থমাস বেকেটের নামে ইংলিশ শহর সালিসবুরিতে পঞ্চদশ শতাব্দীর একটি চার্চ আছে। বেকেট ছিলেন ক্যান্টারবুরির আর্চবিশপ, রাজা দ্বিতীয় হেনরীর নির্দেশে যাকে তার নিজের ক্যাথিড্রালেই ১১৭০ সালে ২৯ ডিসেম্বর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তার নামের সম্মানে নির্মিত এই চার্চটি চমৎকার একটি পুরনো ভবনে অবস্থিত, যেখানে আলো খুব অনায়াসে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু যখন আপনি মাঝখানে সংকীর্ণ পথ বা আইল দিয়ে ভিতরে হেঁটে যাবেন এর চ্যান্সেল আর্চ যে আর্চ বা খিলানটি চার্চের বেদির আশেপাশের অংশ থেকে চার্চের মূল অংশ বা নেভ থেকে পৃথক করে রাখে) থেকে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে মধ্যযুগীয় একটি ‘ডুম’ চিত্রকর্ম। অ্যাঙলো-স্যাক্সোন ভাষায় এই ‘ডুম’ শব্দটির মানে ‘শেষ-বিচারের দিন’, কিয়ামত বা ডুমস ডে, যখন মৃতদের তাদের কবর থেকে জাগিয়ে তোলা হবে তাদের জীবন সম্বন্ধে ঈশ্বরের চূড়ান্ত রায় শোনাতে। ‘ডুম’ চিত্রকর্মগুলো সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র পরিকল্পিত হতো। কোনো সন্দেহ নেই এই চিত্রটি নিশ্চয়ই খুবই কার্যকরী ছিল।
১৪৭৫ সালে আঁকা চিত্রকর্মটি প্রদর্শন করছে, বিচারকের আসনে আসীন যিশু। তার ডানদিকে পুণ্যবান ব্যক্তিরা, যাদের স্বর্গে প্রেরণ করা হচ্ছে, যেখানে তাদের স্বাগত জানাচ্ছেন ফেরেশতারা। কিন্তু তার বামদিকে পাপীদের নরকে নিচে প্রেরণ করা হচ্ছে, যেখানে দানবরা তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে জাগনের জ্বলন্ত মুখের মতো প্রজ্বলিত নরককুণ্ডে। যে মানুষগুলো এই চিত্রকর্মের দিকে প্রথম তাকিয়েছিলেন, তারা হয়তো এটিকে আক্ষরিকভাবেই গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তাদের মহাবিশ্ব ছিল তিনতলা একটি কেকের মতে, সবার উপর স্বর্গ, মাঝখানে পৃথিবী আর নিচে ছিল নরক। যখন আপনি মারা যাবেন, আপনি উপরে স্বর্গে যাবেন, নয়তো ‘নিচে’ নরকে প্রবেশ করবেন, পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে যার অবস্থান বলে মনে করা হয়। যখন আগ্নেয়গিরিরা গলিত লাভা উগরে দিত, বিশ্বাসীরা ভাবতেন, ‘নরক তার মুখ হাঁ করেছে’, মৃত্যুর পর তাদের জন্য নিচে কী অপেক্ষা করছে পাপীদেরকে তাদের এর খানিকটা স্বাদ দিতে।
খ্রিস্টধর্ম এর চার্চের দেয়ালে শুধুমাত্র নরকের চিত্রই আঁকেনি, তাদের ধর্মীয় বক্তৃতায় এর ভয়াবহতার বিবরণ দেবার জন্যে যাজকরাও তাদের উর্বর কল্পনাশক্তি ব্যবহার করেছিলেন। তার আত্মজীবনীমূলক এ পোট্রেইট অব দ্য আর্টিস্ট অ্যাস এ ইয়ং ম্যান’ উপন্যাসটিতে আইরিশ লেখক জেমস জয়েস একই সামন বা ধর্মবক্তৃতা লিপিবদ্ধ করেছিলেন, যা তিনি তার শৈশবে শুনেছিলেন, যখন যাজক তার কিশোর শ্রোতাদের বলেছিলেন, নরকে জ্বলন্ত সালফিউরাস ব্রিমস্টোন এমনভাবে তৈরি, ‘গেহেনা’র শিখার মতোই, যেন এটি চিরন্তনভাবে জ্বলতে পারে। পার্থিব আগুন, যাজক গর্জন করে বলেছিলেন, ধ্বংস হয়ে যায় পুড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে। যতবেশি তীব্র হবে, তাপের স্থায়িত্ব হবে তত কম। কিন্তু নরকের আগুন যাদের পোড়ায় তাদের মেরে ফেলে না, আর সে-কারণে দহনের যন্ত্রণা কখনোই থেমে যায় না।
ভাবা হয়ে থাকে যে, নরকের অসীম যন্ত্রণার বিবরণ আপনাকে প্রভাবিত করবেই, এমনকি যদি আপনি সেটি বিশ্বাস নাও করেন। কল্পনার মাধ্যমে এমন কোনো ধারণা সৃষ্টি করার ক্ষমতা বিস্ময়করআর বহু শতাব্দী ধরেই মানুষ পরস্পরের সাথে অসহনীয় অশুভ আচরণ করেছে। এমনকি সবচেয়ে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতম শাস্তিও একটি পর্যায় অবধি স্থায়ী হয়, এমনকি সেটি এর শিকারের মৃত্যুর কারণও যদি হয়ে থাকে। কিন্তু নরক ধারণাটির অশুভ প্রতিভা হচ্ছে, এই যন্ত্রণা কখনোই শেষ হয় না। এর বন্দিরা অনন্তকাল কাটায় একটি বর্তমানে যেখানে কোনো তারপর’ নেই, যার দিকে তাকিয়ে কোনো আশা করা যেতে পারে। সালিসবুরি ‘ডুম’ চিত্রকর্মে শিল্পী একটি স্ক্রল যুক্ত করেছিলেন ল্যাটিন মন্ত্রবাক্য দিয়ে, নুলা ইন রেডেম্পশিও’ অর্থাৎ কোনো পরিত্রাণ নেই। স্যালিসবুরির সেইন্ট থমাসের দেয়ালে অজ্ঞাত এক শিল্পীর ঐ শব্দগুলো আঁকার এক শতাব্দী আগে, দান্তে নামের একজন ইতালীয় কবি একটি বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন একটি বিষয়ে, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন, ইনফার্নো’। আর সেখানে তার নরকের দরজায় তিনি একটি সতর্কবাণী লিখে রেখেছিলেন, সবাই, যারা এখানে প্রবেশ করছেন, সব আশা পরিত্যাগ করুন।
এটি সেই একই বার্তা। নরক অশেষ এবং আশাহীন একটি জায়গা, সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম একটি নিয়তি যা-কিনা কোনো মানুষের ভাগ্যে ঘটতে পারে। একটি বিষয় স্মরণ করা লক্ষণীয় যে, সেইন্ট থমাস অ্যাকোয়াইনাস, ক্যাথলিক চার্চের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মতাত্ত্বিক–এবং একই সাথে যিনি দয়াল একজন মানুষ বলেছিলেন, স্বর্গের একটি বাড়তি আকর্ষণ হচ্ছে, এখানে সুবিধাজনক একটি বারান্দা থাকে, যেখান থেকে স্বর্গের বাসিন্দারা নিচে নরকে অভিশপ্তদের যন্ত্রণাভোগ দেখতে পারেন : যেন সাধুদের পরমানন্দ আরো বেশি সুখকর অনুভূত হয়, সে-কারণে অভিশপ্ত পাপীদের শাস্তি ভালোভাবে লক্ষ করার সুযোগ দেওয়া হয় তাদের। সুতরাং নরক হচ্ছে পাপীদের জন্য দুঃখ আর পরিত্রাণপ্রাপ্ত পুণ্যবানদের জন্যে পরমানন্দ।
যতটুকু আমরা দেখলাম, পুরোটাই ভয়াবহ একটি চিত্র। কিন্তু এর চরম শিক্ষাগুলো শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় মাত্রায় পরিবর্তন করার ধর্ম বেশ দক্ষতাও প্রদর্শন করে। আমরা দেখেছি মুসলিম পণ্ডিতরা প্রস্তাব করেছেন, অদৃষ্টবাদের মতবাদ, কুর’আনে যার বিবরণ আছে সেটি একজন পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। এমন কিছুই ঘটেছিল ক্যাথলিক চার্চের নরকের ধারণার সাথেও। সেখানে কি কোনো মধ্যম পথ থাকতে পারে না সেই মানুষগুলোর জন্যে, যারা মৃত্যুর পর স্বর্গে প্রবেশের জন্যে যেমন যথেষ্ট ভালো নয় আবার নরকে নিক্ষিপ্ত হবার জন্য যথেষ্ট খারাপও নয়? ব্যাপারটি কি চমৎকার হবে না, যদি আমরা একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করি, যেখানে পাপীদের নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে, স্বর্গে প্রবেশের ভর্তি-পরীক্ষায় আবার বসার জন্যে প্রস্তুত করা যাবে?
