আর যারা দূরে পশ্চিমে বাস করতেন তাদের প্রত্যাশা অস্তিত্বের বিশাল চক্র থেকে চূড়ান্তভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আশার ওপর নির্ভরশীল কোনো ধারণা ছিল না, বরং মৃত্যুর পরে অব্যাহত জীবনের ভিন্ন একটি সংস্করণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ‘হেল’ বা নরক শব্দটির একটি আদি আবির্ভাব, শব্দটির অর্থ কী হতে পারে সেই বিষয়ে একটি আভাস দেয়। ইংল্যান্ডের প্রাচীন অ্যাঙলো-স্যাক্সোন ভাষায় ‘হেল’ শব্দটির অর্থ ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ বা পাতালপুরী, যেখানে পরলোকগত আত্মাদের বসবাস। ওল্ড টেস্টামেন্টে এটিকে ‘শিওল’ নাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটি ভীতিকর কোনো জায়গা নয়। এটি শুধু বিষণ্ণ একটি এলাকা। যেমন করে হয়তো আমরা এখন বলতে পারি, এটা নরকের মতোই বিষণ্ণ। সেই মানুষগুলোর মতো, যারা খুব ভয়ানক কোনো রোগ থেকে কখনোই আরোগ্য লাভ করেন না, পাতালপুরীতে আত্মারা ছায়ামূর্তির মতো একসাথে অবস্থান করেন এমন কোনোকিছুর অপেক্ষায়, যা কখনোই আসে না।
কিন্তু ধর্মের ইতিহাসে কিছু কখনোই অপরিবর্তিত থাকে না, এবং এমনকি মৃত্যুপরবর্তী পরকালের ধারণাটিতেও পরিবর্তন এসেছিল। ব্যাবিলনে ইসরায়েলবাসীদের নির্বাসনের সময় পারস্যের কিছু ধারণা ইহুদি ধর্মের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। তাদের একটি ছিল, মৃত্যুর পর আত্মারা সেই নিরানন্দ রোগমুক্তির পর ধীরে আরোগ্যলাভ করার পাতালপুরীর হাসাপাতালের স্থায়ী বাসিন্দায় পরিণত হন না। হয় তারা স্বর্গের পরমসুখে প্রবেশাধিকার জয় করেন, নয়তো নরকে অনন্ত যন্ত্রণাভোগ করার শাস্তি হয় তাদের। পরকালের এই সংস্করণটি ইহুদি ধর্মে কখনোই সম্পূর্ণরূপে সম্মতি আদায় করে নিতে পারেনি। কিন্তু প্রথম শতাব্দীতে এর কিছু সমর্থক ছিলেন, তাদের একজন ছিলেন যিশু। যদিও তিনি এটি নিয়ে বেশি কথা বলেননি, তবে তিনি নরকের অস্তিত্ব আছে এই ব্যাপারটিকে খুব স্বাভাবিক হিসাবেই মেনে নিয়েছিলেন। এবং যে-শব্দটি তিনি এর জন্যে ব্যবহার করেছিলেন, সেটি এটিকে নতুন আর ভীতিকর একটি অর্থ প্রদান করেছিল।
যিশু বলেছিলেন, যারা শিশুদের ঘৃণা ও কোনো ক্ষতি করেন, তাদেরকে ‘গেহেনায়’ নিক্ষেপ করা হবে, সেই ‘আগুনে, যার তৃষ্ণা অনিবারণযোগ্য’। কিছু পুরনো হিব্রু লেখায় ‘গেহেনা’ হচ্ছে এমন একটি জায়গা যেখানে শেষ-বিচারের (জাজমেন্ট ডে) পরে পাপীদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। পরের কিছু বর্ণনা দাবি করেছিল, জেরুজালেমের ময়লা যেখানে ফেলা হতো, সেই জায়গাটির নাম ছিল এটি, যেখানে ময়লা পোড়ানো হতো, আর এটি সারাক্ষণই জ্বলত কারণ সেখানে নিরন্তর ময়লা ফেলা অব্যাহত থাকত। এখন বলা অসম্ভব, যিশুর আসলে মূল উদ্দেশ্যটি কী ছিল যখন তিনি নিরন্তর শাস্তির একটি রূপক হিসাবে এটি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু এমন একটি চুল্লি যা নিরন্তর জ্বলতে থাকে।
কিন্তু এমন একটি চুল্লি যা নিরন্তর জ্বলতে থাকে সেটি নরক-সংক্রান্ত বর্ণনায় অপরিহার্য যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। আরো ছয় শতাব্দী পর যখন কুর’আন লেখা হয়েছিল, যাদের অনন্তকালের শাস্তির জন্য দণ্ডিত করা হবে, তারা একটি চুল্লির নিশ্বাস শুনতে পাবেন, যখন এর দিকে তারা এগিয়ে যাবেন। এবং যখন তাদের আগুনের শিখায় নিক্ষেপ করা হবে, সেখানকার পাহারাদার তাদের জিজ্ঞাসা করবে : ‘সতর্ক করে দেবার মতো কেউ কি তোমাদের কাছে আসেনি?”
খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ থেকে নরকের বর্ণনায় কুরআন আরো বেশি বিস্তারিত। এবং এটি খুব ভালোভাবেই জানত এটি কী করছে যখন এটি খুঁটিনাটিসহ নরকের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছিল। বার্তাটি ছিল, যদি মানুষ নবীর সতর্কবাণী উপেক্ষা করে তাহলে নরকের আগুনের শিখা শুধু তাদের টেনেই নেবে না, বাড়তি যন্ত্রণা হিসাবে তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানিও ঢালা হবে। নবীর সময়ে নরকের ব্যবস্থাপকরা মোটামুটি সব গুছিয়ে ফেলেছিলেন এবং তারা জানতেন কীভাবে কার্যকরী আর ভীতিকর একটি পদ্ধতি পরিচালনা করতে হয়। ভয় দেখিয়ে ধর্ম পালন করানো সবসময়ই একটি কার্যকরী কৌশল ছিল। খ্রিস্টধর্ম ইসলামের সাথে এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে অসুবিধার মুখোমুখি হয়েছিল, সেটি হচ্ছে কুরআন নিউ টেস্টামেন্টের চেয়ে অনেক বেশি ভীতিকর। সুতরাং এই প্রতিযোগিতায় আরো খানিকটা বেশি কৌশলী হতে খ্রিস্টধর্মও বাধ্য হয়েছিল। হয়তো চার্চের পবিত্র বইটি ভীতিপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে কুর’আনকে হারাতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু এর অস্ত্রভাণ্ডারে একটি অস্ত্র ছিল, যা মুসলমানদের কাছে ছিল না।
ইসলামের ব্যতিক্রম, ক্যাথলিক চার্চ ছবি বা কোনো চিত্র সৃষ্টি ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বাইবেলের দ্বিতীয় নির্দেশনাটির নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কখনোই খুব বেশি বিচলিত হয়নি। এটি বিশ্বাস করত ঈশ্বরের গুণকীর্তনে এবং খ্রিস্টীয় বার্তাটিকে সাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে শিল্পকলাকে এর সব রূপে ব্যবহার করা যেতে পারে। সুতরাং ক্যাথলিক চার্চ শিল্পীদের অন্যতম সেরা পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তাদের ধর্মবিশ্বাস প্রচার এবং উদযাপন করতে এটি সংগীত আর স্থাপত্য ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সবধরনের শিল্পকলার মধ্যে, চিত্রকর্ম সৃষ্টি করতে এটি দারুণভাবে ভালোবাসত। এর মানে যখন মুসলমানরা শুধুমাত্র নরকের বর্ণনা দিতে শব্দের ব্যবহার করেছে, খ্রিস্টানরা সেটি চিত্রকর্মে জীবন্ত করে আঁকতে পারতেন। আর সবাই জানেন যে, একটি ছবি হাজার শব্দের সমান হতে পারে। সুতরাং নরক-সংক্রান্ত বার্তাটি দিয়ে যেন খুব স্পষ্টভাবে এর অনুসারীদের সাথে সংযোগ করা যায়, তারা চার্চের দেয়ালে নরকের বীভৎস যন্ত্রণার ভীতিকর সব চিত্র এঁকেছিলেন। এখানে যেমন একটি উদাহরণ।
