিয়ে গলায় ব্যান্ডেজবাধা একটি ফ্যাকাশে, শুটকো সৈনিক এসে রাগত গলায় গোলন্দাজ সৈন্যদের কাছে পানি চাইল, বলল, এইভাবে কুকুরের মতো মরতে হবে না কি?
তুশিন লোকটিকে ঝল দিতে বলল। তারপর একটি হাসি খুশি সৈনিক এসে পদাতিক বাহিনীর জন্য একটা আগুন চাইল।
একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিয়ে অন্ধকারে যেতে যেতে সে বলল, পদাতিক বাহিনীর জন্য সুন্দর একটা জ্বলন্ত মশাল পেয়েছি। আগুনের জন্য ধন্যবাদ-সুদসমেত একদিন ফিরিয়ে দেব।
তারপর একটা জোব্বার উপরে ভারি কিছু বয়ে নিয়ে চারটি সৈনিক আগুনের পাশ দিয়ে চলে গেল। একজন হোঁচট খেল।
কোনো শয়তান পথের মাঝখানে কাঠ ফেলে রেখেছে সে খেঁকিয়ে উঠল।
এ তো মরে গেছে–কেন বয়ে নিয়ে যাচ্ছি? আর একজন বলল।
থাম!
বোঝা নিয়ে তারা অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
তুশিন ফিসফিস করে রস্তভকে বলল, এখনো যন্ত্রণা হচ্ছে?
হ্যাঁ।
একজন গোলন্দাজ এসে তুশিনকে বলল, ইয়োর অনার, সেনাপতি আপনাকে ডাকছেন। তিনি ওই কুঁড়ে ঘরে আছেন।
যাচ্ছি বন্ধু।
তুশিন উঠল, গ্রেট-কোটের বোম লাগিয়ে শরীরটাকে টান টান করে আগুনের কাছ থেকে চলে গেল।
গোলন্দাজ বাহিনীর জ্বালানো আগুনের অনতিদূরে প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের জন্য একটা কুঁড়েঘর তোলা হয়েছে। সেখানেই সে ডিনারে বসেছে, সমাগত কয়েকজন অধিনায়ক অফিসারের সঙ্গে কথা বলছে। ছোটখাট বৃদ্ধটি চোখ অর্ধেক বুজে সাগ্রহে একটা হাড় চিবুচ্ছে, বাইশ বছর ধরে নিখুঁতভাবে চাকরি করা সেনাপতিটি এক গ্লাস ভদকা খেয়ে লাল হয়ে উঠেছে, সেখানে আর আছে মোহরাঙ্কিত আংটি হাতে স্টাফ-অফিসারটি, ঝেরকভ অস্বস্তির সঙ্গে সকলকে দেখছে, প্রিন্স আন্দ্রু ঝকঝকে চোখ মেলে ঠোঁট দুটো চেপে ধরেছে।
ঘরের কোণে দাঁড় করানো রয়েছে ফরাসিদের কাছ থেকে দখল করা একটা পতাকা, সরল-মুখ হিসাবরক্ষকটি হাত দিয়ে সেটার বুনট পরীক্ষা করে দেখে বিচলিতভাবে ঘাড় নাড়তে লাগল–হয়তো পতাকাটা তার ভালো লেগেছে, হয়তো নিজে ক্ষুধার্ত হয়েও চিনারে অংশ নিতে না পারায় সেই সব ভোজ্যদ্রব্য দেখা তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠেছে। পাশের কুঁড়ে ঘরে আছে একজন বন্দি ফরাসি কর্নেল। আমাদের অফিসাররা সেখানে ভিড় করেছে। প্রিন্স ব্যাগ্রেশন প্রতিটি অধিনায়ককে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ ও আমাদের হিসেবে নিচ্ছিল। যে অধিনায়কের রেজিমেন্টটি ব্রাউনাউতে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল সে প্রিন্সকে জানাল, যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্রই সে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে, তার যেসব সৈন্য কাঠ কাটছিল তাদের একত্রে ডেকে আনে, এবং ফরাসিদের পাশ কাটিয়ে যেতে দিয়ে দুই ব্যাটেলিয়ন বেয়নেটধারী সৈন্য নিয়ে তাদের আক্রমণ করে হটিয়ে দেয়।
ইয়োর এক্সেলেন্সি, যখন দেখলাম তাদের প্রথম ব্যাটেলিয়নটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন রাস্তার উপর থেমে গিয়ে ভাবলাম, ওদের এগিয়ে আসতে দিয়ে গোটা ব্যাটেলিয়ন নিয়ে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব-আর তাই আমি করেছি।
