প্রথমটি আমরা পাই মার্কের সুসমাচারে। তিনি আমাদের বলেন তার ব্যাপটিজম শেষ হবার পর তিনি দরিদ্র আর অসহায়দের মধ্যে তার ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। পাপের দণ্ড হিসাবে দুঃখ পাবার শাস্তির ধারণাটি তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল এবং সেইসাথে এই দুঃখভোগের বাস্তব বিষয়টিও তাকে বিচলিত করেছিল। তার মতে, এই দুর্দশার কারণ ঈশ্বর যেভাবে পৃথিবী বিন্যাস করেছেন সেটি নয়, বরং এর কারণ হচ্ছে ধর্ম আর রাজনীতির ক্ষমতাবানরা যেভাবে সবকিছুকে একটি সাংগঠনিক রূপ দিয়েছেন। তারা এই পৃথিবীকে নিয়ে যা কিছু করেছেন সেটি ঈশ্বর ঘৃণা করেন, আর সে-কারণেই তিনি যিশুকে পাঠিয়েছেন, যখন এটি পৃথিবীর ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, তার প্রতিশ্রুত রাজ্যটি কেমন দেখতে হবে, সেটি সবাইকে জানাতে। দরিদ্রদের জন্যে এটি হবে একটি সুসংবাদ। এবং ধর্মবাদী আইনপ্রণেতাদের সেই দড়ির ফাঁস থেকে এটি ঈশ্বরের সন্তানদের মুক্ত করবে, যা দিয়ে তাদের জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের সাথে তার প্রথম উন্মুক্ত সংঘর্ষ হয়েছিল সাবাথকে বিশ্রামের দিন হিসাবে চিহ্নিত করে রাখার নির্দেশটি নিয়ে। যিশু একদিন একটি গমক্ষেতের মধ্যে দিয়ে তার কিছু অনুসারীদের নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হাঁটার সময় মুখে দিয়ে চেবানোর জন্যে তারা অল্পকিছু গম তুলেছিলেন এবং সেটি দেখে ফারিসিরা তাদের উপর সাবাথের দিনে আইন অমান্য করার অভিযোগ এনেছিলেন, কারণ তারা শস্য তুলেছেন। এখানে যিশুর উত্তরটি ছিল বৈপ্লবিক। তিনি বলেছিলেন, সাবাথ মানবতার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সাবাথের জন্যে মানবতাকে সৃষ্টি করা হয়নি। সমাজের জন্যে আমাদের আইন এবং নিয়মের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেগুলো আমাদের ভৃত্য, অবশ্যই মনিব নয়। আমরা যদি সেগুলো কঠোরভাবে আরোপ করার চেষ্টা করি সেগুলো যে-মানুষগুলোকে সাহায্য করার জন্যে পরিকল্পিত, সেই মানুষগুলোর চেয়েও আইন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে। আইনের বিধানের চুলচেরা অনুসরণ বা লিগালিজমকে এর ছয়শো বছর আগেই তাওবাদীরা যেভাবে শনাক্ত করেছিলেন, সেই বাস্তব সত্যটি প্রমাণ করে, এই আইনের প্রতি অন্ধত্ব কত শক্তিশালীভাবেই সমাজের অংশ হিসাবে টিকে গেছে। এখন যিশুকে এটি আমরা চ্যালেঞ্জ করতে দেখছি। মানবতার অধীনস্থ হবে আইন, মানবতা আইনের অধীনস্থ নয়। তাই অবাক হবার কোনো কারণ নেই যে, আইন-সমর্থকরা তাকে ঘৃণা করতেন। তার বিরুদ্ধে এটি ছিল প্রথম গুরুতর অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে এটি জায়গা পেয়েছিল।
দ্বিতীয় সংঘর্ষ, ‘সার্মন অন দ্য মাউন্ট’, যার বিবরণ আছে ম্যাথিউর সুসমাচারে, এবং এটি আরো বিপজ্জনক। ক্ষমতাবানরা যে তত্ত্ব দিয়ে পৃথিবীর সবকিছু পরিচালনা করছিলেন, যিশু এখানে সেটি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তত্ত্বটি ছিল এমন, মানুষ মূলত উচ্ছঙ্খল জনতার দল, যাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। তাদের জন্যে সামান্য একটু ছাড় দিলে, তারা আরো অনেক বেশিকিছু দাবি করে সেটি কেড়ে নেবে। সুতরাং তাদের সারাক্ষণই শক্তহাতে দমন করতে হবে। চোয়ালে মুষ্ঠি আর ঘাড়ের পেছনে বুট হচ্ছে একমাত্র ভাষা, যা তারা বুঝতে পারে। কিন্তু তারপরও ম্যাথিউ আমাদের দেখান যে, একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে, যেভাবে মোজেস তার টেন কম্যান্ডমেন্ট নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যিশু যখন ঈশ্বরের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হবে তখন পরিস্থিতি কেমন হবে তার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
যদি কেউ আপনাকে এক গালে একটি থাপ্পড় মারে, আপনি অন্য গালটি এগিয়ে দেবেন যেন সেখানেও সে থাপ্পড় মারতে পারে। কেউ যদি আপনার গায়ের উপরের আবরণটি চায়, আপনি তাকে পুরো কাপড়টাই নেবার প্রস্তাব করবেন। আপনি আপনার শত্রুদের ভালোবাসবেন, ঘৃণা করবেন না। যারা আপনার সাথে খারাপ কিছু করবে, তাদের জন্য ভালো কাজ করবেন। আপনি ক্ষমা এবং ক্ষমা এবং ক্ষমা এবং ক্ষমা করবেন… অন্তহীনভাবে। স্বর্গে এমনভাবেই সব হয়, পৃথিবীতেও তেমন হওয়া উচিত। যিশুর বর্ণিত এই পুরোপুরি উল্টো। ধরনের রাজ্যটির মূল চাবিকাঠিটি আছে সেই শব্দে, যা তার ব্যাপটিজমের সময় তাকে বলা হয়েছিল, তুমি আমার প্রিয় পুত্র। ঈশ্বর কোনো শাসক নন, মনিব নন, মানব জেলখানার ওয়ার্ডেন নয়, ক্রীতদাসের মালিক নন, বরং তিনি হচ্ছেন ‘পিতা’। এবং মানবজাতি পুরোটাই একটি পরিবার। বৈপ্লবিক কথাবার্তা! সুতরাং সেই সময়ের শাসকরা তার ওপর সতর্ক নজর রেখেছিলেন। এটি তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অপরাধের অভিযোগ ছিল। এটি তার অভিযোগপত্রে জায়গা নিয়েছিল।
তৃতীয় সংঘর্ষটি বর্ণনা করা হয়েছে লুকের সুসমাচারে। যিশু কখনোই কীভাবে চিন্তা করতে হবে এই বিষয়ে কাউকে পরামর্শ দেননি। ইজরায়েলের নবীদের মতো তিনিও গল্প বলেছিলেন, যেন মানুষরা নিজেরাই তাদের হয়ে ভাবার কাজটি করতে পারেন। এক বন্ধুসুলভ শ্রোতা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইহুদিদের ধর্মীয় আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাটি পুনরাবৃত্তি করতে। যিশু উত্তরে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরকে তাদের সমস্ত হৃদয়, আত্মা আর শক্তি দিয়ে ভালোবাসতে হবে। এটাই প্রথম নির্দেশ। দ্বিতীয় নির্দেশটি হচ্ছে নিজেদের যেভাবে তারা ভালোবাসেন, প্রতিবেশীকেও সেভাবে ভালোবাসতে হবে। ‘ঠিক’, উত্তর দিয়েছিলেন সেই শ্রোতা, ‘কিন্তু আমার প্রতিবেশী কারা? গুড সামারিটানের সেই নীতিগর্ভ গল্পটি ছিল যিশুর উত্তর।
