তবে, যিশু আর ফিরে আসেননি, আর যিশু এখনো ফিরে আসেননি, যদিও তিনি একদিন ফিরে আসবেন এই প্রত্যাশাটিরও কোনোদিন মৃত্যু হয়নি। এটাই খ্রিস্টধর্মের আনুষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাসের অংশ, যেখানে এই দিনটি সম্বন্ধে বলা হয়, তিনি তার সব মহিমা নিয়ে ফিরে আসবেন জীবিত এবং মৃত সবাইকে বিচার করতে।
পল অন্য অ্যাপোস্টলদের কাছ থেকে অনিচ্ছাসূচক একটি শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছিলেন এবং তাকে অনুপ্রাণিত করা হয়েছিল, ইহুদি নয় এমন মানুষের কাছে তার ধর্ম প্রচার এবং তার চার্চ প্রতিষ্ঠা করতে। ইহুদিবাদের আনুষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষের কাছে এই পরিস্থিতি খুব ভিন্ন ছিল। তারা তাদের দলের যোগ্য একজন মানুষ ও যিশুর অনুসারীদের নির্যাতনকারী এক দক্ষ ব্যক্তিকে হারিয়েছিল খ্রিস্টধর্মের কাছে। তারা তার ওপর দায়িত্ব দিয়েছিল তাদের শত্রুকে অকার্যকর করতে, কিন্তু তিনি তার আনুগত্য বদলে তাদের সাথেই যুক্ত হয়েছিলেন। এখন তিনি হচ্ছেন তাদের শত্রু। সুতরাং তারাও তার ওপর একই তীব্রতার সাথে প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে এসেছিল, যে তীব্রতা একদিন তাকে দামাস্কাস বরাবর রাস্তায় নিয়ে গিয়েছিল। তাকে প্রায় নিরন্তরভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে আরো নানা মেয়াদে তাকে শাস্তি খাটতে হয়েছিল। পাঁচবার তিনি উনচল্লিশটি বেতের বাড়ির আনুষ্ঠানিক শাস্তি পেয়েছিলেন। তিনবার তাকে লোহার দণ্ড দিয়ে প্রহার করা হয়েছিল। একবার তাকে পাথর ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করাও হয়। অবশেষে, এসব তার পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছিল, রোম-কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি আবেদন করেছিলেন : সর্বোপরি তিনি একজন রোমান নাগরিক, আর সে-কারণে তার বিরুদ্ধে আনীত যিশুর সুসংবাদ প্রচার করার অভিযোগটির সঠিক বিচার করা হোক।
রোম-কর্তৃপক্ষ অবশেষে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, রোমের একজন নাগরিক হিসাবে তার এই দাবি বৈধ, সুতরাং তারা তাকে রোমে নিয়ে এসেছিলেন বিচার করতে। সেখানে পৌঁছানোর পর তারা তাকে বন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু যিশুর নামে ধর্মান্তরিত করার কাজ থেকে তারা কেউই তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। পল এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি তার বিশ্বাসের পক্ষে মানুষকে ধর্মান্তরিত করার কাজটি কোনোভাবে থামাতে পারত না। এমনকি কারাগারেও। তার মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম রোমে প্রবেশ করেছিল। এটি ঘটেছিল নীরবেই, চোখের অন্ত রালে, যখন এই ক্ষুদ্রাকৃতির, ধনুকের মতো বাঁকা পায়ের মানুষটি, যার চোখে গভীর একটি চাহনি ছিল, রোমসাম্রাজ্যের রাজধানীতে বসতি গড়েছিলেন।
অনেক ঘটনা, যা চুপিসারে আসে, প্রায়শই সেগুলো পৃথিবী বদলে দেয়। এটি ছিল তেমন ঘটনাগুলোর একটি। এবং এটি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
২১. চার্চ যখন দায়িত্ব নিয়েছিল
পল পৌঁছাবার আগেই রোমে সম্ভবত খ্রিস্টানরা ছিলেন। সাম্রাজ্যের রাস্তা আর সমুদ্রপথ সৈন্যদের সাথে নানা মতামত আর ধারণার চলাচল সুগম করেছিল, সুতরাং সম্ভাবনা আছে যে, খ্রিস্টানরা ইতিমধ্যেই রোমানজগতের রাজধানীতে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তখন তাদের প্রতি খুব একটা বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়নি। পল বর্ণনা করেছিলেন, প্রথম খ্রিস্টানরা ঘৃণ্য আর অগুরুত্বপূর্ণ। ছিলেন, সেইসব অসহায় মানুষগুলোর মতোই, যারা ইজরায়েলে যিশুকে অনুসরণ করেছিলেন। এবং তাদের মধ্যে বেশকিছু ক্রীতদাসও থাকতে পারেন। ঘোড়া বা যে আস্তাবলে ঘোড়ারা দাঁড়িয়ে, সেগুলোর মতো ক্রীতদাসরাও কোনো মালিকের। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিলেন। দাসপ্রথা সেই জীবনে সর্বজনীন একটি সত্য ছিল। এমনকি বাইবেলও এটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে। পানির সিক্ততা আর বালির শুষ্কতার মতো-খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় ছিল এটি। রোমে তার আটকাবস্থায় পলের ধর্মান্তরিত করা ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন পালিয়ে যাওয়া একজন ক্রীতদাস, ওনেসিমাস, যিনি তার মালিকের কিছু অর্থ ছিনতাই করে শহর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পল তাকে ভালোবেসেছিলেন কিন্তু তাকে দাসত্ব থেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেননি। তিনি তাকে তার মালিক ফিলেমনের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কুড়িয়ে-পাওয়া মানিব্যাগের মতো, এবং তার সাথে দয়াশীল আচরণ করতে ফিলেমনের কাছে অনুনয় করে প্রার্থনা করেছিলেন, এখন যখন সে তার স্বধর্মীয় একজন খ্রিস্টান।
পল কেন দাসপ্রথাকে চ্যালেঞ্জ করেননি এটিকে খ্রিস্টধর্মের বিশ্বজনীন ভালোবাসার পরিপন্থি দাবি করে? এখন যেহেতু তার দাসকে ফিরে পেয়েছেন মালিক, শুধুমাত্র তার সাথে ভালো আচরণ করার অনুনয় করা ছাড়া, তার ক্রীতদাসকে মুক্তি দিতে তিনি কেন ফিলেমনকে প্ররোচিত করেননি? সম্ভবত এর কারণ হতে পারে, পৃথিবী সেই মুহূর্তে যেমন ছিল সেটি বেশিদিন স্থায়ী হবে এমন প্রত্যাশা তিনি করেননি। যিশু খুব শীঘ্রই ফিরে আসছেন পৃথিবীতে ঈশ্বরের ন্যায়বিচার আর ভালোবাসার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতেন আর সে-কারণে, কী দরকার এমন একটি পদ্ধতি পরিবর্তন করা, যার কিনা বিলুপ্তি আসন্ন? আপনি যদি কোনো একটি বাড়ি ভাঙতে শুরু করেন, নিশ্চয়ই সেই বাড়ির পয়ঃপ্রণালী কিংবা পানির লাইন ঠিক করে অযথা সময় আর অর্থ নষ্ট করবেন না। এর মানে প্রথম খ্রিস্টানরা এই জগতে পুরোপুরিভাবে আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি। খুব দ্রুত এই পৃথিবী সমাপ্তি হতে যাচ্ছে, খ্রিস্টানদের এই প্রত্যাশাটি মূলত তাদের বিরুদ্ধে রোমানদের মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুলেছিল। এই মানসিকতাটি তাদের এমন একটি ধারণা দিয়েছিল যে, খ্রিস্টানধর্মাবলম্বীরা বাকি মানবজাতিকে ঘৃণা করে। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আরো একটি বিষয় লক্ষ করার পরেই কেবল রোম-কর্তৃপক্ষ খ্রিস্টানদের তাদের ক্রোধের একটি নিশানা বানাতে শুরু করেছিল।
