দূর থেকে হাঁক দিল, পিছিয়ে এস! সকলে পিছিয়ে এস!
সৈন্যরা হেসে উঠল। মুহূর্তকাল পরে সেই একই হুকুম নিয়ে এল জনৈক অ্যাডজুটান্ট।
প্রিন্স আন্দ্রু তুশিনের কামানগুলো যেখানে বসানো ছিল সেখানে পৌঁছে প্রথমেই তার চোখে পড়ল, জিন খোলা পা-ভাঙা একটা ঘোড়া মাটিতে পড়ে কাতড়াচ্ছে। তার পা থেকে ফোয়ারার মতো রক্ত বেরুচ্ছে। কামান-শকটগুলোর মাঝে মাঝে কয়েকজন মরে পড়ে আছে। একটার পর একটা গোলা ছুটে যাচ্ছে, তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিহরণ নেমে গেল। কিন্তু ভয়ের চিন্তাই তাকে নতুন করে উদ্বুদ্ধ করে তুলল। আমি ভয় পেতে পারি না এই কথা ভেবে সে ধীরে ধীরে ঘোড়া থেকে নামল। হুকুম জারি করেও সেখান থেকে নড়ল না। স্থির করল, সে উপস্থিত থেকেই কামানগুলিকে সেখান থেকে সরিয়ে বসাবার ব্যবস্থা করবে। ফরাসিদের প্রচণ্ড গুলিবর্ষণের মধ্যে তুশিনকে সঙ্গে নিয়ে সে কামানগুলি সরাবার কাজের তদারিক করতে লাগল।
জনৈক গোলন্দাজ প্রিন্স আন্দুকে বলল, একজন স্টাফ-অফিসার এক মিনিট আগে এখানে এসেই পালিয়ে গেছেন। তিনি আপনার মতো নন!
প্রিন্স আন্দ্রু তুশিনকে কিছুই বলল না। দুজনই এত ব্যস্ত যে কেউ কারো দিকে নজরই দিচ্ছে না। চারটি কামানের মধ্যে অক্ষত দুটোকে ঠিকমতো বসিয়ে তারা পাহাড় বেয়ে নামতে লাগল। তখন প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়া ছুটিয়ে তুশিনের কাছে গেল।
তুশিনের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা, আবার দেখা হবে…
তুশিন বলল, বিদায় বন্ধু। বিদায় হে প্রিয় বন্ধু। কি এক অজ্ঞাত কারণে তার দুই চোখ হঠাৎ জলে ভরে গেল।
*
অধ্যায়-২১
বাতাস পড়ে গেছে, কালো মেঘের দল বারুদের ধোয়ার সঙ্গে মিশে যুদ্ধক্ষেত্রের দিগন্তের উপর নিচু হয়ে ঝুলে আছে। অন্ধকার হয়ে আসছে, দুটো অগ্নিকান্দ্রে আলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কামনের গর্জন ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পিছনে ও ডান দিকে মাঝে মাঝেই বন্দুকের শব্দ ক্রমেই কাছে শোনা যাচ্ছে। গুলির পাল্লায় বাইরে চলে গিয়ে তুশিন খাদের মধ্যে নেমে গেল, আর সেখানেই স্টাফ-অফিসার ও ঝেরকভের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। তাদের দুজনকেই দুবার তুশিনের কামানের কাছে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তারা সেখানে পৌঁছতে পারে নি। যে পদাতিক অফিসারটি যুদ্ধের ঠিক আগে তুশিনের চালাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল, পেটে বুলেটবিদ্ধ হয়ে সে এখন একটা কামান-শকটে শুয়ে আছে। পাহাড়ের পাদদেশে এক হাত দিয়ে আর একটা হাত চেপে ধরে জনৈক। বিবর্ণ হুজারশিক্ষার্থী তুশিনের কাছে এসে একটা আসনের জন্য প্রার্থনা জানাল।
ভীরু গলায় বলল, ঈশ্বরের দোহাই ক্যাপ্টেন! আমার হাতে আঘাত লেগেছে। ঈশ্বরের দোহাই…আমি হাঁটতে পারছি না। ঈশ্বরের দোহাই।
বোঝা গেল, শিক্ষার্থীটি গাড়িতে একটা জায়গার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিফল হয়েছে। তাই সকরুণ ইতস্তত গলায় সে অনুরোধ করছে।
ঈশ্বরের দোহাই, ওদের বলুন আমাকে একটু জায়গা দিতে।
তুশিন বলল, ওকে একটা আসন দাও। বসবার জন্য একটা জোব্বা বিছিয়ে দাও। আহত অফিসারটি কোথায়?
তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি মারা গেছেন, কে যেন জবাব দিল।
ওকে উঠতে সাহায্য করো। বসে পড়ো বাপু, বসে পড়ো। আন্তনভ, জোব্বাটা বিছিয়ে দাও।
শিক্ষার্থীটি রস্তভ। এক হাত দিয়ে আর একটা হাত ধরে আছে, মুখটা ফ্যাকাশে, চোয়াল কাঁপছে, সারা শরীরে যেন জ্বরের খিচুনি। মৃত অফিসারকে যে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল সেখানেই তাকে জায়গা দেয়া হল। জোব্বাটা রক্তে ভিজে থাকায় তার ব্রিচেস ও হাতে রক্তের ছোপ লাগল।
রস্তভের দিকে এগিয়ে এসে তুশিন বলল, আরে, তুমিও আহত হয়েছ নাকি বাপু?
না, একটু মচকে গেছে।
তাহলে কামান শকটে এ রক্ত কিসের? তুশিন জিজ্ঞেস করল।
কোটের আস্তিন দিয়ে রক্তটা মুছে দিয়ে গোলন্দাজ সৈনিকটি বলল, ইয়োর অনার, সেই অফিসারটির শরীর থেকে রক্ত পড়েছে।
পদাতিক বাহিনীর সহায়তায় কামানগুলোকে উপরে ঠেলে তুলে গ্রুার্সদ গ্রামে পৌঁছে তারা থামল। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে, দশ পা দূরের সৈনিককেও দেখা যাচ্ছে না, গুলির শব্দও মিলিয়ে আসছে। সহসা ডান দিকে খুব কাছে পুনরায় হৈচৈ ও গুলির শব্দ শোনা গেল। অন্ধকারে দেখা গেল গুলির ঝিলিক। এটাই ফরাসিদের শেষ আক্রমণ, গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে যে সৈনিকরা আশ্রয় নিয়েছিল তারাই সে আক্রমণের মোকাবিলা করল। তারা আবার গ্রাম থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল, কিন্তু তুশিনের কামানের চাকা অচল হয়ে পড়েছে, তাই গোলন্দাজ সৈনিকরা, তুশিন ও শিক্ষার্থীটি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ভাগ্যের জন্য অপেক্ষা করে রইল। গুলির শব্দ থেমে গেল, সাগ্রহে কথা বলতে বলতে সৈনিকরা গলি পথ থেকে ছুটে বেরিয়ে এল।
তুমি আঘাত পাওনি তো পেত্রভ? একজন জিজ্ঞেস করল।
আরে বাবা, আচ্ছা ঠেঙানি ওদের দিয়েছি। ওরা আর এদিকে পা বাড়াবে না, একজন একজন বলল।
একটা জিনিস তোমরা দেখনি। নিজেদের দিকেই ওরা কীরকম গুলি ছুড়ছিল। কিছুই তো দেখা যাচ্ছিল । গাঢ় অন্ধকার রে ভাই! গলা ভেজাবার কিছু আছে কি?
ফরাসিদের আক্রমণ শেষবারের মতো প্রতিহত হল। গল্পত পদাতিকবাহিনী পরিবৃত হয়ে তুশিনের কামানগুলো একটু একটু করে সামনে এগোতে লাগল।
অন্ধকারে সকলে এগিয়ে চলল। মনে হল, ফিসফিস গুঞ্জন ও ঘোড়র ক্ষুর ও গাড়ির চাকার শব্দের সঙ্গে একটা অদৃশ্য বিষণ্ণ নদী যেন একই দিকে বয়ে চলেছে। তারই মধ্যে শোনা যাচ্ছে আহতদের আর্তনাদ ও কণ্ঠস্বর। কিছুক্ষণ পরে সেই চলমান জনতা বিচলিত হয়ে উঠল, সাদা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কে একজন সদলে তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল, যেতে যেতেই বলল : তিনি কী বললেন? এখন কোনো দিকে? বিরতি কি? তিনি কি আমাদের ধন্যবাদ দিয়েছেন? নানা দিক থেকে এমনি সব সাগ্রহ প্রশ্ন শোনা গেল। চলমান জনতা ক্রমেই কাছাকাছি এগিয়ে এল, একটা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল যে তাদের যাত্রাবিরতির হুকুম জারি হয়েছে, সামনের সারির সৈনিকরা দাঁড়িয়ে পড়েছে। কর্দমাক্ত রাস্তার মাঝখানে যে যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল।
