যখন যিশু তার বারোজন ‘অ্যাপোস্টলের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানটির জন্যে পিটারকে মনোনীত করেছিলেন। এবং পিটারের অবস্থান নিয়ে যেন অন্যরা কোনো ধরনের সন্দেহে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে, তিনি এমনকি পিটারকে একটি ডাকনামও দিয়েছিলেন। তার আসল নাম, তার ইহুদি নাম ছিল, সাইমন। কিন্তু যিশু তাকে ডেকেছিলেন তার রক’ বা পাথর হিসাবে, গ্রিকভাষায় ‘পেট্রোস’, ল্যাটিন ভাষায় ‘পেট্রা’। তোমাকে আগে সাইমন নামে ডাকা হতো’, যিশু বলোছলেন, ‘কিন্তু এখন থেকে তোমার নাম হবে সাইমন পিটার, সাইমন দ্য রক। তোমার ওপরেই আমি আমি আমার সমাজ গড়ব’। এবং শুধুমাত্র এটাই নয়।
আপনি কি মনে করতে পারছেন পিটার কোথায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন? এটি ঘটেছিল রোমে, খ্রিস্টানদের উপর প্রথম নির্যাতনপর্বে, ৬৫ খ্রিস্টাব্দে। যেহেতু পিটার রোমে ছিলেন যখন তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল, তিনি নিশ্চয়ই রোমের প্রথম বিশপ ছিলেন। আর যেহেতু তিনি অ্যাপোস্টলদের নেতা ছিলেন, তাহলে আপনি যুক্তি দিতে পারেন পরে যারা তার অনুসরণে রোমে বিশপ হয়েছিলেন তারা এই মর্যাদাটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। সুতরাং রোমের বিশপ, পিটারের উত্তরসূরিও অবশ্যই সব বিশপদের প্রধান হবেন। এই পৃথিবীতে তিনিই হবেন খ্রিস্টের ‘ভাইকার’ বা প্রতিনিধি। পূর্বের চার্চ পিতারা এই যুক্তির সাথে একমত হতে পারেননি। এমনিতে বিষয়টি বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, যখন পিটারকে রোমের প্রথম বিশপ হিসাবে দাবি করা হয়। তার সময়ে খ্রিস্টানরা এমনিতেই বেশিদিন বেঁচে থাকা আশা করতেন না। তাদের বলা হয়েছিল খুব শীঘ্রই যিশুখ্রিস্ট্র ফিরে আসবেন। তাহলে কেন তারা একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করার ঝামেলা মাথায় নেবেন, যা আর সবকিছুর মতোই খুব শীঘ্রই অদৃশ্য হয়ে যাবে?
পূর্বের চার্চের এই যুক্তির ক্ষেত্রে ইতিহাস সাক্ষী ছিল। চার্চ যেভাবে সংগঠিত হয়েছে সেটির জন্য তারা যিশুর চেয়ে বরং সম্রাট কনস্টান্টিনের কাছেই বেশি ঋণী। সুতরাং তারা তাদের ওপরে রোমের পোপের কর্তৃত্ব অস্বীকার করেছিলেন, এবং নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন। সুতরাং পশ্চিমা চার্চের শীর্ষ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন রোমের পোপ। কিন্তু তখনো তার ক্ষমতা কুক্ষীগত করার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। আর এর পরবর্তী পর্যায়টি বুঝতে হলে আমাদের ঐসব আত্মাদের কাছে ফিরে যেতে হবে, যারা অবসন্ন পায়ে পারগেটরির দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
মনে রাখবেন : ধর্মীয় মনের কাছে এই জীবনের সময়কালটি শুধুমাত্র পরকালে অশেষ জীবনের জন্যে একটি প্রস্তুতি ছিল মাত্র। আর কীভাবে আপনি সেই জীবনটি কাটাবেন সেটি নির্ভর করবে এই পৃথিবীতে আপনি কেমন আচরণ করেছিলেন। পাপ আপনাকে নিয়ে যেতে পারে নরকে, অথবা পারগেটরিতে, যদি আপনি একটি সুযোগ পান। আর সে-কারণে মৃত্যুর আগে আপনার পাপের জন্যে। ক্ষমা পাওয়া এত বিশাল একটি ব্যাপার ছিল। কিছু মানুষ অন্য ধরনের একটি খেলা খেলতেন, তারা ব্যাপটাইজ হবার সময়টি আরো বিলম্বিত করতেন এবং তাদের মৃত্যুর আগে আচারটি পালন করে তাদের আগের সব পাপ ধুয়ে ফেলতেন। এর মানে এখানে নিচে, পৃথিবীতে তারা একটি উপভোগ্য জীবনের মোটামুটি নিশ্চয়তা অর্জন করতে পারতেন, এবং পরবর্তী পৃথিবীতে, পরকালে একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন কাটানোর যথেষ্ট পরিমাণ নিশ্চয়তাও পেতেন। কনস্টান্টিন নিজেও সেটি করেছিলেন। তিনি তার ব্যাপটিজম বিলম্বিত করেছিলেন, যতক্ষণ-না তিনি মৃত্যুর সন্নিকটে পৌঁছেছিলেন। তিনি খুব বিচক্ষণতার সাথে এই সময়টি নির্ধারণ করেছিলেন এবং ঠিক সময়মতো তার ব্যাপটিজম অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
আপনার শুধু কয়েক সেকেন্ড ভাবতে হবে অনুধাবন করার জন্যে যে, যদি মানুষকে তাদের সব পাপের জন্যে ক্ষমা করার ক্ষমতা থাকে আপনার এবং স্বর্গে তাদের জায়গা হবে এমন নিশ্চয়তা দিতে পারেন, এটি আপনাকে সব মানুষের ওপর প্রভাব খাটানোর মতো অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ক্ষমতায় বলীয়ান করবে। পোপ বিশ্বাস করতেন তার সেই কর্তৃত্ব আছে। যিশু এটি পিটারকে দিয়েছিলেন এবং তিনি (পোপ) হচ্ছেন পিটারের উত্তরসূরি। দ্বাদশ শতকে পোপরা তাদের এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে শুরু করেছিল এমনভাবে, পরিশেষে এটি ক্যাথলিক পাথরের ভিত্তিতেও ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিল। আর এর জন্যে ইসলামই দায়ী ছিল।
আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকাই, আমরা লক্ষ করব যে, নবীর মৃত্যুর পরে রোম সাম্রাজ্যের দক্ষিণ আর পূর্বাঞ্চলে তারা নাটকীয়ভাবে তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এবং তাদের দখলকৃত জায়গার মধ্যে একটি ছিল প্যালেস্টাইন। সুতরাং জেরুজালেম, সেই পবিত্র শহরটি, যা খ্রিস্টান আর ইহুদিদের কাছে বিশেষ মর্যাদায় পবিত্র ছিল, সেটি মুসলমানদের হাতের মধ্যে এসে পড়েছিল। অবশ্যই মুসলমানদের কাছেও জেরুজালেম পবিত্র একটি শহর ছিল। তাদের নবী কি আব্রাহাম, মোজেস আর যিশুর স্বর্গীয়ভাবে চিহ্নিত উত্তরাধিকারী ছিলেন না?
তবে পোপ বিষয়টি সেভাবে দেখেননি। তার কাছে খ্রিস্টধর্মের সবচেয়ে পবিত্র শহরটি মুসলমানদের দখলে যাওয়া একটি চূড়ান্ত অপমান ছিল। সুতরাং তিনি সেটি পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। একটি বিশাল অভিযান পরিকল্পনা করা হয়েছিল খ্রিস্টান যোদ্ধাদের প্ররোচিত করতে, যেন তারা ইউরোপ থেকে জেরুজালেম অভিমুখে যান এবং এই শহরটিকে ক্যাথলিক চার্চের পক্ষে পুনরায় জয় করে নিয়ে আসতে পারেন। যারা এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে চেয়েছিলেন, এবং যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন তাদের বলা হতো ক্রুসেডার, এই শব্দটির অর্থ কুশদ্বারা চিহ্নিত। কনস্টান্টিনের মতো, যিনি ক্রুশের ব্যানারের নিচে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন রোমের মিলভিয়ান সেতুর নিকটে, ক্রুসেডাররাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় ক্রুশবিদ্ধ যিশুর প্রতীক ব্যবহার করেছিলেন, যারা সেই সময় প্যালেস্টাইন শাসন করছিলেন।
