সৌভাগ্যক্রমে, ইয়াথরিব শহরের একটি কূটনৈতিক দল, যারা মুহাম্মদকে ধর্মপ্রচার করতে শুনেছিলেন, তারা তাকে তার অনুসারীদের নিয়ে ইয়াথরিবে চলে আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ইয়াথরিব থেকে আসা সেই জনপ্রতিনিধির দলটি জানত যে তাদের শহরে একজন নেতার দরকার, আর তারা ভেবেছিলেন, এই মানুষটি সেই দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। মক্কা থেকে দুইশো মাইলের চেয়ে খানিকটা বেশি দূরে অবস্থিত ইয়াথরিব শহরে তার অনুসারীদের নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পুরো ব্যাপারটি ঘটেছিল খুব গোপনে। মুহাম্মদ, তার চাচাত ভাই আলী এবং বন্ধু আবু বকর সবার শেষে মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। রাতের অন্ধকারেই তারা মক্কা ছেড়েছিলেন, ৬২২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে, যা এখন ‘হেজিরা’ (হিজরত) (অভিনিষ্ক্রমণ) নামে পরিচিত। এটি ছিল সেই মুহূর্ত যখন থেকে মুসলমানদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জিতে প্রথম বছরটি শুরু হয়েছিল। ইয়াগরিব নামের যে-শহরে তারা পালিয়ে গিয়েছিলেন, সেটির একটি নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল, মদীনা বা নবীর শহর।
তবে এই হিজরত সব সমস্যার সমাধান করতে পারেনি, কারণ এর পরের দশ বছরে মক্কা আর মদিনার মধ্যে বেশকিছু যুদ্ধ হয়েছিল, অবশেষে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে তার জন্ম-শহরের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আর কোনো উপায় নেই অনুধাবন করে, মক্কা আত্মসমর্পণ করেছিল এবং নবী শহরে প্রবেশ করেছিলেন। এর বাসিন্দার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধমূলক হামলা করা হয়নি, কিন্তু মুহাম্মদ কাবা থেকে সব মূর্তি অপসারিত করেছিলেন এবং মক্কাবাসীদের মুসলিম হবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এরপর তিনি মদীনায় ফিরে যান।
কিন্তু তার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হয়েছিল। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মক্কায় শেষবারের হজ করতে গিয়েছিলেন এবং তার বিদায়ী ভাষণটি দিয়েছিলেন। কালো পাথরের কাবা আর পবিত্র ঝর্নার শহরে মোহাম্মদের এই শেষ ভ্রমণটি বিশেষভাবে উদযাপিত হয় এবং মক্কায় হজ বা তীর্থযাত্রা করার বিষয়টি পাঁচটি একান্ত কর্তব্যের ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ-একটিতে পরিণত হয়, যা মুসলমানরা তাদের জীবদ্দশায় পূর্ণ করবেন, এমন প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু নবী বিদায় হজের পর আর বেশিদিন বেঁচেছিলেন না। তিনি একটি জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুন মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তিনি একটি ধর্মবিশ্বাসকে রেখে গিয়েছিলেন যা বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম এবং এখনো ইতিহাসের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে যাচ্ছে। পরের অধ্যায়ে আমরা এর ধর্মতত্ত্বের সমৃদ্ধতা আর এর আচারগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
২৩. সমর্পণ
‘ইসলাম’–একটি আরবি শব্দ, যা মুসলিম শব্দটির উৎস শব্দ, এবং এর সবচেয়ে ভালো অনুবাদ হতে পারে, আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সমর্পণ”। এই ধর্মটির মূল বিশ্বাস আর ধর্মীয় আচারগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে, এর নিকটতম সম্পর্কযুক্ত দুটি ধর্ম, ইহুদি এবং খ্রিস্টধর্মের সাথে এই ধর্মটির পার্থক্যটি কী, সেটি চিহ্নিত করা আমাদের উচিত হবে। একেশ্বরবাদী কোনো ধর্মের প্রথম মূলনীতি হচ্ছে ঈশ্বরের বাস্তবতা। আমরা এটিকে আরো সম্প্রসারণ করে বলতে পারি একেশ্বরবাদের জন্যে একমাত্র বাস্তবতাটি হচ্ছে ঈশ্বর।
এই মহাবিশ্বের কথা ভাবুন : বহু মিলিয়ন ছায়াপথ এবং হয়তো বহু মিলিয়ন মহাবিশ্ব যা আমাদের কাছে অদৃশ্য। একটা সময় ছিল যখন এসব কিছু সেখানে ছিল না। তাহলে কী ছিল সেখানে একেশ্বরবাদের মতে, ঈশ্বর ছিলেন সেখানে। এরপর যা কিছুই অস্তিত্বশীল হয়েছে সেগুলো এসেছে ঈশ্বরের কাছ থেকে, ঠিক যেভাবে কোনো উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা তাদের অস্তিত্ব পায় এর লেখকের মন থেকে। যখন হিন্দুধর্ম নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, মানুষকে উপন্যাসের চরিত্র হিসাবে ভাবার ধারণাটি আমি ব্যবহার করেছিলাম। আমি আবার এটি ব্যবহার করতে চাই, যখন আমি একেশ্বরবাদ নিয়ে চিন্তা করব, কিন্তু খানিকটা ভিন্ন কৌশলে। হিন্দুধর্মে কৌশলটি ছিল, সেখানে উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা আবিষ্কার করেছিলেন, তাদের আসলে সত্যিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। তারা মূলত একটি মায়া। আব্রাহামীয় ধর্মে চরিত্রগুলোর অস্তিত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু তারা সেই একক ঈশ্বর সম্বন্ধে আরো কিছু জানতে চান, সেই লেখক যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদের সৃষ্টিকর্তা।
মনে রাখবেন, এই সবকিছু আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে বা মেনে নিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু আপনি যদি ধর্মকে বুঝতে চান, তাহলে এটি যেভাবে চিন্তা করে আপনার মনকেও একইভাবে চিন্তা করার প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হবে, যদিও শুধুমাত্র এই অধ্যায়টি পড়তে যতটা সময় লাগে, ততক্ষণ। একেশ্বরবাদী ধর্মগুলো কোনো বইয়ের সেই চরিত্রগুলোর মতো, যারা এর লেখকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। এমনকি এভাবে ভাবতেই আপনার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠার কথা। তাই কি করছে না? এই মহাবিশ্বের বইয়ের কিছু চরিত্র বলছে এটি স্পষ্ট যে, কেউ আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি সেই কাজটি করেছেন, তার সাথে আমাদের যোগাযোগ স্থাপন করার ইচ্ছাটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। অন্যরা বলেন, বোকার মতো কথা বলবেন না, কোনো লেখক নেই, শুধু বইটাই আছে, এই মহাবিশ্ব বা যে নামই আপনি এটিকে দেন না কেন, এটি এমনিই ঘটেছিল। এটি নিজেকে নিজেই লিখেছিল। সুতরাং আপনাদের কল্পিত সেই লেখকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা বন্ধ করুন।
