ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ, আয়ারল্যান্ড ছাড়া, উত্তর-ইউরোপ পুরোপুরি ভাবে প্রটেস্টান্ট ছিল। তাদের নতুন চার্চগুলোও ভিন্নরূপ নিয়েছিল, প্রায়শই পরস্পরের সাথে সহিংস দ্বন্দ্বগুলো অব্যাহত ছিল। কিন্তু ধর্মীয় সংকটের শিকার হিসাবে ইউরোপই একমাত্র মহাদেশ ছিল না, এটি ভারতেও ঘটেছিল। সুতরাং ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডে রিফরমেশন পৌঁছালে সেখানে কী ঘটেছিল সেটি দেখার জন্যে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করার আগে, আমরা আরো একবার আঁকাবাঁকা পথ নেব ভারতে কী ঘটেছিল সেটি দেখতে।
২৯. নানকের সংস্কার
মার্টিন লুথার সম্ভবত তাকে পছন্দ করতেন না এবং এই অনুভূতিটাও পারস্পরিক হতো, কিন্তু শিখধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকের সাথে তার অনেকক্ষেত্রেই মিল ছিল। তারা দুজনেই একই উন্মাতাল সময়ের বাসিন্দা ছিলেন। নানক জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৪৬৯ সালে আর লুথার ১৪৮৩ সালে নানক মারা গিয়েছিলেন ১৫৩৯ সালে আর লুথার এর সাতবছর পরে ১৫৪৬ সালে। তারা কখনোই পরস্পরের সম্বন্ধে কিছু জানতে পারেননি এবং তাদের দুজনের বাসস্থানের মধ্যে চার হাজার মাইলের ব্যবধান ছিল। নানক ছিলেন ভারতে আর লুথার ছিলেন জার্মানিতে। কিন্তু তারা দুজনেই যে-ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই ধর্মের একজন সংস্কারক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। দুজনের জীবনাচরণ আর বিশ্বাসের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, কীভাবে সত্য আর বিশুদ্ধতার অনুসন্ধানে ধর্মগুলোর মধ্যে বিভাজিত হবার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
একজন ‘শিখ’ হচ্ছে গুরু নানক এবং তার উত্তরসূরি নয়জন গুরুর শিষ্য অথবা অনুসারী। যদিও নানকই মূলত ছিলেন শিখবাদের প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু যে-বিশ্বাসের ধারণাটি তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেটি ১৭০৮ সালে দশম এবং শেষ গুরুর মৃত্যু না হওয়া অবধি এর পূর্ণ রূপ পায়নি। গুরু’ হচ্ছেন একজন শিক্ষক, যিনি ঈশ্বরের অর্থ সুস্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে পারেন, এবং ঈশ্বরের উপস্থিতিকে বাস্তব অনুভূত করাতে পারেন। মারা যাবার আগে গুরু নানক গুরু অঙ্গদকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাকে অনুসরণ করতে। এবং ১৫৫২ সালে গুরু অঙ্গদ মারা যাবার আগে তিনি অমর দাসকে তার উত্তরসূরি হিসাবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এভাবেই শিখধর্মে গুরুদের এই গুরু-শিষ্যের ধারাবাহিক উত্তরসূরি হিসাবে দায়িত্বগ্রহণ অব্যাহত ছিল যতদিন-না এই ধারাবাহিকতা ১৬৭৬ সালে এর দশম গুরু, গোবিন্দ সিং অবধি পৌঁছেছিল।
এরপর কিছু কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা ঘটেছিল। গুরু গোবিন্দ সিং কোনো উত্তরসূরি চিহ্নিত না করে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এখন থেকে শিখসমাজে গুরু, যিনি ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তিনি দুটি ভিন্ন কিন্তু সম্পর্কযুক্ত উপায়ে অস্তিত্বশীল হবেন। প্রথম, শিখদের পবিত্র গ্রন্থ হবে। ‘গুরু’, যাকে বলা হয়, ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’, কোনো শিখ মন্দির বা গুরদুয়ারায় (গুরু অভিমুখে দরজা) অনুসারীদের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতির প্রতীক হিসাবে এটি প্রধানতম ভূমিকাটি পালন করবে।
গুরুর উপস্থিতির দ্বিতীয় রূপটি হবে বিশ্বাসীদের একটি সমাজ, যারা শিখধর্মে দীক্ষিত হবেন, ‘গুরু খালসা পথ’ অথবা বিশুদ্ধ পথের শুরু। রিফরমেশনের সময় খ্রিস্টধর্মে আবির্ভূত হওয়া কিছু চার্চের মতো, শিখ ধর্মানুসারীরাও তাদের বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে যাজকদের একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশ্বাস রাখেননি। বিশ্বাসীদের নিজেদের আর তাদের ঈশ্বরের মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারীর আবশ্যিকতা নেই। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে সব বিশ্বাসীরাই সমান। সুতরাং হয়তো এটি শিখদের ভারতীয় ধর্মের প্রটেস্টান্ট এবং বিশুদ্ধ পথের গুরু’দের খ্রিস্টধর্মের সংস্কারকদের প্রিয় সব বিশ্বাসীদের যাজক ভাতৃত্ব’ হিসাবে ভাবতে সহায়তা করতে পারে। শিখধর্মে অন্যকিছু দিকও আছে যেগুলো ভারতীয় প্রটেস্টান্টবাদের একটি রূপ হিসাবে ভাবা যেতে পারে। কিন্তু আসুন এখন আমরা শিখবাদের প্রথম গুরু, নানকের কাছে ফিরে যাই, কীভাবে এটির সূচনা হয়েছিল তা দেখতে।
হিন্দু ব্যবসায়ী জাতের পিতামাতার পরিবারে নানক জন্মগ্রহণ করেছিলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাঞ্জাবে। তখন দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দুধর্ম আর সবচেয়ে প্রাধান্য বিস্তারকারী ধর্ম ছিল না। এই জায়গাটি দখল করেছিল ইসলাম। মুসলিম বণিকরা অষ্টম শতাব্দীতে প্রথম ভারতে এসেছিলেন, এবং তারা তাদের ধর্মবিশ্বাসও তাদের সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। চিরকালের মতোই, অতিথিপরায়ণ ভারত যে-কোনো রূপে ধর্মের বিস্তারে সহায়ক হয়েছিল এবং অন্য বহু ধর্মের একটি হিসাবে ইসলাম উপমহাদেশে তার শিকড় প্রোথিত করেছিল। তারপর দশম শতাব্দীতে পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তান থেকে মুসলমানরা পাঞ্জাবে ঝটিকা আক্রমণ করতে শুরু করেছিলেন। সেই সময়ে ধর্মকে সবার উপরে চাপিয়ে দেবার চেয়ে বরং সম্পত্তি লুণ্ঠন করাই অবশ্য তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। কিন্তু নিশ্চয়ই তারা উপমহাদেশের বহুঈশ্বরবাদ আর পৌত্তলিকতার ধর্মগুলো দেখে বিতৃষ্ণ হয়েছিলেন।
মুসলমানদের এই আগ্রাসন অব্যাহত ছিল, এবং যখন পঞ্চদশ শতাব্দীতে নানকের জন্ম হয়েছিল, তখন মুঘল সাম্রাজ্য ভারতে এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল। মুঘলদের উৎস মূলত মধ্যএশিয়ার মঙ্গোলিয়ায়, কিন্তু যখন তারা ভারতে এসে পৌঁছেছিলেন, তার আগেই তারা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। যখন নানক বালক ছিলেন, তখন ভারতের সম্রাট ছিলেন একজন মুসলমান ব্যক্তি। কিন্তু হিন্দু সর্বজনীনতা এই নতুন শাসকদের খানিকটা প্রভাবিত করেছিল, আর মুঘল সাম্রাজ্যও বিভিন্ন ধর্মীয় ধারণার প্রতি সহিষ্ণু ছিল। সুতরাং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে সংকল্পবদ্ধ নানকের সামনে বাছাই করার জন্য দুটি বিকল্প ধর্ম ছিল, হিন্দুধর্ম? নাকি ইসলাম?
