অনুপ্রেরণার অনুসন্ধানে তিনি এই দুটি ধর্মের পবিত্র স্থানগুলো দর্শন করতে তীর্থযাত্রায় বের হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে তিনি পশ্চিমে আরবে মক্কা অবধি গিয়েছিলেন। যখন তিনি পাঞ্জাবে ফিরে এসেছিলেন তার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে, ততদিনে তার সিদ্ধান্ত নেওয়াও শেষ হয়েছিল, যে-পথ তিনি খুঁজছেন সেটি হিন্দুধর্মও না আবার ইসলামও না। ঈশ্বরের সাথে তার একটি রহস্যময় সাক্ষাতের পর তিনি একটি ভিন্নপথের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু যদি আমরা পরীক্ষা করে দেখি তার ঈশ্বর কী উন্মোচন করেছিলেন, আমরা দেখতে পাব, যদিও এর নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, তবে এটি যে দুটি ধর্মকে একটিতে প্রতিস্থাপিত করতে চেয়েছে, সেই দুটি ধর্মের উপাদানও ধারণ করে আছে। মুহাম্মদ আর প্রটেস্টান্ট রিফরমেশন আন্দোলনের নেতাদের মতে, তিনি দম্ভপূর্ণ চাকচিক্যময় ধর্ম ঘৃণা করতেন। পৌত্তলিকতার ব্যবসায়ীদের প্রতি গভীর ঘৃণাসহ তিনি ছিলেন একজন একেশ্বরবাদী। তিনি দেখেছিলেন, কোনো ধর্ম কত সহজেই আধ্যাত্মিকতার লেবাস পরা প্রতারকদের একটি চক্রে পরিণত হতে পারে, যারা নিজেদের ঈশ্বরের বিক্রয়-প্রতিনিধি হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন। নানক জানতেন, সাধারণ নারী পুরুষের হৃদয়ের মধ্যে ইতিমধ্যেই ঈশ্বর বসবাস করছেন। কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে ঈশ্বরের কাজ করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর সে-কারণেই নানক সেই আচারগুলো অপছন্দ করতেন, যেগুলো পালন করতে পেশাজীবী পুরোহিতদের দরকার হয়।
সেই মতাদর্শ মোতাবেক তিনি হিন্দুধর্মের চেয়ে বরং বেশি ইসলামঘেঁষা। কিন্তু পৃথিবীতে জন্ম-জন্মান্তরে পরিভ্রমণ করা আত্মার সেই মুক্তির কামনার প্রতি সহানুভূতিতে তিনি হিন্দু ছিলেন। কার্মা আর পুনর্জন্মে বিশ্বাস হিন্দু মতবাদের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক একটি প্রকৃতি এবং নানক সেটি গ্রহণ করেছিলেন। ঈশ্বর তাকে বলেছিলেন যে, তিনি নিজে এই নিরন্তর পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্ত হয়েছেন। আর এটি ছিল তাদেরকে প্রদর্শন করার জন্যে যে, পুনর্জন্মের এই চক্র থেকে তারাও পরিত্রাণ লাভ করতে পারেন এবং তাকে সে-কারণেই তার অনুসারীদের কাছে একজন গুরু হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছে। তার আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বিবরণ দেওয়া গল্পগুলোর একটিতে, নানকের লক্ষ্য বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে : সর্বশক্তিমান তাকে বলেছিলেন–
‘আমি তোমাকে জন্ম, মৃত্যু আর পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্ত করলাম। যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে তোমাকে দেখবে, সে মুক্তি লাভ করবে। যে ব্যক্তি তোমার উচ্চারিত শব্দগুলো শুনবে বিশ্বাসের সাথে, সে মুক্তি লাভ করবে… আমি তোমাকে মুক্তি দান করছি। নানক, এই অশুভ পৃথিবীতে ফিরে যাও, এবং নারী-পুরুষ সবাইকে শেখাও কীভাবে প্রার্থনা করতে হয়, কীভাবে বিনীত হয়ে দান করতে হয়, শুদ্ধভাবে বাঁচতে হয়। এই পৃথিবীতে কল্যাণময় কাজ করো, পাপের যুগে এটিকে উদ্ধার করো।’
এ পর্যন্ত হয়তো আমরা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি, নানক আসলে যা করেছিলেন তা হচ্ছে হিন্দু আর ইসলাম ধর্ম থেকে খানিকটা অংশ নিয়ে, নতুন একটি ধর্মের মোড়কে এটি উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু এরপরে তিনি যা করেছিলেন সেটি ছিল বৈপ্লবিক আর খুবই স্বতন্ত্রচক এবং এটি এখনো সেটি দাবি করতে পারে। তিনি সবাইকে একসাথে বসে খাদ্যগ্রহণ করাতে পেরেছিলেন। এটি শুনতে নতুন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে নাও হতে পারে। কিন্তু ধর্মের ইতিহাসে এটি ছিল বৈপ্লবিক। ধর্মীয় সমাজগুলোয় বিশ্বাসীদের অবশ্যই শিখতে হয়, কাদের সাথে খাদ্যগ্রহণ করতে তাদের অনুমতি আছে, আর কাদের ক্ষেত্রে এটি নিষিদ্ধ। এমনকি এর একটি কারিগরি নামও আছে : কমেনসালিটি, যার অর্থ যে গোষ্ঠীর সদস্যদের একই টেবিলে বসার অনুমতি আছে। আর কাদের সাথে বসে তারা খেতে পারবেন না সেটি বলায় অনেক শক্তি ব্যয় হয়েছে। এর কারণ বিশুদ্ধতার সেই ধারণাটি, অপবিত্র খাদ্য আর অপবিত্র মানুষ আছে এমন বিশ্বাস ধর্মীয় মনে খুব গভীরে প্রোথিত। যদি আপনি তাদের স্পর্শ করেন আপনি নিজেকে ঈশ্বরের কাছে ঘৃণ্য করে তুলবেন এবং আপনার বিশুদ্ধিকরণ তখন আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন। এটি সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী সেই দেশগুলোয়, যেখানে জাতপ্রথা অথবা বর্ণবৈষম্য আর বিভেদের প্রচলন আছে। হিন্দু জাতপ্রথাতেও এটি আছে, যেখানে এমনকি অস্পৃশ্য কারো ছায়া যদি ব্রাহ্মণের মধ্যাহ্নভোজনের উপর পড়ে সেটি অপবিত্র হয়ে যায় এবং সেই খাওয়া অবশ্যই ফেলে দিতে হবে।
হিন্দুধর্মই একমাত্র ধর্ম ছিল না, যেখানে এই ধরনের বৈষম্যের অনুশীলন করা হয়েছে। এটি ইহুদি ধর্মেও আছে। সেখানে অপবিত্র জাত আছে যেমন, তেমনি আছে অপবিত্র খাদ্য। যিশুর ওপর আনীত অভিযোগগুলোর একটি ছিল, তিনি এইসব ধর্মীয় প্রতিষিদ্ধতার প্রতি কোনো নজর দেননি এবং উপেক্ষা করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র পাপীদের সাথে কথাই বলেননি, তাদের সাথে খাদ্যও গ্রহণ করেছিলেন। যে চার্চ যিশুর পথ অনুসরণ করছে বলে দাবি করেছিল সেটিও খুব শীঘ্রই তার উদাহরণ অনুসরণ না-করার যথেষ্ট কারণও পেয়েছিল। খ্রিস্টান ধর্মে খাওয়ার নানা প্রতিষিদ্ধতা এখনো আছে। খ্রিস্টীয় উপাসনার মূল একটি বিষয় হচ্ছে একটি ধর্মীয় আচার-নির্দেশিত খাওয়া, যাকে বলা হয় ‘লর্ডস সাপার’ অথবা ‘হলি কমিউনিয়ন’ অথবা মাস’। এটির ভিত্তি ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের সাথে তার মৃত্যুর আগের রাতে যিশুর শেষরাতের খাবার। যখন তিনি তাদের বলেছিলেন তাকে স্মরণ করে এই আচারটি অব্যাহত রাখতে। খ্রিস্টানরা এটি পালন করে আসছেন সেই সময় থেকেই। কিন্তু তারা এটি সবার সাথে খায় না। ক্যাথলিকরা এটি প্রটেস্টান্টদের সাথে খাবেন না। প্রটেস্টান্টরাও আছেন, তারা অন্য প্রটেস্টান্ট, অথবা তাদের নিজেদের বিশুদ্ধতার চক্রের বাইরের এমন কারো সাথে সেটি খাবেন না। আর বহু খ্রিস্টান বিশ্বাস করেন, যদি আপনি পাপ করে থাকেন তাহলে আপনার এটি খাবার কোনো অনুমতি পাওয়া উচিত নয়। এটি অনেকটাই খারাপ ব্যবহারের শাস্তি হিসাবে রাতে না-খেতে দিয়ে বিছানায় শুতে পাঠানোর মতো।
