অবশ্যই যিশুর স্বর্গীয় পরিচয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক ছাড়াও তারা অনেক কিছুই করেছিলেন। তারা দরিদ্র অসহায়দের সেবা করেছিলেন। রোমান সাম্রাজ্যে প্রশাসনিক কাঠামো অনুকরণ করে দক্ষতার সাথে তারা নিজেদের সংগঠিত করেছিলেন। তারা নিজেদের ভৌগোলিক সীমানায় ভাগ করেছিলেন, যে ভৌগোলিক এককগুলোর তারা নাম দিয়েছিলেন ‘ডাইওসিস’, যেখানে প্রশাসক হিসাবে একজন তত্ত্বাবধায়ক অথবা বিশপকে নিয়োগ দেওয়া হতো। বিশপের অধীনে থাকতেন যাজকরা, যারা স্থানীয় খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর দেখাশুনা করতেন। সমাজকল্যাণের জন্যে তৃতীয় একটি স্তর ছিল, সেই কর্মীদের বলা হয় ডিকন, যারা দরিদ্র আর অসহায়দের দেখাশুনা করতেন। খুব কার্যকরী দক্ষ একটি সংগঠন তারা তৈরি করেছিলেন, এবং মসৃণভাবে এটি কাজ করেছিল। খুব শীঘ্রই বড় শহরগুলোর যেমন, রোম, বিশপরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, এমনকি সাম্রাজ্যের কর্তৃপক্ষের কাছেও। নির্যাতন অব্যাহত ছিল খানিকটা মাত্রায়, কিন্তু সেটি চার্চকে আরো শক্তিশালী করেছিল। এবং শেষ নির্যাতনপর্বটি প্রমাণিত হয়েছিল রাতের শেষ আঁকড়ে ধরার মতো, যার পরেই এসেছিল নতুন আর বিস্ময়কর একটি ভোর।
যখন খ্রিস্টীয় চার্চ নিজেকে গড়ে তুলেছিল শক্তিশালী একীভূত একটি সংগঠন হিসাবে, রোম সাম্রাজ্য ঠিক বিপরীত দিকে অগ্রসরমান ছিল। নিজেকে বহুখণ্ডে খণ্ডিত করার মাধ্যমে ক্রমশ এটি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এর সেনারা সাম্রাজ্য রক্ষা করতে দেশের সীমানায় হামলে-পড়া আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বদলে বরং নিজেদের মধ্যেই বেশিরভাগ সময় যুদ্ধ করে কাটাতে শুরু করেছিল। কিন্তু অনিয়মিতভাবে শক্তিশালী কয়েকজন নেতার আবির্ভাব হয়েছিল, যারা সাম্রাজ্যের ধ্বংস ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলেন ডাইক্লেশিয়ান। ২৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি সম্রাট হয়েছিলেন, সাম্রাজ্যকে একত্রিত করার প্রচেষ্টায় খ্রিস্টান চার্চের উপর তিনি সর্বশেষ এবং হিংস্রতম নির্যাতনপর্বটি পরিচালনা করেছিলেন। কারণ তিনি তাদেরকে মিত্র না ভেবে বরং তার লক্ষ্য অর্জনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিলেন। এই ভয়াবহ নির্যাতনের পর্বটি শুরু হয়েছিল ৩০৩ খ্রিস্টাব্দে এবং যতদিন এটি চলেছিল, পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ, কিন্তু এর আগে যত নির্যাতনপর্ব এসেছিল, এটি তার কোনোটির চেয়ে বেশি সফল হতে পারেনি। এর দশ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছিল যখন চার্চ আর সাম্রাজ্য এক হয়ে গিয়েছিল।
৩০৫ খ্রিস্টাব্দে যখন ডাওক্লেশিয়ান অসুস্থ হবার পর সম্রাটের পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। খুব দ্রুত নেতৃত্বের ওপর দাবি করা প্রতিদ্বন্দ্বীরা আবার পরস্পরের সাথে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন কনস্টান্টিন। ৩১২ খ্রিস্টাব্দে, রোমের উপকণ্ঠে একটি যুদ্ধের আগের রাতে, যে যুদ্ধটি নির্ধারণ করবে, কে রোমের পরবর্তী সম্রাট হবেন, কনস্টান্টিন তার তাঁবুতে ঘুমিয়েছিলেন, তিনি খুব জীবন্ত একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন খ্রিস্টীয় চিহ্ন ‘ক্রুশ’ তার সামনে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে, এবং তিনি একটি কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলেন, যা তাকে নির্দেশ দিচ্ছে, এই প্রতাঁকের নিচে তুমি জিতবে।
পরের দিন সকালেই তিনি সেই ব্যানার তৈরি করেন, এবং সেটি উজ্জ্বলভাবে ক্রুশের চিহ্ন দিয়ে অলংকৃত করেন, এবং যুদ্ধে যান, এবং তিনি সেদিন তার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছিলেন। পরের বছরই তিনি খ্রিস্টানদের নির্যাতন করার ডিক্রিটি বাতিল করে দেন এবং সাম্রাজ্য জুড়েই ধর্মপালনে অসীম স্বাধীনতা প্রদান করেন। ৩১৫ সালে তিনি ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ডের প্রথাও বাতিল করেছিলেন, যা খ্রিস্টানরা তীব্রভাবেই ঘৃণা করে আসছিলেন। এবং ৩২৪ সাল নাগাদ, যদিও অন্য ধর্মগুলোর প্রতি সহিষ্ণু ছিল রোম, তিনি খ্রিস্টান ধর্মকে সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র বিশ বছরের মধ্যে নির্যাতিত অস্পৃশ্য একটি ধর্ম থেকে সম্রাটের প্রিয় ধর্মে রূপান্তরিত হবার ঘটনাটি ছিল আসলেই বিস্ময়কর একটি রূপান্তর।
কিন্তু খুব সরল হবে যদি কনস্টান্টিনের যিশুর ধর্মে ধর্মান্তরের বিষয়টিকে আধ্যাত্মিক হিসাবে দেখা হয়। তিনি খুবই ধূর্ত রাজনীতিবিদ ছিলেন, এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, একমাত্র খ্রিস্টধর্মই তার সাম্রাজ্যকে একীভূত করে রাখার ক্ষেত্রে আঠার মতো কাজ করবে : একটি বিশ্বজনীন চার্চ একটি বিশ্বজনীন সাম্রাজ্যের উপর মূদ্রিত করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন যখন আবিষ্কার করেছিলেন, মানুষ আর ঈশ্বর হিসাবে যিশুখ্রিস্টের প্রকৃতি সংজ্ঞায়িত করার শ্রেষ্ঠ উপায় নিয়ে চার্চ নিজেই বহু প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। এই বিতর্কের সমাধানের পরিণতি এত ক্ষুদ্র একটি বিষয় ছিল, এটি আসলেই একটি মাত্র অক্ষরের ওপর নির্ভর করে ছিল, সেটি হচ্ছে আইয়োটা, আই (i) অক্ষরটির গ্রিক সংস্করণ। এই বিতর্ক সমাধান করার প্রত্যয়ে, ৩২৫ সালে কনস্টান্টিন বর্তমান তুরস্কের একটি শহর নাইসিয়ায় তার সাম্রাজ্যের সব বিশপ আর ধর্মতাত্ত্বিকদের ডেকে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর তিনি তাদের একটি ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলেন, এবং যতক্ষণ-না তারা এই সমস্যাটির সমাধান করতে পারেন ততক্ষণ তাদের মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ‘আয়োটা’ কি বাদ যাবে, না গ্রহণ করা হবে? (সিজারিয়ার ইউসেবিয়াস যে-শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি হচ্ছে homoiousios বা ‘একই ধরনের উপাদানে তৈরি, এটি নাইসিয়ার কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত, যিশু এবং ঈশ্বর পিতা হচ্ছেন homoousios বা একই উপাদানে তৈরি, তার থেকে ভিন্ন ছিল। সেই সময়ের খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করতেন যে, তারা একই ধরনের উপাদানে তৈরি, এর মানে হচ্ছে একজন যিশু তিনি পরিত্রাণকারী ঈশ্বর পিতার হুবহু নয়, যা ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বর। উপরন্তু, যদি তারা একই ধরনের স্বর্গীয় উপাদানে তৈরি হয়ে থাকেন, তাদের মূল একেশ্বরবাদের মতবাদেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সৃষ্টি হয়। এভাবেই কাউন্সিল অব নাইসিয়া প্রস্তাব করেছিল যে, যিশু ও স্বর্গীয় পিতা একই উপাদানে তৈরি। আর homoiousios আর homoousios শব্দদুটির মধ্যে পার্থক্য ছিল একটি গ্রিক অক্ষর, আইওটা (i), আর এখান থেকেই সেই অভিব্যক্তিটি এসেছে, এক আইওটা পার্থক্য। অবেশেষে তারা আইওটাটি সেই শব্দ থেকে বাদ দিয়েছিলেন যা বিতর্কের মূলে ছিল। এই সমস্যাটির সমাধান হয় এবং পুরোপুরি ঈশ্বর আর পুরোপুরি মানুষ হিসাবে যিশুখ্রিস্টের প্রকৃতিটি অবশেষে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছিল।
