কনস্টান্টিন এই ফলাফল নিয়ে এতই তৃপ্ত হয়েছিলেন যে, তিনি সব বিশপদের রাজকীয় একটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি তার দেহরক্ষীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার প্রাসাদের দরজার সামনে তাদের তলোয়ারগুলো রেখে আসতে এবং বিশপরা আড়ম্বরের সাথে তার রাজকীয় কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে তারা রাজকীয় ভোজসভায় অংশ নেন পুরো কক্ষে চমৎকারভাবে সজ্জিত কাউচের উপর শুয়ে। একজন বিশপ এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি এই অনুষ্ঠানটিকে বর্ণনা করেছিলেন যেন পৃথিবীতে অবশেষে খ্রিস্টের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এমন কোনো দৃশ্য অবশ্যই যিশু তার নিজের বলে শনাক্ত করতে পারতেন না। যে শক্তি একদিন তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করেছিল সেটি এখন এর নিজের উদ্দেশ্যপূরণের লক্ষ্যে তাকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
ইতিহাসবিদরা এই ঘটনাটি চার্চের চুড়ান্ত বিজয় হিসাবে দেখেছেন, এর নির্যাতনকারীদের ওপর এবং ইউরোপীয় ইতিহাসে তাদের দীর্ঘ প্রাধান্য বিস্তারকারী পর্বের সূচনা হিসাবে। এটি নিজেকে ক্যাথলিক চার্চ (বিশ্বজনীন) নামে চিহ্নিত করতে শুরু করেছিল। কারণ এটি সারা রোমসাম্রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত ছিল। সাম্রাজ্যের ক্ষমতা যখন পড়তির দিকে, চার্চের ক্ষমতা তখন ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যতক্ষণ-না এটি সেই পর্যায়ে যেতে পেরেছিল, যখন এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, এবং রাজারাও আতঙ্কিত থাকতেন এর কর্তৃত্বের সামনে। পার্থিব রাজনৈতিক শক্তির সাথে এর অংশীদারিত্ব পরিচিতি পেয়েছিল ক্রিসেনডম বা খ্রিস্টরাজ্য নামে। আর এই খ্রিস্টীয় রাজ্য এতই শক্তিশালী ছিল এর চূড়ান্ত শীর্ষে, গরিমার মেঘে আবৃত থাকা এর এই নতুন রূপের মধ্যদিয়ে তখন গ্যালিলি থেকে আসা সেই কৃষকটির রক্তাক্ত শরীরকে দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, যিনি এই সবকিছুরই সূচনা করেছিলেন। প্রায়, তবে একেবারে অসম্ভব নয়। কারণ যদিও এখন একটি সত্যিকারের রাজমুকুট তার মাথার উপর শোভা পাচ্ছে এবং সত্যিকারের রাজকীয় বেগুনি চাদরে তিনি আচ্ছাদিত, যখন তারা চার্চে প্রার্থনা করতে আসত, খ্রিস্টানরা নিউ টেস্টামেন্ট থেকে সেই অন্য খ্রিস্টের বর্ণনা শোনা অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে তিনি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আর কখনোই ফিরে আসেননি। কিন্তু চার্চে সবসময়ই সেই মানুষগুলো ছিলেন যারা ভেবেছিলেন, এর কারণ হচ্ছে তিনি আসলেই কখনো চলে যাননি।
খ্রিস্টানদের গল্প শেষ হওয়া এখনো অনেক বাকি। এর শ্রেষ্ঠতম বছরগুলো এখনো আসা বাকি। তবে আমরা সেই কাহিনি ছেড়ে যাব পরের কয়েকটি অধ্যায়ে আরেকটি ধর্মের উত্থানের বিষয়টি দেখতে, যে-ধর্মটিও অতীতের আব্রাহামকে তাদের পিতা হিসাবে দেখেছিল : ইসলাম।
২২. শেষ নবী
তিনটি ধর্ম আব্রাহামকে তাদের পূর্বসূরি পিতা হিসাবে দাবি করে। আর এই দাবিটিকে বোঝার দুটি উপায় আছে। একধরনের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের রূপ হিসাবে এটিকে গ্রহণ করা যেতে পারে। আব্রাহাম তার একেশ্বরবাদের ধারণাটি প্রথমে হস্তান্তর করেছিলেন ইহুদিদের এবং তাদের মাধ্যমে খ্রিস্টানদের কাছে। তারপর সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম এটিকে পুনরায় দাবি করেছিল, যা এটিকে দেখেছিল এই ধর্মদুটির দ্বারা এর লঘুকরণ হিসাবে। কিন্তু এছাড়াও শারীরিক অর্থে আব্রাহামের উত্তরাধিকারের ধারণাটিকে বোঝা সম্ভব হতে পারে। আব্রাহামের ছেলে আইজাক ছিলেন ইজরায়েলের জনক, যার মধ্যে দিয়ে ইহুদি আর খ্রিস্টানরা তাদের বংশঐতিহ্য খুঁজে পায়। কিন্তু আব্রাহামের আরো একটি ছেলে ছিল। আর সেখানে একই কাহিনির সূচনা।
আব্রাহামের দুইজন স্ত্রী ছিলেন, সারা এবং তার মিশরীয় ভৃত্য হাজার। সারা হাজারকে ঈর্ষা করতেন। তিনি ভয় পেতেন যে আব্রাহাম হাজারের পুত্র ইসমায়েলকে তার উত্তরাধিকার হিসাবে ঘোষণা করবেন। সুতরাং দুজনকে নির্বাসনে পাঠাতে তিনি তার স্বামীকে প্ররোচিত করেছিলেন। হাজার তার শিশুপুত্রকে নিয়ে লোহিত সাগরের নিকটবর্তী মরুভূমিতে দিভ্রান্ত হয়ে ঘুরেছিলেন, সেখানে একটি পাথরের উপর বসে তিনি কাঁদছিলেন, কারণ তিনি নিজেকে খুব অসহায় আর দুঃখী অনুভব। করছিলেন। কিন্তু ইসমায়েল আদৌ বিষণ্ণ ছিলেন না। তিনি ক্ষুব্ধ, খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। ইসলামের ঐতিহ্যমতো তিনি ক্ষুব্ধ অবস্থায় বালির উপর লাথি মারতে শুরু করেছিলেন। তিনি এত জোরে লাথি মেরেছিলেন যে, তিনি একটি ঝর্নার অস্তিত্ব উন্মোচন করেছিলেন, পানির যে ঝর্নাগুলো মরুভূমির সবুজ এলাকায় দেখা যায়, যাদের মরূদ্যান বলে। যখন আব্রাহাম শুনেছিলেন যে ইসমায়েল একটি মরূদ্যান সৃষ্টি করেছেন, তিনি তার পরিত্যক্ত স্ত্রী এবং সন্তানকে দেখতে আসেন, এই ঝর্নার কাছেই একটি উপাসনালয় নির্মাণ করেন, যে ঝর্নাটি তাদের জীবন রক্ষা করেছে। এই মন্দিরে তিনি একটি পবিত্র কালো পাথর স্থাপন করেছিলেন। আর সেই পাথরের সাথে সংশ্লিষ্ট আছে আরো একটি কাহিনি।
জেনেসিস, যে বইটি ইহুদি বাইবেলের প্রথম বই, আমাদের জানাচ্ছে, প্রথম পুরুষ ছিলেন আদম এবং তার স্ত্রীর নাম ছিল ইভ বা হাওয়া। আদম আর হাওয়া একটি বিস্ময়কর সুন্দর বাগানে বাস করতেন, যার নাম ইডেন, যেখানে তাদের কোনোকিছুরই অভাব ছিল না। বাগানের সব ফলের গাছের মধ্যে শুধুমাত্র একটি তাদের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। এটাই ছিল ভালো আর খারাপ বোঝার সেই জ্ঞানবৃক্ষ। আদম এবং হাওয়া অপরিবর্তনশীল শিশুসুলভ একটি জীবন কাটাচ্ছিলেন, তাদের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করেছিলেন ঈশ্বর। পিতামাতারা প্রায়শই তাদের সন্তানদের চিরকালই শিশু করেই রাখতে চান। কিন্তু শিশুরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে বড় হয়ে ওঠার জন্যে, ভালোমন্দের জ্ঞান অর্জন করার জন্যে। এই তাড়নাই আদম আর হাওয়াকে প্ররোচিত করেছিল সেই নিষিদ্ধ ফলটি খেতে। এবং সাথে সাথেই তাদের মন প্লাবিত হয়েছিল সেই জ্ঞানে, জীবন আর আগের মতো সরল নেই।
