যদিও তিনি তখন অনুধাবন করতে পারেননি, আগত শতাব্দীগুলোয় তার এই অন্তর্দষ্টির প্রভাব কত বিশাল হতে পারে, কারণ লুথারের মনে সেই ভাবনার। সূচনাটাই ছিল মানব-ইতিহাসের একটি ক্রান্তিলগ্ন। এটি দুটি শক্তিকে উন্মুক্ত করেছিল, যা চিরকালের জন্যে ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল : বাইবেল এবং স্বাধীন ব্যক্তি, যারা সরাসরি তাদের ঈশ্বরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব ছিল সেই একতার ভাঙন, যা একটি সময় ক্যাথলিক চার্চ অলঙ্ঘনীয় ভেবেছিল। প্রটেস্টান্ট রিফরমেশনের সূচনা হয়েছিল। পরে কয়েকটি অধ্যায়ে আমরা এর পরিণতি নিয়ে আলোচনা করব।
২৮. মহাবিভাজন
যে অন্তদৃষ্টিটি মার্টিন লুথার অনুধাবন করেছিলেন, সেটি তাকে বলেছিল, তিনি মুক্তি পাবেন, তবে শুধুমাত্র ধর্মীয় কর্তব্য সম্পাদন করে কিংবা ইনডালজেন্স ক্রয় করার মাধ্যমে সেটি আসবে না, তার জন্য ঈশ্বরের ভালোবাসার কারণেই তিনি মুক্তি পাবেন। এটি এমন একটি ধারণা ছিল, যা খ্রিস্টধর্ম কখনোই পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করে নিতে পারেনি। লুথার নিজেও এর বৈপ্লবিক অর্থটি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি নিজেই অন্যদের সাথে তার সম্পর্ক আর আচরণে সে ধরনের মানদণ্ড বজায় রাখতে পারেননি। কিন্তু ধারণাটি তার কাছে এসেছিল এবং এটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
পণ্ডিতরা লুথারের এই অন্তর্দৃষ্টির যে কারিগরি নাম দিয়েছিলেন সেটি নিজেও একটি গল্প বলে। তারা এটিকে বলেছিল ‘জাস্টিফিকেশন বাই ফেইথ’ বা বিশ্বাসের দ্বারা সত্যতা প্রতিপাদন। আর ইঙ্গিতটা আছে এই ‘জাস্টিফিকেশন’ শব্দটির মধ্যে। সেই ধারণাটি ভুলে যান, যা বর্তমানে এর সাথে সংশ্লিষ্ট, যখন কিনা কেউ এমন কোনোকিছু বোঝাতে চেষ্টা করেন যার জন্যে তিনি লজ্জিত এবং যা নিয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। বরং এর পরিবর্তে ভাবুন, কোনো একটি অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে কেউ বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানেন যে, তিনি অপরাধী। এবং তিনি এটিও জানেন যে, বিচারক নিজেও সেটি জানেন। কিন্তু তারপরও তাকে বিস্মিত করে বিচারক তার নায্যতা প্রমাণ বা সত্যতা প্রতিপাদন করেন, এবং তাকে নিরপরাধ ঘোষণা করে মুক্ত করে দেন।
লুথার ঈশ্বরের সাথে মানবতার সম্পর্কটি বুঝতে একটি ভিন্ন উপায় লক্ষ করেছিলেন। ধর্ম মানুষকে এমন একটি ধারণা দেয় যে, ঈশ্বর যেন তাদের শাস্তি দেবার জন্যে অপেক্ষা করছেন। তাদের এমন একটি পরীক্ষার জন্যে নম্বর দেওয়া হচ্ছে, যার প্রশ্নগুলো তারা কখনোই দেখেননি। আর সে-কারণে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগুলো পরস্পরের সাথে এত বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীসুলভ আচরণ করে থাকে। শুধুমাত্র যেন তারাই জানেন পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে। সেই পরীক্ষার জন্যে শুধুমাত্র তারাই আপনাকে প্রশিক্ষণ দিতে পারবে, যে-পরীক্ষার জন্যে জন্মের সময় আপনি নিজের নাম নিবন্ধন করেছিলেন, যখন কোনোকিছু সম্বন্ধে আপনার কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু লুথার ভিন্নভাবে ঈশ্বরকে দেখার একটি পথের সন্ধান পেয়েছিলেন। আর তিনি দেখেছিলেন মূলত ভালোবাসা, যা কোনো আবশ্যিকতা অথবা কোনো শর্ত ছাড়াই পৃথিবীর জন্যে নিবেদন করা হয়েছে। আর যদি সেটি সত্য হয়, তার মানে মানুষ স্বাধীন আর আনন্দের সাথে বাঁচতে পারে, কোনো প্রতিশোধপরায়ণ ঈশ্বরের ভয়ে বারবার পেছনদিকে না তাকিয়ে, যার কাজ হচ্ছে তাদের শাস্তি দেওয়া।
আর লুথারের এই অন্তদৃষ্টির চমকটি কতটা বৈপ্লবিক ছিল, সেটি বুঝতে আমাদের মনে করতে হবে, প্রথাগতভাবে ধর্ম কীভাবে সাধারণত এর কাজ করে থাকে। ধর্মগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে যা সাধারণ সেগুলো ধারণ করা যেতে পারে আবশ্যিক’ শব্দটি ব্যবহার করে। সবাইকে একটি ভয়াবহ নিয়তি থেকে বাঁচানো হচ্ছে ধর্মের কাজ। কিন্তু মুক্তি পেতে হলে তাদের অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু মতবাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং ধর্মীয় আচার পালন করতে হবে। ধর্ম হচ্ছে সেই জিনিস, যাকে রোমানরা বলতেন একটি ‘কুইড প্রো কুও’ বা কোনোকিছুর বদলে অন্য কোনোকিছু। এটা বিশ্বাস করো, ঐ কাজটি করো, এবং ফলাফল আসবে। কখনো এই আবশ্যিকতা নেতিবাচক, যেমন, এটা বিশ্বাস কোরো না, ঐ কাজটা কোরো না। যদি আপনি চাহিদাপূর্ণ কোনো ঈশ্বরের ধারণা মেনে নেন, যার ওপর ভিত্তি করে এটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি অর্থবহ হয়। ধর্ম হচ্ছে একটি আদান-প্রদান, একটি চুক্তি বা একটি বীমা পলিসি। ইনডালজেন্স অবশ্যই তেমন কিছু ছিল। এটি কিনুন, আপনার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে। আর শুধুমাত্র ধর্মই নয়, এভাবে বহু ধরনের মানবিক আদান-প্রদান ঘটে থাকে, কোনো কিছু পাবার জন্যে আপনাকেও সেখানে কিছু বিনিয়োগ করতে হবে। এটি একটি ব্যবসা ছিল।
যেভাবে যিশুর মানবতার সাথে ঈশ্বরের সম্পর্কটিকে দেখেছিলেন, সেটি এমন ছিল না। কিন্তু তিনি যা কিছু বলে গিয়েছিলেন সেগুলো এতটাই ধাঁধার মতো ছিল যে, যারা পরে চার্চ পরিচালনা করেছিলেন, তারা কখনোই তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেননি। যিশু একবার একটি আঙুরক্ষেতের মালিকের গল্প বলেছিলেন, যতক্ষণই কেউ সেখানে কাজ করুক না কেন, তিনি তার সব শ্রমিককে দিনের শেষে একই বেতন দিতেন। মানবতার সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক কোনো চাকরির আইনের ওপর নির্ভর করে, নেই। তিনি বলেছিলেন, এই সম্পর্ক একক ব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, সেই ব্যক্তির বিশেষ প্রয়োজনের ভিত্তিতে এটি নিয়ন্ত্রিত হয়। আরো একটি অস্বস্তিকর কাহিনিতে তিনি বলেছিলেন, একজন তরুণ তার পিতার কাছে তার উত্তরাধিকারের সব সম্পদ দাবি করেছিলেন এবং উজ্জ্বল জীবন কাটিয়ে সেই অর্থ অপচয় করেছিলেন। তারপর তার পিতা বাড়িতে তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন তিরস্কারের একটি শব্দও উচ্চারণ না করে। ঈশ্বর এমনই, যিশু বলেছিলেন, আমরা যেভাবেই আচরণ করি না কেন, তিনি কখনোই আমাদের ভালোবাসা থামিয়ে দেবেন না। নিজেরা সেভাবে ভালোবাসার চেষ্টা করুন।
