এসব পাগলামি! এভাবে পৃথিবী পরিচালিত হলে এর সব কাঠামো আর ধর্মসহ সব প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। কিন্তু তারপরও ভালোবাসার দ্বারা পরিচালিত একটি চার্চের সম্ভাবনা, ভিটেনবার্গে তার পড়ার ঘরে, যা লুথার সেই রাতে অনুধাবণ করেছিলেন। যেভাবে তার প্রিয় আদর্শ পল বলেছিলেন, ভালোবাসা সবকিছুর ভার বহন করে, সবকিছুই সহ্য করে। তার সন্তানের প্রতি ঈশ্বরের ভালোবাসাকে কোনোকিছুই পরাজিত করতে পারবে না, এমনকি তাদের নিজেদের বেআইনি কর্মকাণ্ডও। যতই অপরাধী তারা হোক না কেন, ঈশ্বর তাদের ভালোবাসা অব্যাহত রাখেন। ভয় কিংবা ভয়ের কারণে সৃষ্ট কোনো চুক্তি নয়, শুধুমাত্র ভালোবাসাই তাদের রক্ষা করবে।
কিন্তু চার্চ স্বর্গীয় দয়ায় উদ্ভাসিত একটি ধর্মকে মানব-নিষ্ঠুরতার একটি ধর্মে রূপান্তরিত হতে অনুমতি দিয়েছিল। আর সেটাই কনস্টান্টিন করেছিলেন যখন তিনি যিশুর ক্রুশের ব্যানারের নিচে তার শত্রুদের হত্যা করেছিলেন। আর সেটাই ক্রুসেডাররা করেছিলেন, যখন তারা পবিত্র শহরে মুসলমানদের হত্যা করতে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ইনকুইজিশনও সেটাই করেছিল যখন এটি র্যাকের উপরে শুইয়ে ধর্মদ্রোহী অভিযুক্তদের হাত-পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। তারা সবাই ভেবেছিলেন যে, তাদের নিজস্ব সংস্করণের ঈশ্বর অনুসরণ করতে বাধ্য করানোর মধ্যে কোনো ভ্রান্তি নেই। আর এর কারণ তাদের সংস্করণের ঈশ্বর হচ্ছে তাদের নিজস্ব একটি সংস্করণ মাত্র।
লুথার মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন এই সবকিছু কত বেশিমাত্রায় ভুল। এটি ক্যাথলিক চার্চের শক্তি আর লোভের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নতুন একটি পরিবর্তনের আহ্বান জানাতে তাকে শক্তি দিয়েছিল। এভাবে প্রটেস্টান্ট (প্রতিবাদী) ধর্মের সূচনা হয়েছিল, এর নাম যা নির্দেশ করে, এটি কী সমর্থন করে তার চেয়ে বরং এটি কিসের বিরুদ্ধে সেটি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে প্রটেস্টান্টবাদ এর নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেছিল। কিন্তু ক্ষমতার নিষ্ঠুরতার প্রতি এর বিরোধিতা ইউরোপীয় ইতিহাসে অমূল্য একটি উপাদান যুক্ত করেছিল। এবং সময়ে এটি একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নির্যাতনকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
আর যেভাবে সমাজ সেই সময় সংগঠিত ছিল, যদি স্থানীয় শাসকদের সমর্থন আর পৃষ্ঠপোষকতা না থাকত, প্রটেস্টান্ট আন্দোলনটি খুব বেশিদূর অগ্রসর হতে পারত না। ইউরোপ তখন গণতান্ত্রিক ছিল না। সুতরাং এই ‘রিফর্মড’ বা সংশোধিত চার্চগুলোর নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে রাজা এবং ডিউকদের পৃষ্ঠপোষকতার দরকার ছিল। শাসকদের সাথে জোট গঠন করা হয়েছিল এবং নতুন চার্চেরও আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর কিছু বিশ্বাসেও পার্থক্য ছিল। সুতরাং রোম থেকে বড় বিভাজনের পরে নতুন এই ‘বিশুদ্ধ’ চার্চের রূপ কেমন হওয়া উচিত, সেই বিষয়ে মতানৈক্যের কারণে প্রটেস্টান্টদের মধ্যেও ক্ষুদ্র বহুসংখ্যক বিভাজন এসেছিল। প্রটেস্টান্টবাদের প্রতিভা একই সাথে এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও ছিল : এটি যা-কিছু অনুমোদন করে তার সাথে সমঝোতা করার ক্ষেত্রে এর অক্ষমতা।
রোমান চার্চের প্রতিভা ছিল খণ্ডিত হবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবার প্রতি এর প্রতিরোধ। এর এই একচিত্ততা আঠার মতো একই বিশ্বাসের বহু ভিন্নধরনের মানুষকে একসাথে ধরে রেখছিল। এমনকি মাস’ পরিচালনার সময় ল্যাটিনের ব্যবহারও ছিল এই একীকরণেরই একটি প্রক্রিয়া। শুধুমাত্র শিক্ষিতরা এটি বুঝতে পারতেন এবং সেই সময় খুব কমসংখ্যক মানুষই ল্যাটিন বোঝার মতো শিক্ষিত ছিল, এমনকি যাজকদের মধ্যেও সেই সংখ্যা ছিল খুব কম। সুতরাং যে মানুষগুলো ইউরোপজুড়ে মাসে’ যোগ দিতেন, বেদিতে দাঁড়িয়ে ধর্মবক্তৃতা দেওয়া যাজক কী বলছেন সেই বিষয়ে অজ্ঞতায় তারা একীভূত ছিলেন। কিন্তু আবার তারা একইভাবে একীভূত ছিলেন একটি পবিত্র রহস্যময়তায় তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে, যা সর্বত্র একই ছিল। এই সংস্কার বা রিফরমেশন আন্দোলনের শুরুতেই এই একতাটি ভেঙে গিয়েছিল চিরতরে, শুধুমাত্র ক্যাথলিক চার্চ এককভাবে সেটি ধরে রেখেছিল।
‘রিফরমেশন’ আন্দোলনের উত্তেজনার পর ক্যাথলিক চার্চ এর প্রত্যুত্তরে একটি নিজস্ব সংস্কার আন্দোলন সূচনা করেছিল, যা কাউন্টার-রিফরমেশন’ নামে পরিচিত। পোপ তৃতীয় পল ইটালির ট্রেন্টে একটি কাউন্সিল আহ্বান করেছিলেন, যা ১৫৪৫ থেকে ১৫৬৩ অবধি নিয়মিত সভা করেছিল। প্রত্যাশিতভাবেই, এটি মার্টিন লুথারের সব লেখাই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল তবে এটি ক্যাথলিক চার্চকেও সমালোচনা করেছিল, যার বিলাসিতা এবং বাড়াবাড়ি এই লেখাগুলো লিখতে তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
চার্চ যা নিজেকে তাদের দাবিকৃত প্রথম পোপ সেইন্ট পিটারের বার্ক’ বা নৌকা হিসাবে পরিচয় দিতে পছন্দ করত, সেটি রিফরমেশন ঝড়ের ঝাঁপটা সহ্য করে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল, যা এটিকে প্রায় নিমজ্জিত করার ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। মাঝে মাঝে অকস্মাৎ তীব্র হাওয়া দিকভ্রষ্ট করলেও এটি ইতিহাসে আবার তার নিজের জায়গা করে নিয়েছিল, আর কখনোই এটিকে সত্যিকারের বড় কোনো হুমকির মুখোমুখি হতে হয়নি।
