আমাদের জন্যে সেই গল্পটির প্রাসঙ্গিক অংশটির সূচনা হয়েছিল যখন ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করার পর অষ্টম হেনরি তার ভাই আর্থারের বিধবা স্ত্রী, ক্যাথেরিন অব আরাগোনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যিনি বয়সে হেনরির চেয়ে পাঁচ বছরের বড় ছিলেন। বিষয়টি খুবই ব্যতিক্রম একটি ঘটনা, কারণ বাইবেলে এধরনের বিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ওল্ড টেস্টামেন্টে লেভিটিকাসে সুস্পষ্টভাবে কোনো ব্যক্তির জন্যে তার ভাইয়ের বিধবাপত্নীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে : যদি কেউ তার ভাইয়ের স্ত্রীকে বিবাহ করে, এই মিলন অপবিত্র হবে। তিনি তার ভাইয়ের নগ্নতা উন্মোচন করবেন, এবং তারপর সেখানে সতর্ক করতে আসলেই খারাপ বার্তাটি দেওয়া হয়েছিল, এবং এমন মিলন সন্তানহীন হবে। আর এই বিয়ের কাজটি সম্পন্ন করার জন্যে হেনরিকে পোপের কাছ থেকে বিশেষ ছাড়পত্রও সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এবং তিনি সেটি সংগ্রহ করেছিলেন এবং ক্যাথেরিনকে বিয়ে করেছিলেন। এটি প্রদর্শন করছে যে, অন্তত সেই সময়ে হেনরি বেশ আনন্দের সাথেই মেনে নিয়েছিলেন, তার রাজ্য ইংল্যান্ডের ওপর পোপের কর্তৃত্ব আছে।
সমস্যাটি শুরু হয়েছিল যখন ক্যাথেরিন সিংহাসনের জন্যে পুরুষ উত্তরাধিকারীর জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আর এটি হেনরির জন্যে সত্যিকারের একটি দুশ্চিন্তা ছিল, যে-কোনো মধ্যযুগীয় রাজার জন্যে যেমন এটি একটা বড় সমস্যা ছিল। সিংহাসনের জন্যে একজন পুরুষ-উত্তরাধিকারী নিশ্চিত করা আসলেই সেই সময়ের রানিদের কাছে প্রত্যাশিত একটি দায়িত্ব ছিল। ক্যাথেরিন সেই কাজে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাকে একটি কন্যাসন্তান দিয়েছিলেন, মেরি, তবে কোনো পুত্র নয়। কিন্তু এই সিংহাসন দখলের রাজনীতিতে পুত্রসন্তানই মূলত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হেনরি ভালোই বাইবেল জানতেন। বাস্তবিকভাবে, তিনি খানিকটা ধর্মতাত্ত্বিকও ছিলেন। তিনি ল্যাটিন আর গ্রিক পড়তে পারতেন এবং কঠোরভাবেই একজন ক্যাথলিক ছিলেন। তিনি রিফরমেশনের বার্তাগুলো ঘৃণা করতেন, ইউরোপ থেকে যে-ধারণাগুলো ইংল্যান্ডে প্রবেশ করেছিল। একটি ছোট পুস্তিকায় তিনি লুথারের ধর্মতত্ত্বকে আক্রমণ করেছিলেন, আর যার কারণে পোপ দশম লিও তাকে বিশ্বাসের রক্ষক হিসাবে বিশেষ খেতাবও দিয়েছিলেন, যে খেতাবটির ওপর এখনো যুক্তরাজ্যের রাজারা দাবি অব্যাহত রেখেছেন। আপনি যদি একটি পাউন্ড মুদ্রা লক্ষ করেন, আপনি রানির নামের পাশে F2 বর্ণদুটি লেখা দেখবেন, এটি হচ্ছে ‘Fidei Defensor’, ল্যাটিন এই বাক্যটির অর্থ ধর্মবিশ্বাসের সুরক্ষাকারী।
সুতরাং তিনি আর যা কিছুই হয়ে থাকুন না কেন, অবশ্যই অষ্টম হেনরি প্রটেস্টান্ট ছিলেন না। তিনি ইংল্যান্ডের জন্য বিশেষভাবে একটি নতুন চার্চ সৃষ্টি করতে চাননি। তিনি একজন স্ত্রী চেয়েছিলেন, যে-কিনা তাকে পুত্রসন্তান দিতে পারে। এই সমাধানটি খুব সরল ছিল। বাইবেলে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও পোপ তাকে ক্যাথেরিনকে বিয়ে করার জন্যে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্যাথেরিন যে তাকে কোনো পুত্রসন্তান দিতে পারেনি সেই বাস্তব তথ্যটি প্রমাণ করেছিল, পোপের আসলেই এই বিয়েতে অনুমতি দেওয়া উচিত হয়নি। লেভিটিকাসের সেই অনুচ্ছেদটি কী বলেছিল? তারা সন্তানহীন থাকবে। যেহেতু কন্যারা ধর্তব্যের মধ্যে পড়েন না, হেনরি নিজেকে সন্তানহীন ভেবেছিলেন। এবং পোপের এই বিয়ে ‘বাতিল’ ঘোষণা করা উচিত, এর মানে তিনি ঘোষণা করবেন এই বিয়ে কখনোই ‘বৈধ’ ছিল না।
কিন্তু পোপের জন্যে এই কাজটি করা বেশ কঠিন ছিল। যদি তিনি এই বিয়ে নিষ্পত্তিতে হ্যাঁ বলেন, তাহলে তিনি ক্যাথেরিনের আত্মীয় স্পেনের ক্ষমতাবান সম্রাটের বিরাগভাজন হবেন। যদি তিনি না বলেন তাহলে তিনি ইংল্যান্ডের রাজাকে অসন্তুষ্ট করবেন। সুতরাং তিনি কিছুই করেননি, আশা করেছিলেন, এমন কিছু ঘটবে তাকে এই সিদ্ধান্ত নেবার ঝামেলা থেকে মুক্তি দেবে।
যা ঘটেছিল সেটি ছিল হেনরির জীবনে আরেকজন নারী এসেছিলেন। তিনি অ্যান বোয়েলিন, রানি ক্যাথেরিনের একজন লেডি ইন ওয়েটিং। নিজের মৃতভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করার কারণে অভিশপ্ত এমন দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে, এবং অ্যানের প্রেমে পড়ে, হেনরি ১৫৩৩ সালে গোপনে তাকে বিয়ে করেছিলেন। এবং ১৫৩৪ সালে তিনি তার উপদেষ্টাদের ইতিহাস থেকে এমন কোনো উদাহরণ খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিয়ে নিজেকে চার্চ অব ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গভর্নর হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর চার্চের ওপর এই নতুন কর্তৃত্ব গ্রহণ করার পর, ক্যাথেরিনের সাথে তার বিয়ে নিষ্পত্তি করার মাধ্যমেই তিনি তার প্রথম ক্ষমতাটি ব্যবহার করেছিলেন। এর মাধ্যমে রোমের সাথে তার বিচ্ছেদটিও চূড়ান্ত হয়েছিল।
যে-বিষয়টি লক্ষ করতে হবে সেটি হচ্ছে এই বিভাজনের কারণ কিন্তু প্রটেস্টান্টদের নতুন কোনো চার্চ প্রতিষ্ঠার আহ্বান নয় বরং নতুন স্ত্রীর জন্যে ইংল্যান্ডের রাজার দাবি। ইংল্যান্ডে অবশ্যই প্রটেস্টান্টরা ছিলেন। তাদের একজন ছিলেন রাজার প্রধান মুশকিল-আসানকারী, থমাস ক্রমওয়েল, আর হেনরি ক্রমওয়েলের সমর্থন যে রিফরমেশনের দিকে ঝুঁকে আছে সেটি সম্ভবত জানতেন না। এই নানা জটিল পরিস্থিতি থেকে আবির্ভূত হয়েছিল চার্চ অব ইংল্যান্ড, যা নিজেকে ক্যাথলিক এবং সংস্কারপন্থি হিসাবে দাবি করেছিল। একই তবে তারপরও ভিন্ন। এটি বিশপ, যাজক, ডিকনদের আগের প্রাধান্যপরম্পরা অপরিবর্তিত রেখেছিল এবং তারপরও এটি অ্যাপোস্টলিক উত্তরাধিকারের মধ্যে অবস্থান করছে বলে দাবি করেছিল। তাদের কমন প্রেয়ার বা সাধারণ প্রার্থনার নতুন বইয়ে এটি পুরনো ক্যালেন্ডারের নানা ধর্মীয় আচারের দিন-তারিখে কোনো পরিবর্তন আনেনি, তবে এই নতুন বইটি ইংরেজদের তাদের নিজেদের ভাষার সুন্দর একটি সংস্করণে উপাসনা করার সুযোগ করে দিয়েছিল। এটি এমনকি নতুন কোনো চার্চ বা ভিন্নধরনের কোনো চার্চও ছিল না। এটি পুরনো ক্যাথলিক চার্চই ছিল, তবে এটি ঝকঝকে একটি নতুন চেহারা পেয়েছিল।
