আর যখন আদম আর হাওয়া তাদের শিশুসুলভ সরলতা হারিয়েছিলেন, ঈশ্বর তাদের এই পৃথিবীতে নির্বাসিত করেছিলেন প্রাপ্তবয়স্কতার সব জটিলতাসহ। কিন্তু ইসলামে বর্ণিত এই কাহিনির বিবরণে, তিনি আদম আর হাওয়াকে সেই বাগান থেকে স্মারক হিসাবে কিছু একটা নিয়ে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন, যা কিনা চিরকাল তাদের সাথে থাকবে। তারা ইডেন হারিয়েছেন ঠিকই কিন্তু ঈশ্বরকে হারাননি। তাদের জন্যে স্বর্গের বাগানের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও ঈশ্বর তখনো তাদের সাথে ছিলেন। আর তারা স্বর্গ থেকে যে-জিনিসটি তাদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন সেটি হচ্ছে একটি কালো পাথর, যা তাদের সাথে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এসেছিল। আব্রাহাম সেই পাথরটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, আর সেটাই তিনি সেই কাবায় স্থাপন করেছিলেন, যা তিনি নির্মাণ করেছিলেন ইসমায়েলের আবিষ্কৃত সেই মরূদ্যানে। এই কাবা ও এর বিখ্যাত পৌরাণিক কালো পাথরটিকে ঘিরেই একটি শহর গড়ে উঠেছিল। সেই শহরটির নাম মক্কা।
মক্কা (যা এখন সৌদি আরবের একটি শহর) আরব উপদ্বীপে লোহিত সাগরের পূর্বতীরে মোটামুটি মাঝামাঝি একটি জায়গায় অবস্থিত। আরব পৃথিবীর অন্যতম একটি রহস্যময় আর আকর্ষণীয় একটি এলাকা। আরব একটি বিশাল উপদ্বীপ, ১২০০ মাইল দীর্ঘ আর ১৩০০ মাইল প্রশস্ত পশ্চিমে লোহিত সাগর, দক্ষিণে আরব সাগর আর পূর্বে পারস্য উপসাগর এটিকে ঘিরে রেখেছে। এর অভ্যন্তরের বিশাল মরুভূমিতে বাস করত যাযাবরদের নানা গোত্র অথবা বেদুইনরা, যারা খুবই দৃঢ়সংকল্প এবং তীব্রভাবেই স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের দল, জেনেসিস সঠিক বিবরণ দিয়েছিল, যখন এটি ইসমায়েলকে বর্ণনা করেছিল, বন্য গাধার মতে, প্রতিটি মানুষের সাথে তার শত্রুতা, আর তার সাথে শক্রতা প্রতিটি মানুষের’। যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী বেদুইন গোত্রগুলো পানির কুয়া আর মরূদ্যানের মালিকানা নিয়ে পরস্পরের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকত, কিন্তু সবাই মক্কা নামের এই পবিত্র শহরটিকে শ্রদ্ধা করতেন, এবং সেখানে তারা তীর্থে যেতেন সেই কালো পাথরটিতে চুমু খেতে, যা আদমের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আব্রাহাম পেয়েছিলেন, এবং তারা সেই কুয়ায় পানি পান করেন, যা ইসমায়েল আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের পিতামহ আব্রাহাম ছিলেন একজন আবেগময় একেশ্বরবাদী, কিন্তু তাদের সম্বন্ধে সেটি বলা সম্ভব ছিল না। যদিও তারা সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের ঈশ্বর আল্লাহর উপাসনা করতেন, কিন্তু তারা তাদের মূর্তিগুলোকে ভালোবাসতেন, বছরের প্রতিটি দিনের জন্যে তাদের একটি করে মূর্তি ছিল। এই তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী বেশ ভালোই উপার্জন করতেন, যারা কালো পাথরে চুমু এবং পবিত্র কুয়া থেকে পানি পান করতে আসতেন, তারা তাদের দোকান থেকে মূর্তি কিনতেন, যা কাবার চারপাশ ঘিরে বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল।
আব্রাহাম–যেমন প্রাচীন হিব্রু কাহিনি আমাদের বলেছে– জানতেন কত সহজে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা যায়। তিনি দেখেছিলেন পারিবারিক দোকানে বিক্রয় করতে তার বাবা দোকানে বসেই নানা দেবতাদের মূর্তি গড়তেন। যে মূর্তিগুলোকে তিনি প্রতারণা হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, দরিদ্রদের থেকে অর্থ শুষে নেওয়ার ধূর্ত একটি কৌশল। মক্কায় যা হচ্ছিল সেটি দেখে তিনি নিশ্চয়ই আরো বেশি রেগে যেতেন, যেখানে ব্যবসায়ীরা তীর্থযাত্রীদের প্রয়োজনীয়তাগুলো বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল, যারা কিনা আধ্যাত্মিক সান্ত্বনার জন্যে সেখানে উপস্থিত হতেন। আর ধর্ম সময় নির্বিশেষে পবিত্র সব শহরেই এমন কিছু ঘটতে দেখা যায়। প্রয়োজন আছে এমন অভাবী মানুষের কাছে আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা বিক্রয় করে খুব দ্রুত আয় করা যায়। যিশু নিজেও এর বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন, যখন জেরুজালেমে তিনি দেখেছিলেন কীভাবে পুরোহিতদের পরিবারগুলো গরিবের অর্থে বিত্তশালী হয়ে উঠেছে। এ কারণে তিনি মন্দিরে মূদ্রা রূপান্তকারীদের টেবিল উল্টে দিয়েছিলেন এবং তাদের বলেছিলেন তারা ঈশ্বরেরে ঘরকে ‘ডাকাতের’ আস্তানায় পরিণত করেছেন। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে একজন মানুষ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যিনি যিশুর মতোই আব্রাহামের একেশ্বরবাদকে তার জন্মশহরে হকার, ফেরিওয়ালা আর দোকানি ব্যবসায়ীদের দ্বারা কলুষিত হতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি মুহাম্মদ নামেই পরিচিত ছিলেন।
মুহাম্মদের জীবন আদৌ সহজ কোনো জীবন ছিল না, জন্মের আগেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন, আর ছয় বছর বয়সে তিনি তার মাকেও হারিয়েছিলেন। এতিম এই শিশুটিকে দেখাশুনা করেছিলেন তার দাদা, যতদিন-না তার চাচা, একজন সফল ব্যবসায়ী, আবু তালিব তাকে দত্তক নিয়েছিলেন। তিনি তরুণ মুহাম্মদকে উটচালক হিসাবে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পণ্যবোঝাই উটের ক্যারাভান আরব-অর্থনীতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। মরুভূমির মধ্যদিয়ে সেগুলো উত্তরে সিরিয়া, পশ্চিমে মিশর, প্যালেস্টাইন আর পূর্বে পারস্যে যাতায়াত করত। এই ক্যারাভানগুলো সুগন্ধী আর মশলা নিয়ে যেত, আর রেশম আর সুতির কাপড়ের বিনিময়ে সেগুলো বাণিজ্য করত তাদের দীর্ঘ যাত্রাশেষে দেশে ফিরে আসার আগে। নবী ইসাইয়া বর্ণনা করেছিলেন দক্ষিণ আরবের শেবা থেকে অসংখ্য মালবাহী উটের কাফেলা জেরুজালেমে সোনা আর ফাঙ্কিনসেন্স (ধূপ) নিয়ে আসত। আর এই ধরনের বাণিজ্যে মোহাম্মদ শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন।
