যাই হোক, এভাবে ইংল্যান্ডের চার্চ নিজের বর্ণনা দিতে চেয়েছে। কিন্তু এর উৎপত্তি অবশ্যই ঝকঝকে পরিষ্কার সেই ইমেজ থেকে বহু দূরবর্তী। ধর্মতাত্ত্বিক সংস্কার নয় বরং রাজার রাজনীতি প্রাচীন ক্যাথলিক চার্চ থেকে ইংল্যান্ডকে পৃথক করেছিল। কিন্তু এই ইংলিশ রিফরমেশন ধর্মের একটি দিককে নির্দেশ করে, যা নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত : মানব রাজনীতির সাথে যেভাবে ধর্ম অনিবার্যভাবেই পরস্পরগ্রন্থিত থাকে। রাজনীতি, পলিটিক্স, শব্দটির উৎসের গ্রিকশব্দটির অর্থ হচ্ছে শহর, এর সব টানাপড়েন আর মতানৈক্যসহ মানুষ যেভাবে তাদের বাহ্যিক জীবনটি সংগঠিত করে তারই অপর একটি নাম। রাজনীতি সবকিছুর মধ্যেই অনুপ্রবেশ করে, স্কুলের খেলার মাঠের গণ্ডগোল থেকে জাতিসংঘে বিতর্ক অবধি।
আর শুরু থেকেই ধর্ম রাজনীতির সংমিশ্রণের একটি অংশ ছিল। আমরা হয়তো এমনকি বলতে পারি, মানবতা আর ঈশ্বরের সম্পর্কটি মূলত একধরনের রাজনীতি, কারণ এর মূল বিষয় হচ্ছে কীভাবে আমরা অন্যদের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেই বিষয়টি অনুসন্ধান করা, অর্থাৎ পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর স্বরূপ বোঝার একটি উপায়। একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই পার্থিব রাজনীতির অংশ ছিল ধর্ম। অবশ্যই ধর্মের মধ্যে রাজনীতি আছে, যেমন, কে ধর্মের নেতৃত্ব দেবেন, আর কীভাবেই বা তাদের নির্বাচন করা হবে, সেটি নিয়ে মতবিরোধ।
কিন্তু আসল ভয়ংকর ঘটনাগুলো ঘটে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ধর্ম একটি অস্ত্রে পরিণত হয়, বিতর্কের বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, ঈশ্বর তাদের পক্ষে আছেন বলে যারা দাবি করে থাকেন। আর সে-কারণে আমাদের এই রিফরমেশন আন্দোলনটিকে দেখতে হবে এমনভাবে যেখানে ধর্ম থেকে সেই সময়ের রাজনীতিকে পৃথক করা অসম্ভব একটি বিষয় ছিল, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে। তার নিজের রাজ্যের নিরাপত্তার জন্যে হেনরির একটি তালাকের দরকার ছিল, এবং পোপ যদি সেটি করার অনুমতি তাকে না দিতে চান অথবা না দিতে পারেন, তাহলে এমন কাউকে তাকে খুঁজে বের করতে হবে যিনি সেটি দিতে পারবেন। সুতরাং তিনি রোম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। চার্চ অব ইংল্যান্ডের জন্ম হয়েছিল। আর এর সূচনা আর উৎপত্তি যতই বিতর্কিত থাকুক না কেন, এটি নিজেকে দুই চরমপন্থি অবস্থানের ব্যতিক্রম একটি মধ্যপন্থা হিসাবে দেখেছিল। এটি তখনো একটি ক্যাথলিক চার্চ তবে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন একটি চেহারাসহ।
হেনরি তার তালাক নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন, কিন্তু সেটি তাকে সুখী করতে পারেনি। অ্যান বোয়েলিনও তার জন্যে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে পারেননি। যদিও তিনি একটি কন্যাশিশুর জন্ম দিয়েছিলেন। সুতরাং হেনরির জন্য সেই অভিশাপ অব্যাহত ছিল। মিথ্যা ব্যাভিচারের অভিযোগে হেনরি অ্যান বোয়েলিনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। এরপর তিনি জেন সেমুরকে বিয়ে করেছিলেন, যিনি তার আরাধ্য পুত্রসন্তানটির জন্ম দিয়েছিলেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল এডওয়ার্ড। এবং যখন ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দে হেনরি মারা যান, নয় বছর বয়সী এডওয়ার্ড সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
এডওয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে চার্চ অব ইংল্যান্ডের সংস্কার এর চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল। এবং যখন তিনি ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে মারা যান, রাজ্যশাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন ক্যাথেরিনের কন্যা মেরি, এবং ইংল্যান্ডের ধর্মীয় রাজনীতির চাকাটি বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করেছিল। ক্যাথলিক চার্চ পুনর্বহাল করা হয়েছিল এবং যারা তার মা, অষ্টম হেনরির প্রথম স্ত্রী ক্যাথেরিনের জীবনে যন্ত্রণার কারণ হয়েছিলেন, মেরি তাদের উপর তার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। প্রটেস্টান্টদের উপর নির্যাতন পরিচালনায় তিনি খুবই উৎসাহী ছিলেন, যাদের অনেককেই তিনি তাদের ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে পুড়িয়ে হত্যা করেছিলেন এবং নিজেই সেই কুখ্যাত খেতাবটি জুটিয়েছিলেন, ‘ব্লাডি মেরি’।
১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে মেরির মৃত্যু হলে আবার পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিয়েছিল। মেরির পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন অ্যান বোয়েলিনের কন্যা। এলিজাবেথ, যিনি ১৬০১ সাল অবধি শাসন করেছিলেন, এবং ইংল্যান্ডে সমৃদ্ধি আর শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন। নিয়তির পরিহাস হচ্ছে অষ্টম হেনরি যে-কন্যাকে চাননি, সেই কন্যাই ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বিচক্ষণ একজন শাসক হিসাবে নিজেকে প্রমাণিত করেছিলেন। তিনি রাজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছিলেন, এবং চার্চের সংস্কার পূর্ণাঙ্গভাবে সমাপ্ত করেন। কিন্তু তিনি তার বাবার মতোই নিষ্ঠুর হতে পারতেন। ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার জ্ঞাতিবোন মেরি কুইন অব স্কটকে ষড়যন্ত্রের কারণে শিরশ্চেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। মেরি শিরশ্চেদ করতে কুঠারের তিনটি আঘাত প্রয়োজন হয়েছিল, এটি দুঃখী জীবনের ভয়ংকর এক পরিণতি। আর কেন সেটি ঘটেছিল সে বুঝতে হলে এবার আমাদের উত্তরে স্কটল্যান্ডে যেতে হবে, যেখানে রিফরমেশনের এই সংস্কার-আন্দোলনটি খুব ভিন্নদিকে মোড় পরিবর্তন করেছিল।
৩১. পশুর শিরশ্চেদ
মধ্যযুগে ইউরোপে রানি হওয়া বেশ বিপজ্জনক একটি ব্যাপার ছিল। সেই সময় রানির ভূমিকা ছিল বিভিন্ন জাতির সাথে জোট বাঁধতে সহায়তা করা আর এমন সব মানুষের সন্তান ধারণ করা, যে-ব্যক্তিরা সাধারণত তাকে ভালোবাসতেন না। এমনই পরিস্থিতি ছিল ক্যাথেরিন অব আরাগনেরও, যিনি অষ্টম হেনরির প্রথম স্ত্রী ছিলেন। তবে তিনি অন্তত তার নিজের বিছানায় শুয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। অষ্টম হেনরির বোনের নাতনি মেরি কুইন অব স্কট মারা গিয়েছিলেন জল্লাদের কুঠারের আঘাতে, তার সময়ে ধর্মীয় সহিংসতার একজন শিকার। রাজা পঞ্চম জেমস ও তার ফরাসি স্ত্রী মেরি অব গিসের কন্যা মেরি ১৫৪২ সালে স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার জীবনে হারাবার পর্বটি বেশ আগেই শুরু হয়েছিল। তার জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন। এবং তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে স্কটল্যান্ডের রানি হয়েছিলেন। তবে তার বয়স যখন পাঁচ, তাকে ফ্রান্সে থাকার জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে পনেরো বছর বয়সে ফরাসি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী চৌদ্দবছরের ফ্রান্সিসের সাথে তার বিয়ে হয়েছিল।
