খুব দ্রুত তিনি শিখতে পারতেন এবং তার যোগ্যতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং সুনামের কারণে একজন ধনী বিধবা খাদিজা সিরিয়াগামী তার একটি ক্যারাভানের দায়িত্ব তাকে দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ আর খাদিজা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে, তখন তার বয়স ছিল পঁচিশ আর খাদিজার চল্লিশ। তাদের মোট ছয়টি সন্তান হয়েছিল। চারটি মেয়ে এবং দুটি ছেলে, যে ছেলেদুটি শৈশবেই মারা গিয়েছিল। ফাতিমাই তার কন্যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি আলীকে বিয়ে করেছিলেন, এবং হাসান ও হুসেইন, মুহাম্মদের প্রিয় দুই নাতির মা হয়েছিলেন।
মুহাম্মদ খুব সফল একজন ব্যবসায়ী ছিলেন, তার সততা আর নীতিপরায়ণতা তাকে একধরনের সামাজিক নেতা হিসাবে সুপরিচিত করে তুলেছিল, যার কাছে মানুষ নানা সমস্যার সমাধান খুঁজতে, ব্যবসা এবং পারিবারিক কোন্দল মীমাংসা করতে আসতেন। কিন্তু মুহাম্মদের মধ্যে আরো কিছু ছিল। তিনি একটি বিশেষ গ্রুপের সদস্য ছিলেন, যারা সর্বক্ষণই এই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের কারণ আর লক্ষ্য খুঁজতে এর সীমায় এবং সীমানার বাইরে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছিলেন।
তারা মানবসমাজকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা এর কদর্যতার আর অবিচার নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। যদিও তারা শ্রদ্ধা করতেন, যেভাবে ধর্ম সংগ্রামরত মানুষকে তাদের সীমানার বাইরে আধ্যাত্মিক একটি বাস্তবতার সংস্পর্শে নিয়ে আসে, কিন্তু তারা জানতেন কত সহজে ক্ষমতাবানরা ধর্মকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন, তাদের নিজেদের লক্ষ্যপূরণে এবং সেইসব মানুষের কল্যাণের বিরুদ্ধে যাদের এটি সহায়তা করার কথা ছিল।
মক্কার কাবাকে ঘিরে থাকা ব্যবসায়ীদের বাজার দেখে বিরক্ত মুহাম্মদ তার চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার বাইরে একটি গুহায় প্রায়শই প্রার্থনা আর ধ্যান করতে চলে যেতেন। আর এখানেই তিনি তার প্রথম দৈবদৃশ্যটি দেখেছিলেন, এবং প্রথমবারের মতো তার কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলেন, যে ঐশী দর্শন আর কণ্ঠ শোনা তার বাকি জীবন জুড়ে অব্যাহত ছিল। তিনি জানতেন, এই কণ্ঠটি সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে আসেনি, এটি এসেছে ফেরশতা জিব্রাইলের মাধ্যমে। তাকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারিত জিবরাইলের প্রথম শব্দগুলো ছিল : ‘পড়ো, তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। ভ্রণ থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন’। মুহাম্মদ প্রথমে বুঝে উঠতে পারেননি আসলেই কী ঘটছে। তিনি কি কোনো অশুভ আত্মার কথা শুনলেন, যে তাকে প্ররোচিত করতে চাইছে? নাকি তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন? যারা কণ্ঠ শোনেন বা কোনো দৃশ্য দেখেন, তাদেরও এই নামেই চিহ্নিত করা হয়? সুতরাং সংশয়ে আচ্ছন্ন মুহাম্মদ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কণ্ঠ অসাধারণ সৌন্দর্যপূর্ণ শব্দসহ তার সাথে কথা বলা অব্যাহত রেখেছিল। এবং তিনি অবশেষে এটির ওপর বিশ্বাসস্থাপন করেছিলেন, এবং অনুধাবন করেছিলেন এই কণ্ঠটি তাকে নবী হবার আহ্বান জানাচ্ছে।
আর নবী হবার ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হচ্ছে, তারা যা কিছু শুনেছেন সেটি তারা নিজেদের মধ্যে চেপে রাখতে পারবেন না। সবাইকে সতর্ক করতে আর ঈশ্বর তাদের যা নির্দেশ দিয়েছেন সেটি অনুসরণ করতে তাদের প্ররোচিত করার দায়িত্ব দিয়েই নবীদের পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। সুতরাং কয়েক বছর ফেরেশতা জিব্রাইলের কাছে ঐশী নির্দেশনা শোনার পর যে নির্দেশনাগুলো তিনি মুখস্থ করেছিলেন–এবং তার স্ত্রী খাদিজার উষ্ণ সহায়তা আর উৎসাহে, ৬১৩ খ্রিস্টাব্দে মক্কাবাসীদের কাছে মুহাম্মদ সেটি প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। তার মূল বার্তাগুলোর মধ্যে একেবারে নতুন বা মৌলিক কিছু ছিল না এবং তিনি কখনো সেটি দাবিও করেননি। তারা যা কিছু ভুলে গেছেন এটি সেটাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। এটি নবী আব্রাহামের বার্তা : মূর্তিগুলো সব মিথ্যা আর একমাত্র একজন আল্লাহ আছেন, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই।
মুহাম্মদের এই বার্তাটি বিশেষ করে দরিদ্রদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল, কারণ তাদেরকে ঠকিয়েই ব্যবসায়ীরা, যারা পবিত্র স্থানটি দেখাশুনা করত আর নানা ধরনের মূর্তি বিক্রয় করত, তারাই শুধু লাভবান হয়ে উঠেছিলেন। শীঘ্রই তিনি মক্কায় অনুসারীদের একটি দল পেয়েছিলেন, যারা, নিজেদের আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছেন। আর এটাই ‘মুসলিম’ শব্দটির অর্থ। সবকিছুই ঠিকমতো চলছিল যতক্ষণ তিনি শুধুমাত্র ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই এবং মুহাম্মদ হচ্ছেন তার শেষ নবী’ –এই বার্তাটি প্রচারের মধ্যেই নিজের কাজ সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। তখন ধর্মের সংখ্যা ছিল অনেক এবং আধ্যাত্মিকতার বাজারে সবসময়ই আরো একটি ধর্মের জায়গা থাকে। তবে বিষয়টি অন্যদিকে মোড় নেয়, যখন এই নতুন বিশ্বাসটি প্রতিষ্ঠিত স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যবসা আর সেই ব্যবসা থেকে অর্জিত লভ্যাংশ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার মতো আশঙ্কা সৃষ্টি করে। আর সেখানে সেটাই হয়েছিল। মুহাম্মদ এইসব ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করেছিলেন, যারা কাবার পাশেই মূর্তির বাজারে মূর্তি বিক্রয় এবং পবিত্র কুয়া থেকে পানি পান করতে তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন। এরপর যা ঘটার সেই অনিবার্য ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করেছিল। সমগ্র মক্কাজুড়ে মুসলমানদের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের পর্ব শুরু হয়েছিল।
