ক্যাথলিক চার্চের অখণ্ডতা রক্ষার্থে এই বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেণি সৃষ্টি করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে এই কাঠামোর সবচেয়ে সফলতম কার্যকরী উপায়টি ছিল, যেভাবে এটি একজন ব্যক্তির ওপর চূড়ান্ত ক্ষমতা ঘনীভূত করেছিল, আর সেই ব্যক্তিটি ছিলেন রোমের বিশপ–পোপ। যে সময় সাংগঠনিক এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল, রোমের এই বিশপ পদের ব্যক্তিটি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তার মুখের উচ্চারিত শব্দের শুধুমাত্র পৃথিবীর জীবনের ওপরেই কর্তৃত্ব ছিল না, মৃত্যুপরবর্তী জীবনের ওপরে সেগুলোর কর্তৃত্ব ছিল। তিনি যেমন আপনাকে পৃথিবীতে বন্দি করতে পারতেন, এবং একইভাবে অনায়াসে পরকালে আপনার স্বর্গে প্রবেশও নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা রাখতেন। যখন এর ক্ষমতার শীর্ষে, রোমের বিশপের ক্ষমতা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। কিন্তু বহু শতাব্দী সময় লেগেছিল এটি অর্জন করতে। আর কীভাবে এটি হয়েছিল সেটি বুঝতে হলে আমাদের চতুর্থ শতাব্দীতে সম্রাট কনস্টান্টিনের সময়ে ফিরে যাওয়া দরকার।
রোম থেকে রোম সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সবসময় পরিচালিত হয়েছিল এমন ধারণাটি ভুল। তবে এটি তেমনই ছিল ৩৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, যখন সম্রাট কনস্টান্টিন তার রাজকীয় কর্মকাণ্ডের মূল দপ্তরগুলো সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্তে প্রতিষ্ঠা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি একটি বিস্ময়কর সুন্দর শহর নির্মাণ করেছিলেন, নিজের নামেই যে-শহরের নাম রেখেছিলেন কনস্টান্টিনোপল। আজ সেটিকে আমরা তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহর নামে চিনি। শহরটির প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিল। কনস্টান্টিনোপল, সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছিল আর এই শহরটির গর্বিত অবস্থান স্থানীয় বিশপকেও একটি বিশেষ মহিমান্বিত অবস্থান ও মর্যাদা দিয়েছিল। রোম আর কনস্টান্টিনোপলের মতো শহরগুলোর বিশপরা খুবই ক্ষমতাবান ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন, যারা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বিশপদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন।
সাম্রাজ্যের পূর্বাংশের শহরগুলোর বিশপরা নিজেদের ‘প্যাট্রিয়ার্ক’ বলে ডাকতে শুরু করেছিলেন, গ্রিক যে-শব্দটি থেকে এর উৎপত্তি, সেটির অর্থ ‘পিতা’। আর পশ্চিমে তারা নিজেদের পোপ’ হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, শব্দটির ল্যাটিন উৎসের অর্থও হচ্ছে ‘পিতা। তাদের ব্যবহৃত ভাষার ভিন্নতার নেপথ্যে আরো গভীর মতপার্থক্য সৃষ্টি হতে শুরু করেছিল। যদিও তাত্ত্বিকভাবে একই চার্চ, কিন্তু পরস্পর থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছিল। ইতিহাসের বহু বাবিতণ্ডার মতো, বিচ্ছেদ যখন এসেছিল, তখন তার কারণ ছিল চার্চের মূল দায়িত্বে কে আছেন সেই প্রশ্নটিকে ঘিরে। ঈশ্বরের রাজ্য পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা হলে তাদের মধ্যে কে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হবেন এই বিষয় নিয়ে যখন যিশুর অ্যাপোেস্টলরা নিজেদের মধ্যে তর্ক করতেন, তিনি তাদের তিরস্কার করতেন। কনস্টান্টিনোপল আর রোমের বিশপের মধ্যেও একই ধরনের একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। কে শ্রেষ্ঠ, পূর্ব প্যাট্রিয়ার্ক নাকি পশ্চিমের পোপ? আর বিষয়টি মীমাংসা করার জন্যে তখন যিশুও ছিলেন না।
বাস্তবে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রবাহিত হচ্ছিল রোম-অভিমুখে। আর সম্রাট যে এখন রোমের বাসিন্দা নন এই বাস্তবতাটির মানে সাম্রাজ্যের প্রাক্তন রাজধানীতে পোপই সব ক্ষমতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী উৎসে পরিণত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, কনস্টান্টিনোপলে প্যাট্রিয়ার্ক সবসময়ই সম্রাটের চেয়ে কম মর্যাদাশীল ছিলেন, যিনি সারাক্ষণই তার কাজের তদারকি করতেন। ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে দুই পক্ষের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা দ্বন্দ্বের ছাইচাপা আগুনটি প্রবল শিখায় প্রজ্বলিত হয়েছিল, দ্য গ্রেট স্কিজম বা মহাবিভাজন নামে যা পরিচিত পেয়েছিল। খ্রিস্টান ধর্মের সুনির্দিষ্টভাবে দুটি ভিন্ন সংস্করণের সূচনা হয়েছিল : পূর্বের অর্থোডক্স চার্চ আর পশ্চিমের ক্যাথলিক চার্চ, যার পোপ তখন রোমে। এই বিভাজন এখনো আছে, প্রত্যেকটি ধারার নিজস্ব রীতি আর সংস্কৃতি আছে। অর্থোডক্স যাজকদের সাধারণত দাড়ি থাকে, ক্যাথলিক যাজকদের সাধারণত থাকে না। অর্থোডক্স যাজকরা চাইলে বিয়ে করতে পারেন, ক্যাথলিক যাজকরা যা করতে পারেন না। কিন্তু এইসব উপরি পার্থক্যের নেপথ্যে রোমের পোপ যে চূড়ান্ত কর্তৃত্ত্ব অধিগ্রহণ করেছিলেন তার উৎস নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একটি গভীর মতানৈক্য আছে।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সাধারণ ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখা যেতে পারে। আর যাই হোক না কেন, আমরা জানি ক্ষমতা মাদকের মতোই কতটা আসক্তি সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে এবং এটি অর্জন আর কুক্ষীগত করে রাখার জন্যে মানুষ অনেককিছুই করতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবসময়ই তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পবিত্র কাপড়ে আচ্ছাদিত করে রাখার ব্যাপারে সতর্ক থাকেন। এই দ্বন্দ্ব কখনোই মানব-রাজনীতি নিয়ে নয়। এটি সবসময়ই ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের সাথে জড়িত। আমরা এটি ইসলামে শিয়া আর সুন্নী দ্বন্দ্বেও দেখেছি। শিয়ারা তাদের ক্ষমতা দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেনবীর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত একটি আধ্যাত্মিক তত্ত্ব দিয়ে আচ্ছাদিত করেছিল। রোমের পোপের হাতে খেলার মতো একই রকম একটি তাশ ছিল। রোম, সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর, এটাই পোপের খ্রিস্টধর্মের ক্ষমতার নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দাবি করার একমাত্র যুক্তি ছিল না। আরো কিছু দাবি এর সাথে যুক্ত ছিল। যিশুখ্রিস্ট নিজেই সেভাবে সেটি পরিকল্পনা করেছিলেন! আর যুক্তিটি ছিল এরকম।
