.
এই যাজকের নাম ছিল ইয়োহান টেটজেল, এবং তিনি চার্চের একটি বিশেষ সংঘের একজন সদস্য ছিলেন, যাদের বলা হতো অর্ডার অব প্রিচারস’ অথবা ‘ডমিনিকানস’। তার বয়স ছিল বাহান্ন বছর, কঠোর প্রকৃতির শক্তিশালী গড়নের একজন মানুষ। এবং তার সময়ে তিনি চার্চের জন্য বেশকিছু নিষ্ঠুর কাজ করেছিলেন।
জুটেরবগ শহরের চত্বরে টেটজেলের এই ভাষণের দুই শতাব্দী আগে, পোপ নবম গ্রেগরী ধর্মীয় আইনপ্রয়োগকারীদের একটি সংস্থা গঠন করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘ইনকুইজিশন’। এর এজেন্ট বা ইনকুইজিটরদের যে-কোনো উপায়ে চার্চের বিরুদ্ধে মিথ্যা সব শিক্ষা আর প্রচারণাগুলোকে সমূলে উৎপাটিত করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই যে-কোনো উপায়ের একটি ছিল শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন। আর সবচেয়ে কার্যকরী নির্যাতনের একটি উপায় ছিল, র্যাক, একটি কাঠের ফ্রেম, যার নিচে দুটি দড়ি শক্ত করে বাঁধা, অন্য দুটি উপরে একটি হাতলের সাথে বাঁধা। অভিযুক্ত ব্যক্তির হাত আর পা এই দড়িগুলোর সাথে বাঁধা হতো, এবং নির্যাতনকারী সেই হ্যাঁন্ডেলটি ঘোরাতেন যতক্ষণ-না তাদের হাড়গুলো এর সন্ধি থেকে কুৎসিত শব্দ করে ছিটকে বের হয়ে আসে। এবং এই নির্যাতনের ফলেও যদি তাদের চাহিদামতো স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব না হয়, নির্যাতনকারীরা সেটি ঘোরানো অব্যাহত রাখেন যতক্ষণ অভিযুক্ত ব্যক্তির শরীর থেকে হাতপা ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটি সেই জগৎ থেকে বহুদূরে যখন যিশু বলেছিলেন, ‘তোমার শত্রুকে ভালোবাসো, যারা তোমাকে গালমন্দ করছে তাদের আশীর্বাদ করো। একটি উদাহরণ কীভাবে পরকালের জীবন নিয়ে ধর্মের মোহ, এটিকে মৃত্যুপূর্ববর্তী জীবনের একটি শত্রুতে পরিণত করে।
টেটজেল ইনকুইজিশনের একজন এজেন্ট ছিলেন। আর মানুষকে প্ররোচিত করতে পারার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতাই মূলত মাইনজের আর্চবিশপকে উদ্যোগী করেছিল তাকে ‘ইনডালজেন্স’ বিক্রয়ের পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দিতে। আর্চবিশপ নিজেও বেশ সমস্যায় ছিলেন। তার বিশাল ডাইওসিস ঋণের ভারে জর্জরিত ছিল। এর ওপর পোপ রোমের সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের জন্যে মোটা অঙ্কের অর্থ চাদা দিতে তাকে তাগাদা দিচ্ছিলেন। আর তখনই আর্চবিশপের মাথায় একটি বুদ্ধি এসেছিল। রোমের সাথে একটি চুক্তি করলে কেমন হয়? তিনি পোপকে রাজি করাবেন যেন আনুষ্ঠানিক ইনডালজেন্স বিক্রয় করার প্রতিনিধি হিসাবে টেটজেল দ্য পারসুয়েডারকে লাইসেন্স দেওয়া হয়, তবে একটি শর্তে, তিনি যে-পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করবেন তার অর্ধেক থাকবে মাইনজের আর্চডাইওসিসে, বাকি অর্ধেক যাবে রোমে। আর ঋণগ্রস্ত আর্চবিশপ আর তার ওপর চাপ দিয়ে টাকা তুলতে চাওয়া পোপ, উভয়পক্ষই লাভবান হবে। এই চুক্তি করা হয়েছিল। আর সে-কারণে টেটজেল তার সার্কাস নিয়ে জুটেরবগে হাজির হয়েছিলেন ১৫১৭ সালের সেই এপ্রিল সকালে। এবং খুব শীঘ্রই টাকা আসতে শুরুও হয়েছিল।
কিন্তু ইন্ডালজেন্স বিক্রির জন্যে দেওয়া টেটজেলের সেই বিজ্ঞাপনী বক্তৃতার কয়েক মাস পরে আরো একজন শক্ত-সমর্থ জার্মান যাজক তাদের এই বোঝাপড়াটি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। খ্রিস্টানরা টাকার বিনিময়ে তাদের স্বর্গে যাওয়া নিশ্চিত করতে পারে, এই ধারণায় ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়ে, তিনি পাশের শহর ভিটেনবার্গের একটি চার্চের দরজার উপর ল্যাটিন ভাষায় লেখা একটি কাগজ পেরেক দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি এই ইনডালজেন্স বিক্রয় করাকে অখ্রিস্টীয় একটি আচরণ বলে নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার সেই লেখাটি জার্মান ও অন্য ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বরের শেষে এটি ইউরোপের মূল আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। রোমে পোপ লিও এটিকে কৌতুক বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মৃদুস্বরে বলেছিলেন, আরেকজন মাতাল জার্মান। মদের নেশা কেটে গেলে সে তার মন পরিবর্তন করবে।
এই ‘মাতাল জার্মান’ ব্যক্তিটি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ যাজক সন্ন্যাসী মার্টিন লুথার। এবং তার মতামত কখনোই তিনি পরিবর্তন করেননি। বরং পোপই তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পোপের হাসি-তামাশা ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়েছিল যখন তাকে জানানো হয়েছিল এই সন্ন্যাসীর সেই লেখাটির কারণে তার ইনডালজেন্স বিক্রয়ের পরিমাণ বেশ কমে গেছে এবং তার তহবিলে টাকা আসার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবেই হাস পেয়েছে। সুতরাং তার সেইন্ট পিটার পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনাটি এখন ঝুঁকির সম্মুখীন। সুতরাং পোপ লিও একটি নির্দেশ জারি করেছিলেন, যাকে বলা হয় ‘পাপাল বুল’, এটি যাজকের পদ থেকে মার্টিন লুথারকে অপসারণ করেছিল এবং তার সব লেখাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। যখন লুথার এই পাপাল বুলের তার অনুলিপিটি হাতে পেয়েছিলেন, তিনি প্রকাশ্যে সেটি আগুনে পুড়িয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন পাপাল বুল ছাড়াও আরো অনেককিছুই তিনি পুড়িয়েছিলেন। তিনি সেই সেতুটিও পুড়িয়েছিলেন, যা তাকে ক্যাথলিক চার্চের সাথে যুক্ত করে রেখেছিল এবং তিনি এর মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন, যে-বিদ্রোহটিকে ইতিহাসবিদরা বর্ণনা করেছিলেন ‘দ্য রিফরমেশন’ নামে। এবং এটি যখন শেষ হয়েছিল, খ্রিস্টীয় ইউরোপ বহুখণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।
