একবার একজন ব্যক্তিকে একদল ডাকাত আক্রমণ করেছিল, যারা তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাকে নগ্ন আর অচেতন অবস্থায় খুব বিপজ্জনক আর নির্জন একটি রাস্তার উপর ফেলে রেখে চলে যায়। একজন যাজক তার সহকারীকে নিয়ে সে-পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা দুজনেই ভালোমানুষ ছিলেন, যারা সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের ধর্ম সেটি করতে বাধা দিয়েছিল। রাস্তার পাশে পড়ে-থাকা মানুষটি হয়তো মৃত হতে পারে। এবং সেই আহত ব্যক্তিটি, হয়তো এমন একটি জাতের ইহুদি, যাদের সাথে তার সম্পর্ক রাখার অনুমতি নেই। সুতরাং স্পর্শ করলেই তারা হয়তো অপবিত্র হয়ে যেতে পারেন। তাকে রাস্তার পাশে সেভাবে ফেলে রেখেই তারা অন্য পাশ দিয়ে সেখান থেকে দ্রুত চলে গিয়েছিলেন। এরপর সেখানে এসেছিলেন একজন সামারিটান, এটি সেই বর্ণগুলোর মধ্যে একটি, যে বর্ণের সদস্যদের সাথে ইহুদিদের সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তার নিজের ধর্মেও তাদের মতো একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু সেই মানুষটির কষ্টের প্রতি সহমর্মিতা তার ধর্মের নিষেধাজ্ঞাকে অতিক্রম করতে সহায়তা করেছিল। তিনি সেই মানুষটির সাহায্যে এগিয়ে যান, এবং তার জীবন। রক্ষা করেন। যিশুর মতে, এই প্রতিবেশী এমন কেউ নয়, যাকে অবশ্যই আপনার ধর্মের কেউ হতে হবে। একজন প্রতিবেশী যে-কেউই হতে পারেন, আপনার সহায়তা যার দরকার আছে। যদি ঈশ্বর আমাদের পিতা হয়ে থাকেন আর আমরা তার সন্তান হয়ে থাকি, তাহলে সবাই আমার প্রতিবেশী, আমার ভাই আর আমার বোন।
এই গল্পটির মূল নিশানাটি কী, সেটি বুঝতে ব্যর্থ হওয়া বেশ সহজ একটি ব্যাপার। আইন হচ্ছে নিশানা, মার্ক যখন সাবাথের ঘটনাটি বর্ণনা করেছিল। ক্ষমতার রাজনীতি ছিল নিশানা, যখন ম্যাথিউ সামন অন দ্য মাউন্ট বর্ণনা করেছিলেন। আর গুড সামারিটানের গল, যা লুকের সুসমাচারে আমরা পাই, সেটির নিশানা ছিল ‘ধর্ম’। যিশু বলেছিলেন, যে-প্রতিষ্ঠানগুলো ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করছে, সেগুলো খুব সহজেই ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হতে পারে। কারণ এটি ঈশ্বরের ভালোবাসার চেয়ে নিজের শাসন আর ক্ষমতাকেই বেশি মূল্য দেয়। সুতরাং, খুব বিস্ময়কর নয়, যাজক-পুরোহিতরা যিশুকে ঘৃণা করতেন এবং তার বিরুদ্ধে তারা একটি ষড়যন্ত্র করতে শুরু করেছিলেন। এটি ছিল তার বিরুদ্ধে তৃতীয় অপরাধের অভিযোগ। এটিও তার অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হয়, এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্যে প্রয়োজনীয় অভিযোগপত্র প্রস্তুত হয়েছিল। অতএব তাকে গ্রেফতার করা সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র।
যিশু তার শিষ্যদের একটি প্রার্থনা শিখিয়েছিলেন। এটি সংক্ষিপ্ত তবে এই অল্পকিছু বাক্যের মধ্যে ঠাসা ছিল তার সব শিক্ষা, যা তিনি এতদিন ধরে প্রচার করে আসছিলেন : ‘আমাদের পিতা, যিনি স্বর্গে বাস করেন, এটি এভাবে শুরু হয়েছিল, আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে, স্বর্গে যেমন, তেমনি পৃথিবীতেও আপনার রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এই প্রার্থনাটি এতদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে যে, এমনকি খ্রিস্টানদের জন্যে এটি এর মূলশক্তিটি হারিয়ে ফেলেছে, যারা এটি এখনো ব্যবহার করেন। কিন্তু এর সেই প্রভাবটির কথা কল্পনা করুন যদি আপনি একজন যাজক হতেন, যিনি ভাবেন পৃথিবীতে তিনি ইতিমধ্যে ঈশ্বরের সেবা করছেন। অথবা আপনি যদি রাজনৈতিক কোনো নেতা হয়ে থাকেন, যিনি কোনো বিদ্রোহী উপনিবেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন? এটি ছিল যুদ্ধ ঘোষণার বার্তা। মানুষ হত্যা হবার জন্যে যা যথেষ্ট হতে পারে।
২০. যিশু এলেন রোমে
গভীর রাতে তারা যিশুকে গ্রেফতার করতে এসেছিলেন। গোপন পুলিশ সবসময়ই যে-সময়টিকে এই ধরনের কাজ করার জন্যে বেছে নেয়। যখন পুরো শহর শান্ত থাকে, মানুষের শক্তি যখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে, তখনই তারা আক্রমণ করেন। ব্যক্তিগত মালিকাধীন একটি বাগানে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যেখানে তার গোপন অবস্থান চিনিয়ে দিয়েছিলেন তারই ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি।
প্রতীকী আচরণ করার ক্ষেত্রে যিশু অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। যখন তিনি তার আধ্যাত্মিক মুক্তির আন্দোলনটি শুরু করেছিলেন, তিনি ইহুদি জনগোষ্ঠীর কাননে প্রবেশ করার সেই ঘটনাটির প্রতিধ্বনি করেছিলেন। বাইবেল আমাদের বলেছে যে, তাদের প্রতিশ্রুত ভূমির জন্যে মিশর থেকে সংগ্রাম করে যে-ইহুদিরা পালিয়ে এসেছিলেন তারা মোট বারোটি গোত্রে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, যারা পরিচিত ইজরায়েলের ‘টুয়েলভ ট্রাইবস’ নামে। সুতরাং যিশু তার অনুসারীদের মধ্যে থেকে বারো জনকে নির্বাচন করেছিলেন, যারা তার এই খুব ভিন্নধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করতে পারবেন। তিনি তাদের বলতেন ‘আপোস্টল’, গ্রিক যে-শব্দটির অর্থ হচ্ছে বার্তাবাহক। তাদের বার্তাটি ছিল সুসংবাদ, ঈশ্বরের ন্যায় এবং শান্তির রাজ্য খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু এই অ্যাপোস্টলরা কেউ নজরে পড়ার মতো তেমন কোনো বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন না। তাদের মধ্যে বিখ্যাত দুইজনই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছিলেন, পিটার এবং জুডাস। পিটার হৃদয়বান ছিলেন, কিন্তু দুর্বল। যিশু বন্দি হবার পরই তিনি তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, আর জুডাস রোমের পুলিশদের নিয়ে এসেছিলেন সেই বাগানে, যেখানে যিশু লুকিয়ে ছিলেন। আমরা নিশ্চিত নই, কেন তিনি এমন একটি বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করেছিলেন! বিশ্বাসঘাতকতার জন্য যাজকরা তাকে ত্রিশটি রুপার মুদ্রা দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কাজটি শুধুমাত্র টাকার জন্যে। করেছিলেন, এমন সম্ভাবনা বেশ কম। হয়তো তিনি হতাশ হয়েছিলেন, তিনি যেমন মেসাইয়া প্রত্যাশা করেছিলেন, যিশু তেমন ছিলেন না। ইজরায়েলে দরিদ্র আর নিপীড়িতদের মধ্যে তার বিস্ময়কর সংখ্যক অনুসারী ছিল, কিন্তু তারপরও তিনি রোমানদের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেননি। এই ধরনের একটি ধাক্কা কি তাকে প্ররোচিত করতে পারত প্রতিশ্রুত সেই রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে সবাইকে স্বশস্ত্র হয়ে উঠতে? সেটাই কি জুডাসের উদ্দেশ্য ছিল? আমরা জানি না। হয়তো তিনি নিজেও সেটি জানতেন না।
