নানক এইসব প্রতিষিদ্ধতা প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে এই নিয়মগুলো ঈশ্বরের নামে বিভেদের দেয়াল নির্মাণ করছে, যিনি সবাইকে সমানভাবেই ভালোবাসেন। তার সমাধানটি ছিল বিস্মকরভাবেই সাধারণ। তিনি শিখসমাজে ‘লঙ্গর’ বা সামাজিক ভোজপ্রথার সূচনা করেছিলেন। এটি সব জাতের মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং নানা আচার দিয়ে অলংকৃত হওয়া থেকে এটি মুক্ত ছিল, পুরোহিতরা যে-আচারগুলো মানবিক কার্যক্রমের মধ্যে জুড়ে দিতে ভালোবাসেন। খুবই সাধারণ ছিল সেই খাদ্য। কিন্তু তারা একটি পরিবারের মতোই সবাই একসাথে বসে খাদ্যগ্রহণ করতেন। একটি শিখ গুরদুয়ারায় রান্নাঘর, সেই ভবনের অন্যসব অংশের মতোই পবিত্র। খাদ্য রান্না করা হয় এবং তা সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া হয় মানুষের সাম্যতা উদ্যাপন করতে, তাদের জাত, বিশ্বাস, বর্ণ অথবা লিঙ্গ যাই হোক না কেন। আর সে-কারণেই কম্পাসের চারটি দিকের মতো গুরদুয়ারারও চারটি দরজা থাকে, যে প্রতীকটি জানান দেয় এটি সবার জন্যে উন্মুক্ত। সব গুরুরা, যারা নানককে অনুসরণ করেছিলেন, তারা ধর্মবিশ্বাসের আবশ্যিক একটি অংশ হিসাবে এই লঙ্গরের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তৃতীয় গুরু অমর দাস, এমনকি দাবি করেছিলেন, যদি কেউ তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়, একেবারে হতদরিদ্র কৃষক থেকে ভারতের সম্রাট অবধি, তাকে অবশ্যই তার সাথে সঙ্গরে একবেলা খাদ্যগ্রহণ করতে হবে।
নানকের পরে আসা নয়জন গুরুর প্রত্যেকেই তার দৃষ্টিভঙ্গিটিকে সত্যায়িত করেছিলেন, আর তাদের সময়ের বিবেচনা ও প্রয়োজনে সেই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে সংগতিপূর্ণ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ধর্মটির দশম গুরু যিনি শিখবাদকে নাটকীয় একটি আত্মপরিচয় দিয়েছিলেন, যা এখনো এটিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে রেখেছে। মুঘলদের ভারত আপেক্ষিকভাবে সহিষ্ণু হয়তো ছিল, কিন্তু উন্মুক্ত সমাজ বলতে যা বোঝায়, তা থেকে অনেক দূরেই ছিল। এবং ইসলামি অসন্তোষের হাত থেকে শিখদের নিজেদেরকে সুরক্ষা করতে বাধ্য হতে হয়েছিল। তার ধর্মগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে ষষ্ঠগুরু হরগোবিন্দ (১৫৯৫-১৬৪৪) একটি শিখ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু দশম গুরু গোবিন্দ সিং (১৬৬৬–১৭০৮) শিখবাদকে এর একটি বাড়তি শক্তি আর দৃঢ়তা দিয়েছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের সুরক্ষিত শহর প্রতিষ্ঠা করতে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহিত করেছিলেন–এটি স্মরণ করিয়ে দেয় কীভাবে নতুন ধর্মগুলো সাধারণত নিজেদের রক্ষা করতে বাধ্য হতে হয় সেইসব গোষ্ঠী থেকে, যাদের তারা পরিত্যাগ করে এসেছে। শিখরা কিংবদন্তির যোদ্ধায় পরিণত হয়েছিলেন, এবং একটি সামরিক রীতি এটি আত্তীকৃত করেছিল যা এখনো তাদের চিহ্নিত করে।
শিখবাদের পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আছে, যাদের পঞ্চ ‘ক’ হিসাবে তথ্যনির্দেশ করা হয়। কেশ’, মানে না-কাটা চুল। শিখরা তাদের চুল বাড়তে দেয় তাদের বিশ্বাসের একটি চিহ্ন হিসাবে। শিখ পুরুষরা সেই চুল নিয়ন্ত্রণ করতে মাথায় পাগড়ি পরিধান করেন। নারীরা পাগড়ি কিংবা চাদর পরতে পারেন। কঙ্গ’ হচ্ছে একটি চিরুনি যা বিশুদ্ধতার প্রতীক, যা শিখদের লম্বাচুলে স্থায়ীভাবে লাগানো থাকে (অথবা পাগড়ির সাথে)। কারা একটি ইস্পাতের চুড়ি বা হাতবন্ধনী, যা তাদের কবজিতে থাকে, ঈশ্বরের অসীমতার প্রতীক। ‘কিরপান বা কৃপাণ’ একটি তরবারি, যা কোমরে ঝোলানো থাকে, কাঁধের থেকে নেমে আসা একটি বন্ধনী দিয়ে। এটি শিখদের শুধুমাত্র তাদের সামরিক ইতিহাসই নয়, একই সাথে ন্যায়বিচারের জন্যে তাদের যুদ্ধ করার সংকল্পটিকেও স্মরণ করিয়ে দেয়। কাচ্ছা হচ্ছে সৈন্যদের অন্তর্বাস, যা তাদের আত্মশৃঙ্খলা প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামের ব্যতিক্রম শিখধর্ম ধর্মান্তরিতকরণের ধর্ম নয়। এটি ইহুদিবাদের মতোই সেই অর্থে যে, এটি যেমন তাদের বিশ্বাস, তেমনি এটি তাদের জাতিগত আত্মপরিচয়। এবং যদিও এরা নতুন দীক্ষিতদের স্বাগতম জানায়, যারা তাদের সাথে যুক্ত হতে চায়, কিন্তু তারা কাউকে ধর্মান্তরিত করার জন্য তাদের অনুসন্ধানে সাত-সমুদ্র পাড়ি দেয় না। এর কারণ সেই ধর্মগুলোর ব্যতিক্রম যারা মুক্তি পাবার লক্ষ্যে শুধুমাত্র নিজেদের ধর্মকেই একমাত্র স্বীকৃত পথ হিসাবে দাবি করে থাকে। শিখরা বিশ্বাস করেন, ঈশ্বর অবধি পৌঁছানোর জন্যে বহু পথের অস্তিত্ব আছে। এখানে তারা সেই উদারতা প্রদর্শন করে, যা ভারতীয় আধ্যাত্মিকতাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে, এবং যা সেই অসহিষ্ণুতার ব্যতিক্রম, যা সাধারণত পশ্চিমের খ্রিস্টধর্মকে চিহ্নিত করেছে। আর এটি সেই ইশারা, এখন ভারত ত্যাগ করে ব্রিটেইন-অভিমুখে যাত্রা করার সময় এসেছে, ষোড়শ শতাব্দীতে সেখানে রিফরমেশন আন্দোলনের যুদ্ধগুলো কেমন চলছিল সেটি দেখতে।
৩০. মধ্যম পথ
আমি যখন ছাত্র ছিলাম, চার্চের ইতিহাস বিষয়ে আমার শিক্ষকদের একজন ছিলেন অ্যাবারডিনের বাসিন্দা, যার বেশ বর্ণিল একটি বাচনভঙ্গি ছিল। রিফরমেশন নিয়ে যখন ক্লাসে লেকচার দিতেন, তিনি একটি রূপক ব্যবহার করতেন, যা এখনো আমি মনে করতে পারি। এভাবে তিনি ষোড়শ শতাব্দীর সেই সংগ্রামের পর্ব থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন চার্চের পদ্ধতি নিয়ে আমাদের ভাবতে প্ররোচিত করেছিলেন।
