তিনি বলতেন : ধরুন, আপনার হয়তো ছোট একটা ছেলে আছে এবং বন্ধুদের সাথে সে বাইরে খেলছিল। যখন রাতে শোবার সময় সে বাসায় ফিরেছিল, তার মুখ ছিল ময়লা, সারাদিন ধরে মাঠে ঘোরাঘুরির কারণে তার মুখে কাদা লেগে আছে। যখন আপনি তাকে এই অবস্থায় দেখতে পেলেন, আপনার তখন কী করা উচিত? আপনার তিনটি বিকল্প আছে। আপনি তাকে সেই অবস্থায় বিছানায় শুতে পাঠাতে পারেন, এবং সে আপনার পরিষ্কার বালিশের কভারের উপর সে তার ছোট ময়লা মাথাটি নিয়ে শুয়ে পড়বে। আপনি তার মাথা কেটে ফেলতে পারেন। এটি অবশ্যই কাদার সমস্যাটি সমাধান করবে, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় আপনি তাকেও হত্যা করবেন, এবং আপনার আর কোনো পুত্র থাকবে না। অথবা আপনি তাকে একটি গোছল দিতে পারেন এবং রাতে বিছানায় শোবার আগে তাকে ভালো করে পরিষ্কার করে দিতে পারেন।
কিন্তু তিনি আসলে এর মাধ্যমে আমাদের কী বোঝাতে চাইছিলেন? রিফরমেশনের পরে দাঁড়িয়ে থাকা চার্চগুলোর অতীতের সাথে ধারাবাহিকতার ধারণাটি তিনি অনুসন্ধান করছিলেন। সেখানে উপস্থাপন করার মতো তিনটি মডেল ছিল, তিনি বলেছিলেন। কোনো পরিবর্তন ছাড়াই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল; অথবা ধারাবাহিকতা ছাড়াই পরিবর্তন ঘটেছিল, অথবা খানিকটা পরিবর্তনের সাথে ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। ক্যাথলিক চার্চ অতীতের সেই খ্রিস্টধর্মের সাথে এর ধারাবাহিতা অব্যাহত রেখেছিল, যা বিস্তৃত ছিল যিশুর সেই অ্যাপোস্টলদের সময় অবধি। কিন্তু ষোড়শ শতক নাগাদ সেই ছোট বালকটির মতো এটি একটি নোংরা মুখমণ্ডল অর্জন করেছিল, কিন্তু সেইসব কাদার নিচে এটি তেমনই ছিল, যা শুরু থেকেই ছিল। এটি খ্রিস্টধর্ম, তবে যার সংস্কার হয়নি।
কিন্তু গোঁড়া-সংস্কারবাদীদের মতে ক্যাথলিসিজম আর খ্রিস্টান ধর্ম ছিল না। পোপের শুধুমাত্র একটি পঙ্কিল মুখই নেই, তিনি খ্রিস্টবিরোধী একটি চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছিলেন, এমন কেউ যিনি যিশুর অনুসারী হবার ভান করছেন শুধু, কিন্তু মূলত তিনি খ্রিস্টের শক্র। যেন কোনো ভিনদেশি একজন গুপ্তচর সেই দেশটিকে ভিতর থেকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অন্য একটি দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ক্যাথলিসিজম অশুভ একটি রূপ ধারণ করেছে এবং শয়তানের পক্ষ নিয়েছে, সুতরাং এর অশুভ সেই মাথাটি কেটে ফেলতে হবে।
মাঝখানে ছিলেন সংস্কারবাদীরা, যারা বলেছিলেন, তারা শুধুমাত্র চার্চের মুখ থেকে সেই কাদা বা ময়লার চিহ্ন পরিষ্কার করে ধুয়ে দিচ্ছেন। তারা চার্চকে পুরোপুরি বাতিল করছেন না, শুধুমাত্র সেই পঙ্কিলতা, যা এটিকে বিকৃত করেছে, সেটিকে বাতিল করছেন। সংস্কার পর্বে যেসব চার্চগুলোর আবির্ভাব হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে যে-চার্চটির কাছে এই মধ্যম পথটি সবচেয়ে আরাধ্য ছিল, এবং যে-পথটিকে এটি নিজের বলে দাবি করেছিল, সেই চার্চটি ছিল ইংল্যান্ডের চার্চ (‘চার্চ ইন ইংল্যান্ড’)। বলা হয়ে থাকে এর সংঘর্ষটি আসলে আদৌ ক্যাথলিক চার্চের সাথে ছিল না। মূলত এর বিরোধটি হয়েছিল ক্যাথলিক চার্চের একজন বিশপের সাথে। যিনি ছিলেনে রোমের বিশপ (পোপ)। ইটালির একজন বিশপের আরেকটি জাতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার কী অধিকার থাকতে পারে? সারা পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব নিয়ে তার দাবি চার্চের মূল পরিচিতির অংশ ছিল না। তার এই ক্ষমতাদখলের চেষ্টা ইতিমধ্যে পূর্বের অর্থোডক্স চার্চ আর পশ্চিমের ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে একটি মহাবিভাজনের কারণ হয়েছিল। যদি আবার তিনি তার পুরনো কৌশল অবলম্বন করার চেষ্টা করেন এবং সতর্ক না হন, তাহলে আরো বড় একটি বিভাজন ঘটবে।
কিন্তু এই কাহিনিটির আরেকটি দিক ছিল। সেটি রোমের বিশপের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে যতটা না, তার চেয়েও বেশি এটি ইংল্যান্ডের রাজার বৈবাহিক সমস্যার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। সেই রাজার নাম ছিল অষ্টম হেনরি, তিনি তার ছয় স্ত্রীর জন্য বিখ্যাত। আর ঘটনাটি কী নিয়ে ছিল, সেটি বুঝতে হলে তার জন্মের চল্লিশ বছর আগের সময়ে ফিরে যাবার প্রয়োজন আছে।
১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জুন হেনরি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ইংল্যান্ডকে খণ্ডবিখণ্ড করা সাঁইত্রিশ বছর ধরে চলা ধারাবাহিক বেশকিছু যুদ্ধ সমাপ্ত হবার চার বছর পরে। যুদ্ধগুলোর সূচনা হয়েছিল ১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে, এবং এটি চলেছে বসওয়ার্থের যুদ্ধ অবধি, ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে, যে যুদ্ধে হেনরি টুডোর চূড়ান্তভাবে জয়লাভ করেছিলেন, এবং এই যুদ্ধটি দীর্ঘদিনের সংঘর্ষ থামিয়েছিল। এরপর তিনি রাজা সপ্তম হেনরি নাম নিয়ে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। অবশেষে শান্তি এসেছিল এই দ্বীপটিতে। কিন্তু মধ্যযুগীয় রাজারা কখনোই স্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা করতে পারতেন না। বিখ্যাত ইংলিশ নাট্যকার ও রাজতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন : ‘অস্বস্তিতে থাকে সেই মাথা, যে মাথা রাজমুকুট পরে।
ভবিষ্যৎ অষ্টম হেনরি সেইসব সংগ্রামের গল্প শুনেই বড় হয়েছিলেন, যে সংগ্রামের কারণে একদিন তার পিতা ইংল্যান্ডের সিংহাসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তিনি হয়তো শিখেছিলেন কীভাবে একজন রাজাকে তার সিংহাসনের বিরুদ্ধে এমনকি সামান্যতম হুমকির প্রতি সারাক্ষণই সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তার জন্যে বিষয়টি এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কারণ তার একজন বড়ভাই ছিলেন, আর্থার, যিনি সপ্তম হেনরির পর সিংহাসনে বসবেন এমন কথাই ছিল। বুদ্ধিমান এবং শারীরিকভাবে সুগঠিত তরুণ হেনরির শুধুমাত্র পড়াশুনা আর খেলাধুলা করা ছাড়া আর কোনো কাজই ছিল না। কিন্তু যখন তার বয়স দশ, তার পরিস্থিতিতে আকস্মিক একটি পরিবর্তন এসেছিল। তার বড়ভাই, সিংহাসনের জন্য নির্দিষ্ট রাজকুমার আর্থার মৃত্যুবরণ করেছিলেন তার বিধবা স্ত্রীকে রেখে, যিনি ছিলেন একজন স্প্যানিশ রাজকুমারী, ক্যাথেরিন অব আরাগন। হেনরি এরপর তার পিতার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হয়েছিলেন, যে সিংহাসনকে নিরাপদ এবং তার ক্ষমতায় ধরে রাখতে তিনি দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। ১৫০৯ সালে যখন সপ্তম হেনরি মারা গিয়েছিলেন, তার সতেরো বছরের ছেলে হেনরি, রাজা অষ্টম হেনরি হিসাবে সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন এবং পরবর্তী আটত্রিশ বছর তিনি রাজত্ব করেছিলেন।
