ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোতে নেতৃত্ব নিয়ে সংগ্রামকে আমরা অন্যদের ওপর প্রভুত্ব করার মানবিক দুর্বলতার একটি উদাহরণ হিসাবে বাতিল করতে পারি। সেগুলো। ধর্মের পার্থিব দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে। সেই ঘটনাগুলো দুঃখের, তবে অবশ্যম্ভাবী। ঈশ্বরের ঐশী প্রত্যাদেশের মাধ্যমে সৃষ্ট ধর্মগুলো, অন্যদিকে, সরাসরি আমাদেরকে ঈশ্বরের মনের মধ্যে আর স্বর্গের জীবনের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা। সুতরাং খুবই অস্বস্তিকর যখন আবিষ্কার করতে হয় যে, পৃথক আর বিভাজিত হবার সেই একই তাড়না সেখানে উপস্থিত থাকে। এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবন অনেকটাই মৃত্যুর আগের জীবনের মতোই মনে হয়। স্মরণ করুন, কুরআন দাবি করে, যখন পার্থিব এই দৌড়-প্রতিযোগিতার সমাপ্তি হবে, তখন অন্যদিকের সেই। জীবনটি কেমন হবে, এটি আমাদের তা প্রদর্শন করে। দুটি সম্ভাব্য পরিণতি যা প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি আমাদের কারো কারো মনে শঙ্কার সৃষ্টি করতে পারে।
এটি আমাদের বলে, অন্যপাশে প্রত্যেকের জন্যই চূড়ান্ত গন্তব্য ইতিমধ্যেই সুনির্দিষ্ট করা আছে। সেখানে যাবার টিকিটও ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়ে গেছে। বাস্তবিকভাবেই এমনকি আমাদের জন্মের আগেই সেটি বিতরণ করা হয়েছে। এটাকেই বলে ‘প্রিডেস্টিনেশন’ বা অদৃষ্টবাদের মতবাদ (নিয়তিবাদ বা দৈববাদ)। আর ধারণাটি খ্রিস্টধর্মসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসেও আমরা খুঁজে পাই। যেখানেই ধারণাটিকে পাওয়া গেছে, সেখানেই সেটিকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, আর বিতর্কের কারণ আপাতদৃষ্টিতে এই মতবাদটির নিষ্ঠুরতা এবং অবিচারের বিষয়টি। কিন্তু আসুন ধারণাটিকে এর শর্তগুলো দিয়েই আমরা বিশ্লেষণ করি। অধিকাংশ ধর্মই এই পৃথিবীর জীবনকে মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত জীবনের একটি প্রস্তুতি হিসাবে দেখে থাকে। তত্ত্বটি হচ্ছে যে, যদি আমরা সততার সাথে এই জীবনটি কাটাই এবং আমাদের ধর্মবিশ্বাসের অনুশাসনগুলো মেনে চলি –যেমন, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ –ঈশ্বর আমাদের পুরস্কৃত করবেন এবং স্বর্গে আমাদের স্বাগত জানাবেন। কিন্তু অদৃষ্টবাদ মতবাদটির একধরনের পাঠ অনুযায়ী, পরীক্ষায় বসার আগেই ঈশ্বর সবার পরীক্ষার খাতা দেখে সেখানে নম্বর দিয়ে রেখেছেন। তাহলে ঈশ্বর কেনই বা অযথা সব নবীদের পাঠিয়েছেন আমাদের সতর্ক করে দিতে, যেন আমরা আমাদের জীবনাচরণ পরিবর্তন করি আর তার অনুশাসনগুলো মেনে চলতে আরো কঠোরভাবে পরিশ্রম করি? কেন এত সংগ্রাম করতে হবে, কেন জিহাদের জন্য আত্মত্যাগ করতে হবে, যদি আমাদের নিয়তি ইতিমধ্যেই পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে? আমরা আবার ফিরে আসি আমাদের সেই পুরনো বন্ধুর কাছে, ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে থাকা সেই লেখক, যে তার নিজের ইচ্ছামতোই তার চরিত্রদের নিয়তি নির্ধারণ করছেন, কারো জন্য সুখ আর সফলতা আর কারো জন্যে দুঃখ আর ব্যর্থতা।
যে-কণ্ঠটি মুহাম্মদের সাথে কথা বলেছিল, সেটি কুর’আনে এভাবে প্রকাশ করেছে : ‘আমি তাদের গলায় চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়ে দিয়েছি, ফলে তারা উধ্বমুখী হয়ে আছে। তাদের সামনে একটি প্রাচীর ও তাদের পিছনে একটি প্রাচীর স্থাপন করেছি, অতঃপর আমি তাদেরকে ঢেকে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না। আর আপনি তাদের সতর্ক করেন বা না করেন, তাদের কাছে দুটোই সমান, তারা ঈমান আনবে না’। আরো সুস্পষ্টভাবে বললে পুরো বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত, ইসলামে আরো পবিত্র কিছু লেখা আছে যেখানে এটি সত্যায়িত করা হয়েছে।
কুর’আন ছাড়াও মুসলমানদের কাছে আরো একগুচ্ছ লেখা আছে, যাকে বলা হয় ‘সুন্নাহ’ অথবা পথ। মুহাম্মদ জিবরাইল ফেরেশতার কাছ থেকে যা শুনেছিলেন সেটি হচ্ছে কুর’আন আর ‘সুন্নাহ’ হচ্ছে যা কিছু মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সহচররা আর তার পরিবারের সদস্যরা তার কাছ থেকে সরাসরি শুনেছিলেন। এর মধ্যে আছে ‘হাদিস’, অথবা নবীর উপদেশ, শিক্ষা ও কথপোকথনের নানা বিবরণ। এবং এরকমই একটি হাদিসে আমরা অদৃষ্টবাদের সবচেয়ে সুস্পষ্ট বিবরণ পাই, ‘আপনাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, জন্ম নিয়েছে এমন কোনো আত্মা নেই, স্বর্গ অথবা নরকে, যার জন্য ইতিমধ্যেই জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখা নেই, অথবা, অন্যভাবে যদি বলা হয়, দুঃখ বা সুখের নিয়তি তার জন্যে পূর্বনির্ধারিত। ঢোক গিলতে হলো, কিন্তু এটি কীভাবে সংগতিপূর্ণ হয় আল্লাহর ঐসব সুন্দর নামের সাথে, যেমন, পরম দয়ালু আল্লাহ, সবচেয়ে বেশি সহমর্মী এবং ক্ষমাশীল, যিনি সবসময়ই ক্ষমা করতে প্রস্তুত?
না, বিষয়টি সেভাবে সংগতিপূর্ণ মনে হয় না, আর সে-কারণে এই শিক্ষাটি নিয়ে ইসলামের পণ্ডিতরা বিতর্ক করে আসছেন সেই সপ্তম শতক থেকে, যখন এটি লেখা হয়েছিল। যদি আল্লাহ ন্যায়বিচারক হয়ে থাকেন, পণ্ডিতরা ঘোষণা করেছিলেন, তাহলে অদৃষ্টবাদের এই মত তার প্রকৃতির সাথে স্ববিরোধী। ধর্মীয় সগ্রামের যুক্তি, যেমন, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ অনুসরণ করা, ইঙ্গিত দিচ্ছে মানুষের অবশ্যই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। তাহলে কেনই বা আল্লাহ, নবীদের পাঠাবেন, যদি তার নির্দেশ শোনা, অনুশোচনা করা এবং পরিত্রাণ পাবার পথ অনুসরণ করার কোনো স্বাধীনতাই না থাকে? এভাবেই যুক্তিটি অগ্রসর হয়েছিল।
এই বিতর্ক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রথম দৃষ্টিতে যতটা মনে হয়, কুর’আনের ব্যাখ্যা তাহলে হয়তো ততটা সরল নয়। ধর্ম-গবেষকদের এটি আরেকটি সমস্যার উৎসের দিক নির্দেশ করে। প্রতিটি ধর্মেই একটি গোষ্ঠী থাকে, যারা ‘লিটারেলিস্ট বা যারা কুর’আন কিংবা ধর্মশাস্ত্রে লিখিত বাক্য যা বলছে, সেটিকে তারা আক্ষরিকভাবেই গ্রহণ করেন। অন্যদিকে ধর্মতাত্ত্বিকরা, যারা গ্রন্থের আধেয় আর শব্দগুলো সম্বন্ধে এইসব আক্ষরিকতাবাদীদের চেয়ে আরো বেশিকিছু জানেন, এবং সেগুলো পাঠ করার সময় আরো সূক্ষ্ম অর্থগুলো তারা বিশ্লেষণ করতে পারেন। তারা প্রায়শই রূপক হিসাবে ধর্মগ্রন্থ পড়েন, আক্ষরিকতাবাদীরা যা গলাঃধকরণ করেন বাস্তব সত্য হিসাবে। ধর্মশাস্ত্রগুলোর ইতিহাস হচ্ছে এইসব প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবনাগুলো অনুসরণকারীদের পরস্পরের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্কের একটি ইতিহাস। প্রায়শই এটি গুরুত্বপূর্ণ নয় কারণ বিতর্কের বিষয়টি আমাদের জীবনকে সরাসরি স্পর্শ করে না। তবে কখনো কখনো এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের জীবনে, কারণ সাধারণ মানুষের জীবনে এটি অস্বাভাবিক পরিমাণ ভয় আর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অদৃষ্টবাদের মতবাদটি এমনিতেই যথেষ্ট পরিমাণ দুশ্চিন্তার কারণ, কিন্তু এটি কিছুই নয়, যদি এটিকে স্বর্গ আর নরকের অস্তিত্ব-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট মতবাদটির সাথে তুলনা করা হয়।
