নিকটবর্তী এলাকা এবং তারপর জানা পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্ত অবধি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যে মুসলমানরা প্রথম লড়াই করেছিলেন, পবিত্র যুদ্ধ-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে তাদের মতো এত দক্ষ আর কেউ ছিলেন না। মুহাম্মদের মৃত্যুর একশো বছর পরেই উত্তরে সিরিয়া আর পশ্চিমে মিশরের নিয়ন্ত্রণ দখলে নিয়েছিল ইসলাম। মিশর থেকে উত্তর-আফ্রিকার অন্য দেশগুলোয় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি সময় প্যালেস্টাইন ও পারস্যের একটি বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল ইসলামি যোদ্ধারা। ইসলাম ভারত এবং চীনে পৌঁছেছিল। এবং এটি স্পেন বিজয় করেছিল, যেখানে এটি খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের কর্মকাণ্ডের প্রতি সীমিত আকারে সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছিল। একটি সময় ছিল যখন মনে হচ্ছিল এটি পুরো ক্যাথলিক ইউরোপই দখল করে নেবে, তবে তাদের সেই আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এটি যত যুদ্ধ লড়েছে বা যে-পরিমাণ এলাকা জয় করেছিল সেগুলো বর্ণনা করার চেয়ে বরং যে ধর্মতাত্ত্বিক যৌক্তিকতা ধর্মটি প্রস্তাব করেছিল, সেই বিষয়টি অনুসন্ধান করতেই বরং আমি আরো বেশি আগ্রহী। এবং তাদের একটি এখনো বর্তমান সময়ের এই পৃথিবীতে খুবই প্রাসঙ্গিক। এটি হচ্ছে ‘জিহাদ’ বা সংগ্রামের ধারণা।
মুসলমানদের একটি অংশ জিহাদকে ইসলামের অনানুষ্ঠানিক ষষ্ঠ স্তম্ভ হিসাবে বিবেচনা করে থাকেন। আসলেই, ইসলামের পাঁচটি কর্তব্য পালন করার সংকল্পবদ্ধ প্রচেষ্টাকেই ‘জিহাদ’ হিসাবে দেখা হয়। শব্দটির অর্থ সংগ্রাম অথবা প্রচেষ্টা। হতে পারে এটি ধর্মবিশ্বাসকে ধরে রাখা এবং একটি ন্যায্য সমাজপ্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম অথবা ইসলামকে এর শত্রুদের থেকে সুরক্ষা করার সংগ্রাম। বহু শতাব্দী ধরেই এই দুটি অর্থেই জিহাদের চর্চা করে আসা হচ্ছে, এবং এর হিংস্রতম রূপে এমনকি মুসলমানরা এটি মুসলমানদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন। একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সহিংস মতানৈক্য ইতিহাসে বেশ সাধারণ একটি ঘটনা। নবীন, সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ইসলামি সমাজের মধ্যে ফাটল ধরা শুরু হবার জন্য শুধুমাত্র মুহাম্মদের মৃত্যুই যথেষ্ট ছিল। আর যে রূপ এটি নিয়েছিল সেটি ধর্ম কীভাবে নিজেকে সংগঠিত করে এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদের কারণগুলো মীমাংসা করে সে-বিষয়ে আমাদের অনেক কিছুই বলে।
এই প্রসঙ্গে প্রশ্নটি ছিল, নবীর উত্তরাধিকার কার হওয়া উচিত আর কোন নীতির ওপর ভিত্তি করে এই নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যা ঘটেছিল তা হলো মুহাম্মদের বন্ধু এবং অনুগত সহকর্মী আবু বকর প্রথম খলিফা’ বা উত্তরসূরি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সমস্যাটি শুরু হয়েছিল চতুর্থ খলিফা হিসাবে মুহাম্মদের নিজের চাচাত ভাই এবং জামাতা আলীকে যখন নির্বাচিত করা হয়েছিল, যিনি নবী-কন্যা ফাতিমার স্বামী ছিলেন। আলীকে খলিফা হিসাবে নিয়োগ করা ব্যাপারটি অনেকেই সমর্থন করতে পারেননি। এটি ইসলামকে বিভাজিত করেছিল, যা এখনো টিকে আছে। একটি গোষ্ঠী নবীর নিজের আত্মীয় আলী নয়, বরং তৃতীয় খলিফার একজন জ্ঞাতিভাই, মুয়াবিয়াকে চতুর্থ খলিফা হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। এর পরবর্তীতে যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সূচনা হয়েছিল, সেখানে আলীকে হত্যা করা হয় এবং মুয়াবিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। আলীর সমর্থকরা এরপর দাবি করেছিলেন আলীর পুত্র হুসাইনকে এরপর খলিফা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হোক। কিন্তু ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে একটি যুদ্ধে হুসাইন নিহত হয়েছিলেন।
এই সংঘর্ষের পরিণতিতে ইসলামে একটি বিভাজন ঘটেছিল, ধর্মতত্ত্বে যার কারিগরি নাম ‘স্কিজম’ (ধর্মবিচ্ছেদ), ধর্মের ইতিহাসের যে-কোনো ছাত্রের জানার জন্যে বেশ উপযোগী একটি শব্দ, যা তাদের কারিগরি শব্দভাণ্ডারে থাকা দরকার। উপযোগী অন্য বহু শব্দের মতো, ‘স্কিজম’ শব্দটিও এসেছে গ্রিকভাষা থেকে, যার মানে কাটা বা ছেদ করা। একটি স্কিজম হচ্ছে একটি গোষ্ঠী, যা মূল দলের শরীর থেকে নিজেদের ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে পৃথক করে নেয়, এবং নিজেদের স্বতন্ত্র একটি গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে। এই ধরনের বিচ্ছেদের নেপথ্যে সাধারণত ধর্মীয় মতানৈক্য থাকে। আর এই ক্ষেত্রে একটি খুব সাধারণ মতানৈক্য হচ্ছে, কীভাবে তাদের আধ্যাত্মিক নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। খ্রিস্টধর্মে করা যিশুর সেই বারোজন অ্যাপোস্টলের সত্যিকার উত্তরসূরি কে হবেন, সেই মতানৈক্যটি একসময় খ্রিস্টীয় চার্চেও ধর্মবিচ্ছেদের কারণ হয়েছিল, যা এখনো অব্যাহত আছে, ঠিক ইসলামের ধর্মবিচ্ছেদের মতো।
ইসলামের ভাঙন সুন্নী এবং শিয়া নামে দুটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছিল। সুন্নীরা ছিল অপেক্ষাকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ, শিয়ারা মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সুন্নী অর্থ হচ্ছে সেই মানুষ যারা মূল সুন্না বা নবীর পথের অনুসারী। শিয়া মানে আলী’র দল, যারা বিশ্বাস করে নবীর উত্তরসূরিকে একজন ইমাম বা নবীর বংশধর হতে হবে। মূল দুটি দলের প্রত্যেকটির মধ্যেই এখন অসংখ্য বিভাজন আছে, এই বাস্তব তথ্যটি আমাদের ধর্ম আসলে কতটা ভঙ্গুর হতে পারে সেই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশেষ করে যখন নেতৃত্বের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে সেই বিতর্কটির মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
