তাদের ধর্মবিশ্বাসের অংশ হিসাবে ইসলামের অনুসারীদের পাঁচটি প্রধান কর্তব্য পালন করতে হবে, কখনো যেগুলোকে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ’ বলা হয়। প্রথম কর্তব্যটি হচ্ছে আন্তরিক সমর্পণের সাথে শাহাদা পাঠ বা আরবি ভাষায় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ঘোষণা, যে-বাক্যটি দিয়ে আমি আগের অনুচ্ছেদটি শেষ করেছি : আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই, আর মুহাম্মদ হচ্ছেন তার নবী। একেশ্বরবাদের এই অভিব্যক্তির উচ্চারণ হচ্ছে একটি রূপ, যার মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের বিশ্বাস ঘোষণা করেন এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতরা এটি ব্যবহার করে তাদের স্বীকারোক্তি প্রদান করেন।
দ্বিতীয় স্তম্ভটি হচ্ছে, মক্কার দিকে মুখ করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উদ্দেশ্যে দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করা, যাকে বলা হয় সালাত (বা নামাজ), আর সালাতের এই প্রার্থনা করা হয় ভোরে, দুপরে, বিকালের মাঝখানে, সূর্যাস্তে এবং সূর্যাস্ত আর মধ্যরাত্রির মধ্যবর্তী একটি সময়ে। পৃথিবীর হৃদয়স্পর্শী শব্দগুলোর একটি হচ্ছে মুয়াজ্জিনের (বা যিনি সবাইকে প্রার্থনা করতে ডাকেন), সেই আহ্বান : আজান। কোনো মসজিদের মিনারের উঁচু ব্যালকনি থেকে যা বিশ্বাসীদের প্রার্থনা করতে আহ্বান জানায়। তিনি পালাক্রমে কম্পাসের চারটি দিকের প্রতিটি দিকে মুখ ফিরিয়ে চিৎকার করে বলেন : ‘আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ হচ্ছেন আল্লাহর নবী। নামাজ পড়তে আসুন, মুক্তি পেতে আসুন। আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ’। বর্তমানে প্রার্থনায় ডাকার এই আহ্বান মূলত আধুনিক শহরের নানা শব্দের মধ্যে অমসৃণভাবে বাজানো আজানের কোনো রেকর্ডিং। কিন্তু কোনো নীরব আফ্রিকার গ্রামে মুয়াজ্জিনের সেই ছড়িয়ে পড়া আহ্বানটি ভোরবেলা শোনা, আকুল আকাঙ্ক্ষার একটি তীরে বিদ্ধ হওয়ার মতো অনুভূত হতে পারে।
ধর্মটির তৃতীয় স্তম্ভটি হচ্ছে জাকাত, অথবা দান করা, যেহেতু সব সম্পদই এসেছে আল্লাহর দয়ায়, ধার্মিক মুসলমানদের জন্যে দান করা মানে আল্লাহর কাছে সেই সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া, তিনি একাই যে সম্পদের একমাত্র মালিক। এটি আরো একটি উপায়, যার মাধ্যমে সেই সম্পদের দ্বারা সমাজের দরিদ্র ও অসহায়রা উপকৃত হতে পারেন, এবং একই সাথে ইসলাম ধর্ম প্রচারেও ব্যবহৃত হতে পারে। ইসলাম একটি মিশনারি বা প্রচারের ধর্ম, যার লক্ষ্য পুরো পৃথিবীকে এর দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তর করা, একটি একক সংঘ অথবা উম্মা, যেখানে বিশ্বাস ও জীবন একীভূত হয় পূর্ণাঙ্গ একটি রূপে। উম্মাহতে এমন কোনো বিন্দু থাকবে না যেখানে ধর্ম শেষ হবে আর সমাজের সূচনা হয় অথবা যেখানে সমাজের শেষ হয় আর ধর্মের সূচনা হয়। এটি একই জিনিস হবে।
চতুর্থ স্তম্ভটি হচ্ছে, রমজান (বা রামাদান) মাসে মাসব্যাপী রোজা রাখা, যে মাসটি ইসলামি ক্যালেন্ডারের নবম মাস। ত্রিশ দিন ধরে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি এই রোজা পালন করা হয়। এই সময়ে কোনো খাদ্য গ্রহণ অথবা পানীয় পান করা যাবে না। কিন্তু এটি শুধুমাত্র খাদ্য আর পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকা নয়। রমজানের শেষের দিকে মসজিদে বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান পালন করা হয়, যেগুলো বিশ্বাসীদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা-সংক্রান্ত জ্ঞান বৃদ্ধি করার জন্যে পরিকল্পিত হয়েছে। এবং রমজানের সাতাশতম দিনটি বিশেষ মর্যাদার সাথে পালন করা হয়, শবে-ই-কদর বা শক্তির রাত, এটি সেই প্রথম রাতটিকে চিহ্নিত করে, যখন মক্কার বাইরে একটি গুহায় মুহাম্মদ প্রথম আল্লাহর নিকট থেকে ঐশী প্রত্যাদেশ বা ওহী পেয়েছিলেন, যা পরৈ কুর’আন হয়েছিল। রমজান শেষ হয় ঈদ-উল-ফিতর উৎসবের মাধ্যমে। রোজা শেষ হবার পর একটি আনন্দোৎসব। ঈদ হচ্ছে আনন্দের একটি সময় যখন পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের সাথে দেখা করেন এবং উপহার বিনিময় করেন।
পঞ্চম কর্তব্য আমি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি, মক্কায় হজ করতে যাওয়া। প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ পড়া আর রমজান মাসে রোজা রাখার চেয়ে মক্কায় হজ করতে যাওয়া বেশ বড় একটি ব্যাপার। সুতরাং মুসলমানদের কাছে প্রত্যাশা করা হয় যে, তারা তাদের জীবনে মাত্র একবার এই কাজটি করবেন। হাজিরা আব্রাহামের কাবা প্রদর্শন করেন, যা এখন মক্কার বিশাল মসজিদ, আল-মাসজিদ আল-হারামের মধ্যে অবস্থিত বিশাল কিউব বা ঘণক্ষেত্র আকৃতির একটি ভবন। হাজিরা কাবার চারপাশে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন। তারপর তারা সাফা আর মারওয়া নামের দুটি ছোট পাহাড়ের কাছে যান। সেখানে দুটি পাহাড়ের মধ্যে হয় তারা দৌড়ান অথবা দ্রুত হাঁটেন হাজারের সেই নিদারুণ যন্ত্রণাকে স্মরণ করে, যখন তিনি তার পুত্র ইসমায়েলের জন্যে তপ্ত শুষ্ক মরুভূমিতে পানির জন্যে ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করেছিলেন, যে পানির স্রোতধারা ক্ষুব্ধ ইসমায়েলের পায়ের লাথির মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছিল। হজের আরো একটি নাটকীয় উপাদান হচ্ছে তিনটি স্তম্ভের প্রতি লক্ষ করে যখন হাজিরা পাথর নিক্ষেপ করেন, যেগুলো পৃথিবীর অশুভ সবকিছুকেই প্রতিনিধিত্ব করে। মুসলমানদের জন্যে হজের অভিজ্ঞতা এত তীব্র আর জীবনরূপান্তরকারী হতে পারে যে, তারা এই অর্জনটিকে তাদের নামের সাথে একটি পদবী হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন। পুরুষদের জন্যে হাজি এবং মহিলাদের জন্যে হাজা।
