এই প্রয়োজনীয়তাটি স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে একটি ‘জায়গা’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল– ‘পারগেটরি’ নাম দেওয়া হয়েছিল সেটির। নরক আর পারগেটরির মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে পারগেটরির একটি বহির্গমন পথ আছে। সেইন্ট থমাস অ্যাকোয়াইনাস এটি কীভাবে কাজ করে সে-বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যদি কোনো ব্যক্তি মারা যায় তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত না করে, তারা পারগেটরিতে একটি দ্বিতীয় সুযোগ পাবে। সেই কাজটি সম্পন্ন করতে পারগেটরির সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হচ্ছে, এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে আশা বেঁচে থাকে। এছাড়া নিশ্চয়ই, এটি যন্ত্রণারও একটি জায়গা, যারা এটি সহ্য করেছেন তারা জানেন এটি চিরস্থায়ী নয়, নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হলে, তাদের জন্যেও স্বর্গের দরজা খুলে যাবে।
পারগেটরি প্রতিষ্ঠা দয়াশীল একটি কাজ ছিল, যা মৃত্যু থেকে খানিকটা পরিমাণ ভয় অপসারণ করেছিল। কিন্তু চার্চ তার নিজের এই দয়াশীলতাকে কলুষিত করতে একটি উপায় খুঁজে বের করেছিল। আর এখানে সেটি ঘটেছিল। চার্চ পারগেটরিকে অর্থ উপার্জনের একটি কৌশলে পরিণত করেছিল, আর সেটি এতই ভয়ানকভাবে গর্হিত একটি কাজ ছিল যে, এটি ক্যাথলিক চার্চকে দ্বিখণ্ডিত করেছিল। কীভাবে এটি ঘটেছিল পরের অধ্যায়ে আমরা তার অনুসন্ধান শুরু করব।
২৬. খ্রিস্টের প্রতিনিধি
চতুর্থ শতাব্দীতে কনস্টান্টিনের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম রোমসাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা হবার পর হাজার বছরের মধ্যে খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা নিপীড়িত একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী থেকে চার্চ এই গ্রহে সবচেয়ে বৃহত্তম আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছিল। একই সাথে আধ্যাত্মিক এবং পার্থিব। শক্তিতে বলীয়ান চার্চ পৃথিবী এবং স্বর্গকে সন্ধিহীন একটি ঐক্যে যুক্ত করার দাবি। করেছিল। একটি বিস্ময়কর প্রতিষ্ঠান, পাপ এবং পুণ্য উভয়ক্ষেত্রেই চমকে দেবার। মতো ইতিহাস এটি ধারণ করে। এটি পৃথিবীর উপর তার প্রভাব বিস্তার করেছিল, যা সম্রাটদের দর্পচূর্ণ করেছিল, নতিস্বীকার করিয়েছিল, একই সাথে সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়েছিল। এবং যদিও এটি ক্রুশবিদ্ধ সেই নবী, যাকে তারা অনুসরণ করে বলে দাবি করেছিল, তার থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে সরে এসেছিল, যিশু তারপরও নেপথ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন, একটি অস্বস্তিকর উপস্থিতি হিসাবে, বিশ্বাসীদের মনে যার প্রভাব কখনোই নির্বাপিত হয়নি।
এয়োদশ এবং চতুর্দশ শতকে এর ক্ষমতার শীর্ষে ক্যাথলিক চার্চ এককভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল, যে-শিক্ষাটি কোনো ধর্মকে অবশ্যই শিখতে হবে ইতিহাসের প্রমত্ত সাগরে যদি এটি নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে চায়। যেমন, আমরা দেখেছিলাম, তাদের বিশেষ প্রকৃতির কারণে ধর্ম খুব সহজেই খণ্ডিত হতে পারে। এই ভাঙনের সূত্রপাত ঘটাতে খুব বেশিকিছুর দরকার হয় না। একজন মানুষের মৃত্যুই সেটি করতে পারে। একটি শব্দের মধ্যে একটি স্বরবর্ণ নিয়ে বিতর্কের কারণেও যেমন হতে পারে। ক্যাথলিক চার্চ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই ভাঙন ঠেকানোর শ্রেষ্ঠতম উপায় হচ্ছে একক ব্যক্তির ওপর সব ক্ষমতা ঘনীভূত করা, এবং তাকে ঘিরে একটি কাঠামো তৈরি করা, যা তার কর্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখবে।
ক্যাথলিক চার্চ সেটি অর্জন করেছিল যাজকদের একটি নিবেদিত অর্ডার বা সংঘ প্রতিষ্ঠা করে, যারা এই বিশাল সংগঠনের নিচের স্তরটির তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা করবেন। ক্যাথলিক যাজকদের জন্যে বিবাহ এবং কোনো ধরনের মানব আনুগত্য গড়ে তোলা নিষিদ্ধ ছিল, যা কিনা তাদের আধ্যাত্মিক দায়িত্বপালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। চার্চই হবে তাদের পরিবার। আর তাদের জন্য আবশ্যিক এই ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের বিনিময়ে তাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছিল বিশেষ সম্মান এবং পবিত্র মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান। আর এটি দেওয়া হয়েছিল একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যাকে ‘অ্যাপোস্টলিক সাকসেশন’ বলা হয় (যিশুর অনুসারীদের সেই ধারাবাহিক উত্তরসূরি)। ইসলামের শিয়াতো সংস্করণে ইমামের মতো, ক্যাথলিক যাজক তাদের কর্তৃত্ব পেতেন মানুষ নয় বরং একটি স্বর্গীয় উৎস থেকে। আর এটি এভাবে কাজ করেছিল।
যিশু বারোজন অ্যাপোস্টল বা প্রথম অনুসারীদের তার লক্ষ্যপূরণে তাকে সহায়তা করতে আহ্বান করেছিলেন। এবং তিনি তাদের মাথার উপর হাত রেখে এই কাজের জন্যে দীক্ষিত করেছিলেন। একই পদ্ধতি ব্যবহার করে অ্যাপোস্টলরাও তাদের কর্তৃত্ব তাদের পরবর্তী অনুসারীদের ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। ক্যাথলিক চার্চ দাবি করে, এভাবে মাথার উপর হাত রেখে অর্পণ করা দায়িত্বের এই উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার শৃঙ্খল কখনোই ভাঙেনি। কল্পনা করুন সুবিশাল। একটি পাইপ-লাইন, যা ইতিহাসে অবিকৃতভাবে প্রবাহিত হয়েছে। এই ধারাবাহিতার শৃঙ্খল ভঙ্গ করে যদি আপনি অন্য কোনো গ্যাস-সরবরাহকারীর গ্রাহক হন, তাহলেই আপনি যিশুর কর্তৃত্ব হারাবেন। ক্যাথলিক বিশপ আর যাজক আর ডিকনরা, যারা এভাবে দীক্ষা পান, তারা একটি বিশেষ বর্ণের সদস্যে রূপান্তরিত হন, যারা সাধারণ মানুষ থেকে পৃথক একটি শ্রেণি। কোনো একটি যাজককে অপমান অথবা আহত করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের একটি অপরাধ। এটি ধর্মদ্রোহিতা, ধর্ম অবমাননা, সরাসরি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে করা একটি অপরাধ। এবং সেভাবেই এই অপরাধের শাস্তি দেওয়া হতো।
