ধূপ হচ্ছে গাছের নিঃসৃত একধরনের রস বা রেজিন, যার সাথে নানা সুগন্ধী ভেষজ মিশ্রিত করা হয় এবং যখন এটি পোড়ানো হয় তখন বেশ মিষ্টি গন্ধসহ একটি ধোয়া চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। প্রাচীন ধর্মগুলোয়, কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে এই ধূপ জ্বালানো খুব জনপ্রিয় একটি উপাসনাপদ্ধতি ছিল। তারা সম্ভবত একসময় ভাবতেন, যখন এই ধূপদানি থেকে ধোঁয়া উপরে উঠবে, এর সুবাস স্বর্গের দেবতাদের তৃপ্ত করবে এবং তাদের সমর্থন বা আজ্ঞা নিশ্চিত করবে। রোমের নাগরিকদের জন্যে তাদের সম্রাটের ছবির নিচে ধূপদানিতে কিছু ধূপ পোড়ানো একটি আবশ্যিকতা ছিল, ঠিক যেন তারা তাকে একজন দেবতা হিসাবে উপাসনা করছেন। এটি আনুগত্যের একটি পরীক্ষায় রূপান্তরিত হয়েছিল, অনেকটাই পতাকার প্রতি সম্মানপ্রদর্শন আর জাতীয় সংগীতের সময় উঠে দাঁড়ানোর মতো। তারা তাদের সম্রাটকে আসলেই দেবতা হিসাবে দেখতেন কিনা সেটি নিয়ে সংশয় আছে, তবে এই আচারটি অবশ্যই সেদিকে ইঙ্গিত করছে। কিন্তু খ্রিস্টানদের জন্যে এমন কিছু মেনে নেওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার প্রমাণিত হয়েছিল। তারা প্রতিবাদ করেছিলেন, যদিও তারা সম্রাটের অনুগত প্রজা, তারপরও তারা তাকে কোনো দেবতার মতো ভক্তিপ্রদর্শন করে ধূপ জ্বালাতে পারবেন না।
এটাই কর্তৃপক্ষকে ভীষণ খেপিয়ে তুলেছিল। সেই গুজবটি, খ্রিস্টানরা পৃথিবীর পরিসমাপ্তির জন্যে গোপনে পরিকল্পনা করছেন, সেইসাথে সম্রাটের প্রতি তাদের ধূপ জ্বালাতে অস্বীকৃতি প্রকাশ, ধারাবাহিকভাবে খ্রিস্টানদের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের ভয়ংকর পর্বগুলোর সূচনা করেছিল, যা পরবর্তীতে কদাচিৎ বিরতিসহ কয়েক শতাব্দী ধরে অব্যাহত ছিল। এটি শুরু হয়েছিল ৬৪ খ্রিস্টাব্দে যখন নিরো রোম-সম্রাট ছিলেন। একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড রোম শহরকে প্রায় ধ্বংস করেছিল, সেই সময় একটি গুজবও রটেছিল যে, কাজটি স্বয়ং সম্রাট করেছেন তার প্রাসাদ সম্প্রসারণের জন্যে জায়গা পরিষ্কার করতে। এবং বলা হয়েছিল তিনি তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন যখন নিচে পুরো শহরটি আগুনে পুড়ছিল।
বিপদ হতে পারে এমন হুমকির মুখে আতঙ্কিত হয়ে নিরো এই দোষটি পুরোপুরিভাবে খ্রিস্টানদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। প্রত্যেকেই জানতেন, তারা সম্রাটকে ঘৃণা করেন এবং এই পৃথিবীর পরিসমাপ্তি ঘটুক, এটাই তারা আশা করেন। সুতরাং তারাই দোষী। কুৎসিত গণনির্যাতনের একটি পর্ব শুরু হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, নিরো কয়েকজন খ্রিস্টান ব্যক্তির সারা শরীর তেল দিয়ে আবৃত করে তার প্রাসাদের বাগানে মোমবাতির মতো প্রজ্বলিত করেছিলেন। আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারব না, কিন্তু সম্ভাবনা আছে পলের শিরশ্চেদ করা হয়েছিল চার্চের উপর রোম-কর্তৃপক্ষের প্রথম আনুষ্ঠানিক নিপীড়নপর্বে। একটি বিশ্বাসের ধারা আছে, যেটি দাবি করে এরপর অ্যাপোস্টল পিটার রোমে এসেছিলেন, এবং তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিংবদন্তি বলছে পিটার উল্টো করে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কারণ তিনি তার প্রভু যিশুকে ত্যাগ। করেছিলেন যখন রোমানরা তাকে গ্রেফতার করেছিল।
এই নির্যাতন খ্রিস্টধর্মের সম্প্রসারণকে মন্থর করার জন্যে কিছুই করতে পারেনি। বরং এর বিপরীতটাই একটি সত্য ছিল। আর এমনটা প্রায়শই ঘটে যখন কর্তৃপক্ষ এমন কোনোকিছুকে দমন করে বিলুপ্ত করতে চেষ্টা করেন, যার প্রতি এর সম্মতি নেই। নির্যাতিত খ্রিস্টানরা দাবি করেছিলেন শহীদের রক্তই হবে চার্চের বীজ। এবং এরপরের প্রায় আড়াই শতাব্দীতে পুরো সাম্রাজ্য জুড়েই চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আলোচনা আরো অগ্রসর করার আগে একটি তথ্য জানানো ভালো, ‘চার্চ’ শব্দটির দুটি অর্থ আছে। এটি একটি গ্রিকশব্দকে অনুবাদ করেছিল, যার অর্থ শুধুমাত্র একটি সমাবেশ’ বা ‘এক গোষ্ঠী মানুষ। সুতরাং খ্রিস্টীয় চার্চের অর্থ হচ্ছে সেই মানুষগুলো, যারা খ্রিস্টকে অনুসরণ করেন। অনিবার্যভাবে যে দালানগুলোয় তারা মিলিত হতেন সেটিও পরিচিত হয়ে উঠেছিল চার্চ’ নামে। আর সবচেয়ে ভালো উপায়, যার মাধ্যমে আমরা এই দুটি অর্থকে পৃথক করতে পারি, সেটি হচ্ছে একটি বড়হাতের ‘সি’ ব্যবহার করা, বড় হাতের ‘সি’ সহ চার্চ মানে জনগোষ্ঠী অথবা সমাবেশ –চার্চ (Church), ছোট হাতের ‘সি’ হচ্ছে সেই ভবনটি যেখানে তারা একত্র হয়, চার্চ (church)।
প্রথম খ্রিস্টানরা যখন তাদের নির্যাতনকারীদের কাছে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করতেন না, তখন তারা বহু সময় ব্যয় করেছিলেন তাদের বিশ্বাস নিয়ে পরস্পরের সাথে তর্ক-বিতর্ক করে। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি চার্চের প্রথম বিতর্কটি ছিল, যারা ইহুদি নয় এমন কেউ যারা ধর্মান্তরিত হবেন, তারা কি ইহুদিদের অনুশাসনগুলো মেনে চলবেন কিনা। পল সেই বিতর্কে জিতেছিলেন, এবং ইহুদি অনুসারীদের বাইরে খ্রিস্টধর্ম আর চার্চের ব্যাপক সম্প্রসারণে তিনি স্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। এবং এটি ভবিষ্যতে আরো বহু জটিল বিতর্কের একটি সূচনাপর্ব ছিল। এরপরের সবচেয়ে বড় বিতর্কটি ছিল, যিশু কে ছিলেন, সেই বিষয়ে। তারা জানতেন, তিনি একজন মানব-পুরুষ ছিলেন। তারা জানতেন, তিনি নাজারেথ থেকে এসেছিলেন। তারা জানতেন, জেরুজালেমে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এবং তারা জানতেন, ঈশ্বর তাকে তার প্রিয়পুত্র হিসাবে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু কীভাবে তিনি একই সাথে একজন মানব-পুরুষ আর ঈশ্বরপুত্র হতে পারেন? পল এই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এমন কিছু বলে যে, ঈশ্বর তাকে পালকপুত্র হিসাবে ‘দত্তক’ নিয়েছিলেন। সুতরাং এর অর্থ কি এমন হতে পারে যে, কোনো একটি সময় ছিল যখন তিনি ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন না? তারা বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা পছন্দ করেননি। তারা এর বিপরীত একটি ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। তিনি সবসময়ই ঈশ্বরপুত্র ছিলেন। এবং খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৪ সালের আশেপাশে কোনো একটি সময় এই পৃথিবীতে ছদ্মবেশে তিনি এসেছিলেন তার সন্তানদের উদ্ধার করতে। পুনরায় ঈশ্বরের কাছে প্রত্যাবর্তনের আগে, ত্রিশ বছর ধরে তিনি মানব-পুরুষের জীবন কাটিয়েছিলেন। সুতরাং তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মানুষ এবং সম্পূর্ণ ঈশ্বর। কিন্তু ঠিক কীভাবে বিষয়টির বোধগম্য একটি ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হতে পারে? তারা বিষয়টি নিয়ে বহু শতাব্দী ধরে বিতর্ক করেছিলেন, এবং এটি বহু উপদল আর ধারার জন্ম দিয়েছিল।
