এই পাঁচটি কর্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এর অনুসারীদের অনুসরণ করার জন্যে ইসলামকে খুব স্পষ্ট আর জটিলতামুক্ত একটি ধর্মে পরিণত করেছিল। কিন্তু এর ব্যবহারিক স্তরে এর দুটি খুবই শক্তিশালী আবেগ-উদ্রেককারী বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমটি হচ্ছে নবী মোহাম্মদের প্রতি ভক্তি, যা প্রায় সত্যিকারের উপাসনার। কাছাকাছি যায়, তবে কখনোই সেই বিন্দুতে পৌঁছায় না। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য ঈশ্বর নেই, আর মুহম্মদ হচ্ছেন আল্লাহর শেষ নবী, মুহম্মদকে উপাসনা করা যাবে না–কারণ তিনি ঈশ্বর নন–কিন্তু তিনি এত বেশি শ্রদ্ধেয় যে, যখনই তার নাম উচ্চারিত হয় প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে তার পরে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা.) (যার অর্থ হলো তার ও তার পরিবারের ওপর আল্লাহর দয়া-করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক)। আর সে-কারণেই মুসলমানরা খুবই উত্তেজিত এবং ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, যখন তাদের নবীকে ব্যঙ্গ বা অবিশ্বাসীরা তার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করেন।
কিন্তু আল্লাহর প্রতি মুসলিমদের সমর্পণ আরো অনেকটাই উচ্চস্তরের, তাদের নবীর প্রতি শ্রদ্ধার চেয়েও যা অনেক বেশি। ইসলামের একেশ্বরবাদ খুবই তীব্র এবং আবেগীয়, যা সারাক্ষণই আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয় এই ধারণাটির ওপর গুরুত্বারোপ করে। কুর’আন বেশ কাব্যিক হয়ে ওঠে যখন এটি আল্লাহর সৌন্দর্য বর্ণনা করে। কুর’আনের হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়গুলোর একটি হচ্ছে ১৩ নং সুরা, যে অধ্যায়টি আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর নিরানব্বইটি নামের ঘোষণা দিয়েছে। নিচে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহ, যে নামটি’ সব নামের উপরে…
দয়াময়, যারা দয়া প্রদর্শন করে তাদের সবার চেয়ে যিনি দয়ালু…
সহমর্মী, যিনি কোমল এবং সহমর্মিতায় পূর্ণ…
পর্যবেক্ষণকারী, যিনি তার সৃষ্টির ওপর লক্ষ রাখেন…
ক্ষমাশীল, যিনি সবসময়ই ক্ষমা করতে প্রস্তুত …
কুর’আনের ভাষার মাধুর্য আর সান্ত্বনা আছে। কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র সেটাই আমরা পাই না, এমনকি সুরা ১৩য় সেই সতর্কবাণীও আছে, আল্লাহর সাথে পৃথিবীর সম্পর্কে সান্ত্বনা যেমন আছে, তেমন ভয়ের ব্যাপারও আছে আরো দুটি নাম যেমন:
পীড়াদানকারী, যিনি কষ্ট দেন এবং আশীর্বাদও দেন…
প্রতিহিংসক, যিনি পাপীদের ওপর তার প্রতিহিংসার প্রকাশ ঘটান…
কুর’আন আল্লাহর সৌন্দর্যের প্রশস্তিতে পূর্ণ। এছাড়াও এটি পাপী আর অবিশ্বাসীদের প্রতি তার ক্ষোভে বজ্রকণ্ঠের কথাও বলে। সুতরাং আল্লাহর সেই দিকটি এবং বহু মানুষের জন্যে এর পরিণতিটি কী, সেটি অনুসন্ধান করার এখন সময় হয়েছে।
২৪. সংগ্রাম
একজন নবী ছাড়াও মুহাম্মদ একজন যোদ্ধা ছিলেন, যিনি ইসলামের প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার অনুসারীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর এই দুটি ভূমিকার মধ্যে। তিনি কোনো স্ববিরোধিতাও লক্ষ করেননি। যুদ্ধগুলো তিনি যুদ্ধ করার উত্তেজনা কিংবা লুটতরাজ করার লক্ষ্যে পরিচালনা করেননি, যদিও কোনো সন্দেহ নেই তার বহু অনুসারী দুটোই উপভোগ করেছিলেন। তার আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনে যুদ্ধ একটি উপকরণ ছিল, আর আমরা যদি তাকে বুঝতে চাই–অথবা ইতিহাসে যে কোনো ধর্মীয় নেতা, যারা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহিংসতা ব্যবহার করেছিলেন– আমাদের তাহলে অবশ্যই তার মনের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করতে হবে।
প্রথম যে-জিনিসটি বুঝতে হবে সেটি হচ্ছে নবীর মতো ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা কোনো মানুষের জন্যে এই পৃথিবীর জীবনটি মূল লক্ষ্য ছিল না, এটি এমন কিছু ছিল যা মূল লক্ষ্যটি অর্জনের খাতিরেই উপভোগ করতে হয় মাত্র। এটি ক্ষণস্থায়ী এবং দুঃখের, মোয়াজ্জিনের আজানের মতো বিষণ্ণ। এটি শুধুমাত্র শুরু, সংগীতের আবেগগাদ্দীপক সূচনা অনুচ্ছেদ, একটি ভূমিকা, আর নাটকের মূল অঙ্কটি, যা মৃত্যুর পর আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, যেখানে আসল কাহিনিটি মঞ্চস্থ হবে। আর এই পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান করার উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্ধারণ করা কীভাবে আমরা সেই অনন্ত জীবনটি কাটাব, যা মৃত্যুর পরে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।
ধরুন আপনাকে ইস্পাত-কঠিন একটি নিশ্চয়তা দেওয়া হলো, যদি আপনি কয়েক মিনিটের জন্যে তীব্র যন্ত্রণাপূর্ণ একটি পরীক্ষা সহ্য করতে পারেন তাহলে আপনাকে এক বিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে, যা ইতিমধ্যে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে গেছে, শুধুমাত্র সক্রিয় হবার জন্যে আপনার সম্মতি দরকার। আপনি কীভাবে জবাব দেবেন? আপনি কি সেই কয়েক সেকেন্ডের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করবেন, সেই সম্পদ জয় করতে, যা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে, যখন এটি শেষ হবে? সম্ভাবনা আছে আপনি হয়তো এই সুযোগটা নিতে রাজি হবেন।
আর এটাই হচ্ছে সহিংসতার নেপথ্যে থাকা যুক্তিপ্রক্রিয়াটি, যা প্রায়শই ধর্মকে চিহ্নিত করে। শল্যচিকিৎসকদের নিষ্ঠুরতাই আমাদের কেটে উন্মুক্ত করে, তবে আমাদের কষ্ট দিতে নয়, বরং আমাদের জীবন বাঁচাতে। কিছু বিশ্বাসী শহীদ হিসাবে তাদের জীবন বিসর্জন দেয় সেই পরমানন্দের জন্যে, যা মৃত্যুর অন্যপাশে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। আর অন্যরা, বন্ধু কিংবা আগন্তুকদের শরীরের উপর যন্ত্রণা আর মৃত্যু আরোপ করাটাকেই তাদের আক্রমণ থেকে নিজেদের বিশ্বাসকে রক্ষা করার লক্ষ্যে তাদের কর্তব্য বলে মনে করেন। পছন্দ করুন বা না করুন, এটাই পবিত্র যুদ্ধ আর নিষ্ঠুর জাতিগত বিশোধনের নেপথ্যে থাকা যুক্তি, যা ধর্মের ইতিহাসে অপরিবর্তনীয় একটি বৈশিষ্ট্য।
