মার্টিন লুথার ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে ১০ নভেম্বর আইসলেবেনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন হান্স এবং মার্গারেথ লুথারের ছেলে। যদিও দরিদ্র, এবং সাতটি সন্তান প্রতিপালন করতে সংগ্রামরত, তারপরও মার্টিনের পিতামাতা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যেন তাদের এই বুদ্ধিমান ছেলেটি ভালো একটি শিক্ষা অর্জন করতে পারে। তিনি এরফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলেন এবং ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত অগাস্টিনিয়ান অর্ডারের একজন সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। এর দুই বছর পরে যাজক হিসাবে তিনি দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভিটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। খুব দ্রুত পদোন্নতির জন্যে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর আগে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে একবার রোমে প্রেরণ করেছিলেন তাদের হয়ে একটি আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে।
মফস্বল শহর ভিটেনবার্গের ধীরগতির জীবনে অভ্যস্ত লুথারকে, বিখ্যাত ‘ইটার্নাল সিটি’ রোমের লঘুচিত্ততা, বিলাসিতা আর দুর্নীতি হতবাক আর বিতৃষ্ণ রেছিল। কিন্তু মহান রোমান ক্যাথলিক চার্চের অবস্থা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাসহ তিনি ভিটেনবার্গে ফিরে এসেছিলেন। তিনি তার নিজের আত্মা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন, চার্চ কি আসলেই এর নিজেকে নরক থেকে বাঁচাতে পারার মতো ক্ষমতা রাখে কিনা আর। এই ইনডালজেন্সের অশুভ বাণিজ্য এবং অন্য দুর্নীতি তার দুশ্চিন্তা প্রশমনে কোনো সহায়তা করেনি। কিন্তু তার উৎকণ্ঠার মূল কারণ চার্চ ছিল না। বরং মূলত এর কারণ তিনি বাইবেলের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন এটিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে।
এমন নয় যে, বাইবেল চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। প্রতিদিন ‘মাস’-এর সময় এখান থেকে কিছু অংশ ল্যাটিন ভাষায় পাঠ করা হতো। সেই সময় নাগাদ ক্যাথলিক চার্চ বাইবেলকে শুধু ব্যবহার করত তাদের নিজের কর্তৃত্বের নেপথ্যে শক্তি ও সমর্থন জোগাতে। এটি সেই খ্রিস্টের কথা বলেছিল যিনি বহুদিন আগে পবিত্রভূমিতে বাস করতেন, সেই একই পবিত্রভূমি, যেখানে চার্চ ক্রুসেডারদের এটিকে মুসলমানমুক্ত করতে পাঠিয়েছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, পোপ এখন পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা ভাইকার। বাইবেলের যে-কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন পোপের সমতুল্য। এখন পোপই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি স্বর্গ-নরকের চাবির সংরক্ষক, কোনো একটি বইয়ের পাতায় লেখা কিছু পুরনো শব্দ নয়, যা খুব অল্প কয়েকজনই পড়তে পারতেন, কারণ এটি লেখা ছিল ল্যাটিন ভাষায়। আর মাসের সময় এখান থেকে বাছাইকৃত অংশ উচ্চারণ করা খুব অল্প কয়েকজন যাজকই আসলে বুঝতেন। এটি আবৃত্তি, কুর’আন আবৃত্তির মতো : শক্তিশালী, এমনকি যখন আপনি সেটির একবর্ণও বুঝবেন না।
লুথারের সময় নাগাদ কিছু মানুষ ছিলেন যারা বাইবেল পড়তে ও বুঝতে পারতেন। শুধুমাত্র ল্যাটিন ভাষায় নয়, যে-ভাষায় এটিকে অনূদিত করা হয়েছিল আরো হাজার বছর আগে। লুথারের মতো কিছু শিক্ষিত যাজক মূল হিব্রুভাষায় ওল্ড টেস্টামেন্ট আর মূল গ্রিকভাষায় নিউ টেস্টামেন্ট পড়তে শুরু করেছিলেন। এবং এর বার্তাগুলো তাদের শঙ্কিত করে তুলেছিল। তারা অনুধাবন করেছিলেন, ‘এগুলো স্বয়ং ঈশ্বরের কথা, পোপের মুখ থেকে আসা কিছু শব্দ নয়। বাইবেল সুসংবাদ, যদি আপনি এটি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন এবং খুবই খারাপ সংবাদ, যদি আপনি বিষয়টি ভুল বোঝেন। আর ক্যাথলিক চার্চ যে-বিষয়টি খুব বড়মাত্রায়, ভয়ানকভাবেই ভুল বুঝেছিল, সেটি বুঝতে পেরে লুথার বেশ আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন।
বাইবেল হচ্ছে একটি জনগোষ্ঠীর গল্প, যাদের ঈশ্বর নিজের পছন্দের গোষ্ঠী হিসাবে নির্বাচিত করেছিলেন। এটি একটি বিয়ের মতো বিষয় ছিল। ঈশ্বর ইজরায়েলের সাথে নিজেকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে কনে হিসাবে ইজরায়েল অবিশ্বস্ত ছিল। আর যিশুর সময় নাগাদ তার অবিশ্বস্ত কনে ইজরায়েলের সাথে ঈশ্বরের বিচ্ছেদপর্ব সমাপ্ত হয়েছিল এবং তিনি একটি নতুন কনে নির্বাচন করেছিলেন, আর সেটি হচ্ছে খ্রিস্টীয় চার্চ। ইতিহাসের কি তাহলে পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে? ক্যাথলিক চার্চ কি আর যিশুর পবিত্র কনে নয়? নাকি পার্থিব সফলতা আর এর সাথে আসা সব বিলাসিতা আর সুখানুভূতির দম্ভে সে একজন অবিশ্বস্ত স্ত্রীতে পরিণত হয়েছে?
ইজরায়েল আর ঈশ্বরের মধ্যবর্তী চুক্তিভঙ্গের কাহিনিটি হচ্ছে মূল চাবি, যা দিয়ে আমরা রিফরমেশনের মূল অর্থটি ব্যাখ্যা করতে পারি। এর শক্তি অনুভব করতে আমাদের সেই সুবিশাল দাবিটিকে স্মরণ করতে হবে, যা খ্রিস্টীয় চার্চ নিজের সম্বন্ধে করেছিল। এটি নারী-পুরুষকে পরমানন্দের সুসংবাদ আর অনন্ত দুঃখের খারাপ খবরের বার্তা দিয়েছিল। যদি তারা ঈশ্বরের সাথে তাদের প্রতিজ্ঞায় বিশ্বস্ত থাকত, স্বর্গে তাদের জন্যে অপেক্ষায় থাকত চমৎকার একটি ভবিষ্যৎ। কিন্তু অবিশ্বস্ত হবার মূল্য ছিল সেই অনন্তকালের নির্যাতন, যা বিস্তারিতভাবে চিত্রিত হয়েছে সালিসবুরির সেইন্ট থমাসের চার্চের সেই ‘ডুম’ চিত্রকর্মটিতে।
কীভাবে এই নিয়তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, সেই ভাবনাটি মার্টিন লুথারকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তিনি যখন সেইন্ট পলের চিঠিগুলো পড়ছিলেন, আরেকজন নিবেদিতপ্রাণ খ্রিস্টান, তার একটি বোধোদয় ঘটেছিল, ঈশ্বরের বিষয়ে একটি অন্ত দৃষ্টির মুহূর্ত। অশেষ প্রার্থনা কিংবা তীর্থযাত্রা করে তিনি মুক্তি পাবেন না। অথবা পোপের সই করা ইনডালজেন্সও তাকে কোনো সহায়তা করবে না। এগুলো ঈশ্বরের সাথে তার সম্পর্কটিকে একটি বাণিজ্যিক সম্পর্কে রূপান্তরিত করবে, এমন কিছু যা-কিনা তিনি ক্রয় করতে পারেন। কিন্তু তিনি জানতেন ঈশ্বরের ভালোবাসা ক্রয় করা অসম্ভব। তারপর তার হঠাৎ মনে হয়েছিল, তিনি ঈশ্বরের ভালোবাসা ক্রয় করতে পারবেন না কিন্তু তার সেটি করার দরকারও নেই কারণ ঈশ্বর এটি বিনামূল্যেই দান করছেন। এবং ঈশ্বরের ভালোবাসাই তাকে রক্ষা করবে। চার্চের কোনো গোলমেলে চুক্তি নয়। তিনি সেই ভালোবাসার ওপর ভরসা করতে পারেন এবং শুধুমাত্র ঈশ্বরের ওপর ভরসা করতে পারেন, চার্চ কিংবা পোপ নয়, বা অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীর ওপর তার বিশ্বাস রাখার দরকার নেই।
