কুর’আনে বহু সুরা আছে, যেখানে স্বর্গ আর নরকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমি সবচেয়ে বিখ্যাতটির বর্ণনা দেব। সুরা ৫৬ য়, ‘শেষ বিচারের দিনে বেহেশত বা স্বর্গকে বর্ণনা করা হয়েছে আনন্দ আর সুখের একটি বাগান হিসাবে, যার বিবরণ শুনলে মনে হয় যেন সেটি মানবপ্রজাতির শুধুমাত্র পুরুষ-সদস্যদের জন্যই বিশেষভাবে পরিকল্পিত হয়েছে। সেখানে সারাক্ষণ মদের ঝর্না বহমান, যে মদ পান করলে কেউ যেমন মাতালও হবে না, তেমনি মদ্যপান-পরবর্তী অসুস্থতায় আক্রান্তও হবেন না। পৃথিবীতে তারা যে কষ্ট সহ্য করেছেন তারই পুরস্কার হিসাবে সেখানে আগত নতুন অতিথিদের উপভোগের জন্য থাকবে সুন্দরী, আয়তলোচনা তরুণীরা। আরো আকর্ষণীয় ব্যাপার, স্বর্গে কোনো অযথা বাদানুবাদ থাকবে না, শুধুমাত্র শান্তি, শান্তি!’ উচ্চারণ ছাড়া। আর এটাই অপেক্ষা করছে সেই মানুষদের জন্যে, যাদের কুরআন বলেছে ডানদিকের সঙ্গী বা কম্পানিয়ন অব দ্য রাইট। আর যারা বামপাশে থাকবেন, কম্পানিয়ন অব দ্য লেফট, তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে ভিন্ন নিয়তি। তাদের জন্যে আছে নরক, দাবদাহের বাতাস, ফুটন্ত পানি, জ্বলন্ত শিখার ছায়া…’।
স্বর্গ আর নরককে রূপক হিসাবে ব্যাখ্যা করে যেতে পারে, সদগুণের পুরস্কার আর অনাচারের পরিণতি নিয়ে কথা বলার একটি উপায় হিসাবে। আবার এগুলোকে আক্ষরিকভাবেই সত্য হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। যদি নরকের অস্তিত্ব থাকে, এর মানে ঈশ্বর তার কিছু সন্তানের নিয়তিতে অসহনীয় যন্ত্রণা নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমরা ইতিমধ্যেই অন্য ধর্মগুলোয় নরকের ধারণাটি আবির্ভূত হতে দেখেছি, সুতরাং, আমরা এখানে কুরআন নিয়ে আলোচনা বন্ধ করব। পরের অধ্যায়ে, আমরা মানবতার বিষণ্ণ একটি আবিষ্কার নিয়ে চিন্তা করব এবং আগুনের কুণ্ড আর ফুটন্ত পানির জগতে একবার ঢু মারব। আমরা নরক। সম্বন্ধে জানব।
২৫. নরক
নরক কী? নরক হচ্ছে নিরন্তর যন্ত্রণা ভোগ করা একটি জায়গা, যেখানে যারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে কোনো অনুশোচনা করেননি, মৃত্যুর পর তাদেরকে সেখানে প্রেরণ করা হয়। খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামে যেভাবে নরকের ধারণাটি আবির্ভূত হয়েছে সেটি সম্বন্ধে যে পূর্ণ ধারণাটি পাওয়া যায় তা হলো, এটি এমন একটি জায়গা যেখান থেকে মুক্তি পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। যদি একবার সেখানে আপনি নিজেকে আবিষ্কার করেন, সেখানে অনন্তকাল আপনাকে থাকতে হবে। সেটাই হচ্ছে নরকের সবচেয়ে ভয়ংকরতম বৈশিষ্ট্য।
বেশ, তাহলে এটি কোথায়? এটি মানুষের মনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। অথবা, এটি মনের সেই অংশে যা ধর্মের বিভিন্ন জগৎগুলো সৃষ্টি করে। আর এটি বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই স্মরণ করতে হবে ধর্মীয় কল্পনা আসলে কীভাবে কাজ করে। এটি দুটি স্তরে কাজ করে। একটি হচ্ছে চিন্তা বা ভাবনার স্তর। জীবন নিয়ে না-ভেবে মানুষ থাকতে পারে না, তারা ভাবেন এর অর্থ কী। মানব ইতিহাসের শুরুতেই মৃতদের সাথে কী ঘটে সেটি নিয়ে তারা ভেবেছিলেন। এবং এই জীবনের পরে আরেকটি জীবন বা পরকালের অস্তিত্ব আছে এমন অনুমানও তারা করছিলেন। মানুষদের মধ্যে ভয়ানক অসাম্যতা নিয়েও তারা ভেবেছিলেন এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, যেহেতু কদাচিৎ এই জীবনে এর মীমাংসা হয়, যদি এই মহাবিশ্বে ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকে, তাহলে পরকালে এই অবিচারগুলোর অবশ্যই মীমাংসা হবে। যখন তারা এইসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অবশ্যই তখন তাদের কাছে পরকাল সম্বন্ধে কোনো বাস্তব তথ্য ছিল না। এটি শুধু অনুমান ছিল, অথবা শুধুমাত্র স্বচারিতা। কিন্তু খুব প্রাকৃতিকভাবেই এটি মানুষের মনের ভাবনা থেকে এসেছিল। আর সে-কারণেই ধর্মতাত্ত্বিকরা এটিকে বলেন ‘প্রাকৃতিক ধর্ম’।
এরপর মনে রিসিভিং বা গ্রাহক বিভাগ বিষয়টিকে তাদের আয়ত্তে নিয়েছিল। এটি মানবমনের সেই অংশটি, যা নানা দৈবদৃশ্য দেখে অথবা কণ্ঠ শোনে। এবং এটি দাবি করেছিল যে, পরকাল সম্বন্ধে এটি সরাসরি তথ্য পেয়েছে। আর সেকারণে এই ধর্মতত্ত্বের বিভাগটিকে বর্ণনা করা হয় রিভিলড রেলিজিয়ান বা স্রষ্টা-কতৃক সরাসরি ‘প্রেরিত’ ধর্ম হিসাবে। প্রাকৃতিক ধর্ম মৃত্যুর সেই পর্দার ওপারে কী আছে সেটা নিয়ে ভেবেছিল, কিন্তু প্রেরিত ধর্মগুলো দাবি করেছে। তারা সেটি দেখেছে। কিন্তু একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যদিও সব জায়গায় প্রশ্নগুলো একই রকম, এর উত্তর এলাকাভেদে ভিন্ন। সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি হচ্ছে ভারতীয় ধর্ম আর খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে।
ভারতের ঋষিদের মতে আত্মা মৃত্যুর পর স্থায়ী কোনো অবস্থায় প্রবেশ করে। অন্য একটি জীবনে এর পুনর্জন্ম হয়, যার সামাজিক অবস্থান নির্ভর করবে ঠিক এর আগেই কাটানো জীবনে এর সঞ্চয় করা পুণ্যের পরিমাণ কী এটি বৃদ্ধি, নাকি হ্রাস করেছিল। হিন্দুধর্মে নরক আর স্বর্গের ধারণা আছে, কিন্তু সেগুলো চূড়ান্ত কোনো গন্তব্য নয়, বরং সেগুলো হচ্ছে যাত্রাবিরতির শিবিরের মতো। এই প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি পেতে হলে বহু মিলিয়ন জীবন হয়তো এভাবে একের-পর এক কাউকে কাটাতে হবে। কিন্তু সবসময়ই সেই আশাটি আছে, সবাই কোনো না-কোনো একসময় এই জন্ম-জন্মান্তরের চক্র থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন, অর্থাৎ মুক্তি পাবেন। এখানে চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাণে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
