সে বলল, যে সমাজে অভ্যর্থনা লাভ করবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে সেই সমাজের, বিশেষ করে এখানকার নারী সমাজের বুদ্ধি ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ আমাকে এতই মুগ্ধ করেছে যে আবহাওয়ার কথা ভাববার মতো সময় আমি এখনো পাই নি।
মঠাধ্যক্ষ ও পিয়েরকে পালাবার সুযোগ না দিয়ে আন্না পাভলভনা তাদের উপর নজর রাখবার সুবিধার জন্য দুজনকে বড় দলটার মধ্যে এনে হাজির করল।
*
অধ্যায়-৪
ঠিক সেই সময় আরো একজন অতিথি বসবার ঘরে ঢুকল : ছোট প্রিন্সেসের স্বামী প্রিন্স আদ্রু বলকনস্কি। সুদর্শন যুবক, উচ্চতা মাঝারি, চোখ-নাক-মুখ সুগঠিত। ক্লান্ত, একঘেয়ে মুখের ভাব থেকে শান্ত, পরিমিত পদক্ষেপ পর্যন্ত তার সবকিছুই তার প্রাণবন্ত ছোটখাটো স্ত্রীটির সম্পূর্ণ বিপরীত। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, সে যে এই ঘরের সকলকেই চেনে তাই শুধু নয়, এরা সকলেই তার কাছে এতই বিরক্তিকর যে তাদের দিকে তাকাতে বা তাদের কথাবার্তা শুনতেও সে ক্লান্তি বোধ করে। আর এই যে সব মুখ তার কাছে এত একঘেয়ে লাগে তাদের মধ্যে সব চাইতে বিরক্তিকর মনে হয় তার সুন্দরী স্ত্রীর মুখখানি। এমন একটা মুখভঙ্গি করে প্রিন্স তার কাছ থেকে সরে গেল যে তার সুন্দর মুখটাও যেন বিকৃত হয়ে উঠল আন্না পাভলভনার হাতে চুমো খেয়ে সে চোখ কুঁচকে একে একে সমবেত সকলকেই দেখতে লাগল।
আপনি নাকি যুদ্ধে চলে যাচ্ছেন প্রিন্স? আন্না পাভলভনা শুধাল।
একজন ফরাসি ভদ্রলোকের মতো করে সেনাপতির নামের শেষ অংশের উপর জোর দিয়ে বলকনস্কি ফরাসি ভাষায় বলল, জেনারেল কুতুজভ আমাকে তার এড-ডি-কং হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
আর লিসে, আপনার স্ত্রী।
সে দেশের বাড়িতে চলে যাবে।
আপনাকের মনোরমা স্ত্রীটির সঙ্গ থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে আপনার লজ্জা হচ্ছে না?
যে রকম গায়ে-পড়াভাবে সে অন্য সব পুরুষের সঙ্গেই কথা বলে থাকে তেমনিভাবেই স্বামীকে সম্বোধন করে তার স্ত্রী বলল, আন্দ্রে, মাদময়জেল জর্জ ও বোনাপার্তকে নিয়ে এমন একটা গল্প ভাইকৌত আমাদের বলছেন!
প্রিন্স আন্দ্রু চোখ দুটো কুঁচতে মুখ ফিরিয়ে নিল। প্রিন্স আন্দ্রু ঘরে ঢোকামাত্রই পিয়ের তাকে লক্ষ্য করছিল পরিতুষ্ট সস্নেহ দৃষ্টিতে; এবার সে এগিয়ে এসে তার হাতটা ধরল। প্রিন্স আন্দ্রু এবারও ভুরু কোঁচকাল; যে কেউ তার হাত ধরলেই সে বিরক্তি বোধ করে; কিন্তু পিয়েরের উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে তার মুখে একটা অপ্রত্যাশিত সদয় স্মিত হাসি ফুটে উঠল।
এই যে!…এই বিরাট জমায়েতে আপনিও হাজিরও দেখছি? পিয়েরকে বলল।
পিয়ের জবাব দিল, আমি জানতাম আপনি এখানে আসবেন। নৈশভোজেও আমি আপনার সঙ্গে যোগ দেব। নিতে পারি তো? যাতে ভঁইকোঁতের গল্প বলায় ব্যাঘাত না ঘটে সে জন্য বেশ নিচু গলায় সে কথাটা বলল।
না, অসম্ভব! প্রিন্স আন্দ্রু হেসে বলে উঠল; এমনভাবে সে পিয়েরের হাতটা চেপে ধরল যাতে বোঝা যায় যে এ ধরনে প্রশ্ন করবার কোনো দরকারই ছিল না। আরো কিছু বলবার ইচ্ছা তার ছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে প্রিন্স ভাসিলি ও তার মেয়ে যাবার জন্য উঠে পড়ায় যুবক দুটিও তাদের পথ করে দেবার জন্য উঠে দাঁড়াল।
বন্ধুর মতো হাত ধরে ফরাসি ভদ্রলোকটিকে বসিয়ে দিয়ে প্রিন্স ভাসিলি বলল, প্রিয় ভাইকোঁত, আমাকে ক্ষমা করবেন। দুভার্গ্যবশত দূতাবাসের ভোজসভায় যোগ দিতে হবে বলে এই সুখ থেকে আমাকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে, আর আপনাদের বিঘ্ন ঘটাতেও বাধ্য হচ্ছি। আপনার মনোরম সঙ্গ ত্যাগ করতে হচ্ছে বলে আমি খুবই দুঃখিত, আন্না পাভলভনার দিকে ফিরে সে শেষের কথাগুলি বলল।
তার মেয়ে প্রিন্সেস হেলেন পোশাকের ভাঁজগুলোকে আলতো করে তুলে ধরে চেয়ারের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে গেল; তার সুন্দর মুখের উপর একটা উজ্জ্বল হাসি ঝলমলিয়ে উঠল। তার দিকে চেয়ে পিয়েরের চোখে এমন একটা উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল যেন সে ভয় পেয়েছে।
খুব মনোরমা, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
খুব, পিয়ের বলল।
প্রিন্স ভাসিলি যেতে যেতে পিয়েরের হাতটা চেপে ধরে আন্না পাভলভনাকে বলল : আমার হয়ে এই ভালুকটাকে শিখিয়ে পড়িয়ে একটু মানুষ করে তুলুন। একটা পুরো মাস সে আমার কাছে আছে, অথচ এই প্রথম তাকে আমি সমাজে মিশতে দেখলাম। একটি যুবকের পক্ষে চতুরা রমণীদের সাহচর্যের মতো দরকারি আর কিছু নেই।
আন্না পাভলভনা হেসে কথা দিল, পিয়েরকে সে হাতে নিল। সে জানে প্রিন্স ভাসিলির সঙ্গে তার বাবার যোগাযোগ আছে। যে বয়স্কা মহিলাটি বুড়ি খালার কাছে বসেছিল সে তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে পাশের ঘরে প্রিন্স ভাসিলিকে ধরে ফেলল। তার মুখে উদ্বেগ আর ভয় ফুটে উঠেছে।
পাশের ঘরে ছুটে গিয়ে সে বলল, আমার ছেলে বরিসের কী হল প্রিন্স? আমি তো আর পিটার্সবুর্গে থাকতে পারছি না। ফিরে গিয়ে বেচারি ছেলেটাকে কী খবর জানাব আমাকে বলে দিন।
প্রিন্স ভাসিলি অনিচ্ছার সঙ্গেই বয়স্কা মহিলাটির কথা শুনল; তার প্রতি খুব একটা ভদ্র ব্যবহারও করল, বরং তার আচরণে একটু অধৈর্যই প্রকাশ পেল; তবু মহিলাটি বিগলিত হাসি হেসে তার হাতটা চেপে ধরল, যাতে সে চলে যেতে না পারে।
সম্রাটকে শুধু একটি কথা যদি বলেন তাহলেই তো সঙ্গে সঙ্গে তাকে রক্ষী বাহিনীকে বদলি করে দেওয়া হবে, আর তাতে তো আপনার কোনই ক্ষতি হবে না, মহিলাটি বলল।
