কিন্তু যারা এই সৃষ্টিকর্তার সাথে সংযোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন, তাদের জন্যে এই প্রক্রিয়াটি অন্য যে-কোনো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মতোই। নবী এবং ঋষিরা অপেক্ষা করেন এবং শোনেন এবং দূরদর্শিতা আছে তাদের, ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেটি সম্বন্ধে তারা ধারণা করতে পারেন। তারা নিজেদের উন্মুক্ত করেন, যেন তাদের অস্তিত্বের উৎসটি তাদের মধ্যে দিয়ে নিজেকে উন্মোচিত করতে পারে। এবং এর বাস্তবতাটাই তাদের মনে তৈরি হয়, যেভাবে কোনো একটি চরিত্র নিজেকে এর লেখকের মনে বাস্তবায়িত করে তোলে। শুধুমাত্র ব্যতিক্রম, এটি আগের উপায়টির বিপরীত দিক বরাবর। একটি চরিত্র যা এর লেখককে বাস্তব একটি রূপ দেয়। খুব ধীরে ঈশ্বরের একটি চিত্র আবির্ভূত হয় যেন একটি আলোকচিত্র, যা কোনো একটি ডার্করুমে প্রস্ফুটিত করা হচ্ছে। ধর্মতাত্ত্বিকরা এই কর্মকাণ্ডকে বলেন, ইমার্জিং রিভিলেশন বা আবির্ভূত হতে থাকা কোনো উন্মোচন। এবং তারা সাধারণত দাবি করেন, ঈশ্বরের ছবি যা তাদের ধর্ম সমর্থন করে, সেটি এর বিকাশ প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি অগ্রসর এর যে কোনো আদি সংস্করণ থেকে। ইহুদিবাদে সৃষ্টিকর্তার সাথে সাদৃশ্য বহুঈশ্বরবাদ অপেক্ষা বেশি। খ্রিস্টধর্ম ইহুদিবাদ থেকে অনেক উত্তমভাবে সংজ্ঞায়িত। কিন্তু ইসলাম দাবি করে তাদের কাছে এর সবচেয়ে নিখুঁত প্রতিকৃতিটি আছে, যা এর আগের যে-কোনোটির চেয়ে অনেক বেশি শ্ৰেষ্ঠ। সুতরাং আসুন, সেই জিনিসটি দিয়ে আমরা ইসলাম সম্বন্ধে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখি, যা এটিকে ইহুদিবাদ আর খ্রিস্টধর্ম থেকে সবচেয়ে বেশি পৃথক করেছে : কুর’আন।
কুর’আনকে ইসলামের বাইবেল হিসাবে চিন্তা করবেন না। এখানে তিনটি বড় ধরনের পার্থক্য আছে। প্রথমটি হচ্ছে বাইবেল বিভিন্ন লেখক আর সম্পাদকের হাতে বহু শতাব্দী ধরে খুব ধীরে একত্রে একটি বইরূপে সংকলিত হয়েছিল। দ্বিতীয় পার্থক্যটি হচ্ছে, বাইবেল একটি লাইব্রেরি, এটি একক বা একটি মাত্র বই নয়। এবং তৃতীয় পার্থক্যটি, যদিও এটি ঈশ্বরের ঐশীবার্তা ধারণ করে, কিন্তু বাইবেল ‘মানবসৃষ্ট, মানুষের হাতে এটি এর রূপ পেয়েছে। কুর’আন সম্বন্ধে এধরনের কোনো বিবরণ ইসলাম ধর্মে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্রমাগতভাবে আসা ঐশী প্রত্যাদেশের ধারারূপে এটি কেবল একজন মানুষের কাছেই এসেছিল তার জীবদ্দশায়। এবং যদিও এটির মাধ্যম ছিল একজন মানুষ, এটি মানবসৃষ্ট নয়। ঠিক যেমন করে বৈদ্যুতিক তার কোনো ভবনে বিদ্যুৎ বহন করে আনে, মুহাম্মদ কুর’আনের বাহক ছিলেন, এটির প্রবাহিত হবার পথ ছিলেন, কিন্তু সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে এর মূল ক্ষমতাটি এসেছে। কুর’আন হচ্ছে আল্লাহর মনের পার্থিব একটি রূপ, পৃথিবীতে আল্লাহর উপস্থিতি।
বাস্তবিকভাবে কুর’আন মুসলমানদের কাছে সেটাই, যিশুখ্রিস্ট খ্রিস্টানদের কাছে ঠিক যেমন। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করেন যিশু হচ্ছেন পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি। মানুষরূপে ঈশ্বর নিজেকে লভ্য করেছিলেন এই পৃথিবীর কাছে। বেশ, মুসলমানদের কাছে কুর’আন সেরকমই। এটি তাদের কাছে ঈশ্বরের সমান। কুর’আন শব্দটির মানে হচ্ছে আবৃত্তি। এটি ফেরেশতা জিবরাইল আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন নবীর কানে। এরপর এটি নবী তার অনুসারীদের জন্যে আবৃত্তি করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর এর একটি লিখিত রূপ অর্জন করেছিল। আর ধর্মনিষ্ঠ মুসলমানরা এখনো এটিকে সম্পূর্ণরূপে মুখস্থ করেন, যেন তারা এর ১১৪টি অধ্যায় বা সুরা, প্রথম থেকে এর শেষ অবধি তাদের স্মৃতি থেকেই আবৃত্তি করতে পারেন।
মুহাম্মদ বিশ্বাস করতেন, যা শুরু হয়েছিল ইহুদিদের মাধ্যমে এবং আরো অনেকটা বিবর্তিত হয়েছিল খ্রিস্টানদের সাথে, সেটি পূর্ণতা পেয়েছে তার নবুয়তের অধীনে। কুর’আন তাকে বর্ণনা করেছে নবীদের সিলমোহর’ বা শেষ নবী হিসাবে। তারপরে আর কোনো নবীই আসবেন না। নবীদের এই ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হয়েছে। এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবং ইসলাম হচ্ছে এর ক্রটিহীন চূড়ান্ত রূপ।
ইহুদি আর খ্রিস্টানরা যখন বিষয়টি সেভাবে দেখেননি, মুহাম্মদ হতাশ হয়েছিলেন। যদিও তাদের এই প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। পুরনো ধর্মের রক্ষকরা, তাদের দিন শেষ এবং তাদের উচিত নতুনের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়া, এমন কিছু স্বীকার করতে সবসময়ই অনিচ্ছুক থাকেন। মুহাম্মদ আশা করেছিলেন যে, তিনি মদিনার ইহুদি আর খ্রিস্টধর্মীয়দের প্ররোচিত করতে পারবেন যে, আসলে তিনি তাদের শত্রু নন বরং তিনি তাদের ধর্মের পরিপূর্ণ রূপ, সেই পরিণতি, যার জন্যে তারা অপেক্ষা করছিলেন। কুর’আনে যেমন বলা হয়েছে, তিনি আপনার কাছে সত্যের সেই বইটি পাঠিয়েছেন, ইতিপূর্বে যা ছিল এটি সেটাই নিশ্চিত করেছে, এর আগে তিনি ‘তোরা’ আর ‘গসপেল পাঠিয়েছেন। আর সে-কারণে মুহাম্মদ প্রথমে তার অনুসারীদের জেরুজালেমের দিকে ফিরে উপাসনা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র যখন ইহুদি আর খ্রিস্টানরা তাকে তাদের নবী হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন তিনি এর পরিবর্তে মক্কার দিকে ফিরে প্রার্থনা করতে তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, নবী হিসাবে তাদের এই প্রত্যাখ্যানটি, যদিও দুঃখজনক তবে, তাদের পূর্বের সব আচরণের সাথে সংগতিপূর্ণ। ইহুদিরা সবসময়ই সেই নবীদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, ঈশ্বর যাদের প্রেরণ করেছিলেন। তাদের শেষ প্রত্যাখ্যান ছিল নবী যিশু (ইয়েসুস বা ইসা)। তাকে ঈশ্বরে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে এমনকি খিস্টানরাও যিশুকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একজন মাত্র আল্লাহর একত্ববাদে গভীরভাবে বিশ্বাসী, মুহাম্মদ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, খ্রিস্টানরা শুধুমাত্র ঈশ্বরকে একটি পুত্রই দেয়নি, স্বর্গে ঈশ্বরের পাশে বসানোর জন্যে তারা একই সাথে দুটি অন্য স্বর্গীয় সত্তাকেও সৃষ্টি করেছেন। এর কারণ খ্রিস্টানরা ‘ট্রিনিটি’রূপে ঈশ্বর সম্বন্ধে একটি তত্ত্ব বিবর্তন করেছিলেন, অথবা যেখানে একজন ঈশ্বর তিনটি ভিন্ন উপায়ে প্রকাশিত হয়েছে : মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুতে সেই সৃষ্টিকর্তা পিতা, পৃথিবীতে তার জীবনে যিশুখ্রিস্টের মধ্যে পুত্র, এবং সেই স্পিরিট বা পবিত্র আত্ম হিসাবে, যা ইতিহাসের মধ্যদিয়ে মানবতাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সময়ের শেষ অবধি। এই জটিলভাবে পরিকল্পিত ধর্মতাত্ত্বিক প্রকৌশলের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ গর্জে উঠেছিলেন : ‘লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহু ওয়া-মুহাম্মদ রাসুল আল্লাহ’।
