প্রটেস্টান্ট চার্চের ক্ষেত্রে সেই একই কথা বলা যাবে না। যদি আমরা সেই সমুদ্র আর নৌকার রূপকটা আরো কিছুটা সময় অব্যাহত রাখি, তাহলে বলা যাবে একটি জাতীয় পতাকার নিচে বড় কিছু জাহাজ থেকে, প্রটেস্টান্টবাদ খুব দ্রুত বহু পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার একটি বিশাল বহরে পরিণত হয়েছিল, যাদের কোনো কোনোটি ডিঙিনৌকার মতোই আকারে ক্ষুদ্র ছিল। আর দুটি নিয়ামক এই বহুবিভক্ত হবার প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা রেখেছিল। প্রধান কারণটি ছিল, বাইবেল। একবার যখন আপনি কোনো একটি বইকে একক কর্তৃত্বের অধীন থেকে মুক্ত করেন, এটি বহু ধরনের ব্যাখ্যার বিষয়ে পরিণত হয়। বিশেষ করে যদি বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে, এটি ঈশ্বর-অনুপ্রাণিত একটি বই। বিশ্বাসের দ্বারা সত্যতা প্রতিপাদনের বিষয়টি লুথার বাইবেলেই আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু সেখানে আরো বহু জিনিসও পাওয়া যাবে, যেগুলো অধিকাংশই স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। সর্বোপরি, বাইবেল হচ্ছে বইয়ের একটি লাইব্রেরি, বহু শতাব্দী ধরে যে-বইগুলো লিখেছিলেন এবং পুনর্লিখন করেছিলেন অজ্ঞাত বহু লেখক-সম্পাদক-লিপিকারকরা। সেখানে সবার জন্যে কিছু-না-কিছু আছে, যা নির্ভর করে সেই প্রয়োজনীয়তা আর ভয়ের ওপর, যা তাদের পরিচালিত করে। কিছু নতুন প্রটেস্টান্ট চার্চ নিউ টেস্টামেন্টের চেয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টের দ্বারাই আরো বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিল। আমরা সেই প্রভাবগুলো দেখব যেভাবে বিভিন্ন জাতির ওপর রিফরমেশন আন্দোলনটি তার চূড়ান্ত প্রভাব ফেলেছিল। আমরা আরো দেখব কীভাবে ধর্মে একটি চূড়ান্ত কর্তৃত্বের আদিম সেই চাহিদাটি অভ্রান্ত একজন পোপ থেকে অভ্রান্ত বাইবেলের ওপর সরে এসেছিল।
প্রটেস্টান্টদের মধ্যে বিভাজনের অন্য কারণগুলোর মধ্যে ছিল, যেভাবে এই সংস্কার-আন্দোলনটি একক ব্যক্তি মানুষকে মুক্ত করেছিল। গতানুগতিক ধর্ম সাধারণ মানুষকে খুব বেশি নির্বাচন করার স্বাধীনতা দেয়নি। চার্চের পরিচালনায় থাকা বিশপ আর যাজকরা তাদের যা কিছু বলেছেন তা নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। একক ব্যক্তি মানুষের সচেতন বিবেকের শক্তি আর ঈশ্বরের সাথে ব্যক্তিগত একটি সম্পর্কের ওপর তাদের অধিকারকে স্বীকার করার মাধ্যমে রিফরমেশন ঐ ধরনের সব কর্তৃত্ববাদিতাকে ধ্বংস করেছিল। একক ব্যক্তি মানুষ শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের মধ্যস্থতায় ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন- এমন ধারণা রিফরমেশন আন্দোলনটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। অ্যাপোস্টলিক ধারাবাহিকতায় যাজক হিসাবে দীক্ষিত হয়েছেন শুধুমাত্র তারাই নয়, এটি সব বিশ্বাসীদের ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি যাজক সংগঠনের ধারণার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল। আর সে-কারণে একটি একক প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রটেস্টান্টবাদকে সংগঠিত করার কাজটি ছিল খুবই কঠিন। কারণ এধরনের সংগঠনে সবসময়ই কিছু বিদ্রোহী বিশ্বাসীরা থাকেন, যারা দায়িত্বে থাকা মানুষগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে থাকেন। আর যদি তাদের কথা শোনা না হয়, তারা সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন।
রিফরমেশন চার্চগুলোর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি কিন্তু ছিল, তারা কখনোই চ্যালেঞ্জ করেননি যেভাবে এর বিরোধীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় এটি ব্যবহার করে কনস্টান্টিন খ্রিস্টধর্মকে কলুষিত করেছিলেন। লুথার ভালোবাসার পথ-সংক্রান্ত তার অন্তদৃষ্টিটির খানিকটা ঝলক অনুভব করেছিলেন, কিন্তু স্বর্গ আবার এর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর প্রতিপক্ষের সাথে বোঝাপড়ায় লুথার তাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ যে প্রতিপক্ষ, তাদের মতোই নিষ্ঠুর ছিলেন। তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হলে, শক্তি প্রয়োগ করতে তিনি কখনোই দ্বিধাবোধ করেননি।
আর ঠিক সেটাই লুথার করেছিলেন যখন জার্মানির কৃষকরা, চার্চের শক্তির বিরুদ্ধে রিফরমেশনের চ্যালেঞ্জে অনুপ্রাণিত হয়ে, ভেবেছিলেন কেন তারা তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা ভূস্বামীদের কাছ থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। তারা পুরোপুরি দাস ছিলেন না, তবে তার খুব কাছাকাছি কিছু ছিলেন। তারা ছিলেন সার্ফ, কৃষিশ্রমিক–যাদের কোনো অধিকার ছিল না, এবং দারিদ্র্য থেকে নিজেদের মুক্ত করার কোনো উপায়ও তাদের ছিল না। বিশাল বাড়ি আর প্রাসাদের অভিজাতশ্রেণির জন্যে শ্রম দিয়ে জীবন দেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো নিয়তি ছিল না। ঈশ্বরের নির্দেশবলে চার্চ এই ব্যবস্থাকে আশীর্বাদ করেছিল। ধনী ব্যক্তি তার দুর্গে, দরিদ্র তার দরজায়, ঈশ্বর তাদের অভিজাত আর সাধারণ বানিয়েছে, এবং তাদের ভাগ্যে নির্দেশনা দিয়েছে’, একটি জনপ্রিয় হিম বা স্তব সংগীত যেভাবে পরে এটি ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু কৃষকরা বিষয়টি এভাবে আর দেখতে পারছিলেন না। এবং রিফরমেশন তাদের সাহস দিয়েছিল। যদি চার্চ বদলাতে পারে, তাহলে সমাজ কেন বদলাতে পারবে না? যদি মার্টিন লুথার মহাশক্তিশালী রোমান চার্চের ক্ষমতা খর্ব করতে পারে, কেন তারা জার্মান ভূস্বামীদের ক্ষমতা উৎখাত করতে পারবে না?
তাদের বিদ্রোহ, যা পরিচিত পিজান্ট (কৃষক) রিভোল্ট নামে, মাত্র এক বছর স্থায়ী হয়েছিল, ১৫২৪ থেকে ১৫২৫। লুথারের ক্ষুব্ধ আর উৎসাহী সমর্থনে, কর্তৃপক্ষ নৃশংসতার সাথে সেই বিদ্রোহ দমন করেছিল এবং এক লক্ষ মানুষ সেই বিদ্রোহে প্রাণ দিয়েছিলেন। যখন এটি শেষ হয়েছিল, বেঁচে থাকা বাকি কৃষকদের উপর নির্যাতন আর জীর্ণকুটির পুড়িয়ে তাদের গৃহহীন করে দিতে উৎসাহী গুণ্ডাদের দল গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছিল। এটি ছিল আরেকটি উদাহরণ, যেভাবে মানুষকে স্বর্গে নেবার জন্যে ধর্মের এই উন্মত্ততা, এটিকে কীভাবে এই পৃথিবীতে সবার সাথে মিলেমিশে থাকা যায় তার উত্তম কোনো উপায় খুঁজতে অনাগ্রহী করে রাখে। কৃষক-বিদ্রোহে লুথারের এই সংশ্লিষ্টতা হয়তো প্রথম প্রটেস্টান্ট ক্রুসেড হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। পরে আরো অনেকবারই ঘটেছিল, সাধারণত প্রটেস্টান্টদের বিরুদ্ধে প্রটেস্টান্টরাই যুদ্ধ করেছিল। সবকিছুই বদলে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও সবকিছুই আগের মতোই ছিল।
