ম্যাথিউ আমাদের বলেছিলেন গেথসেমানে বাগানে আটক হবার হবার যিশুর সাথে যা কিছু ঘটেছিল সেটি জুডাসের হৃদয় ভঙ্গ করেছিল, এবং তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তবে তার সেই কাজটির প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে যিশু রোমের সৈন্যদের হাতে বন্দি।
রোমের সৈন্যরাও খুব দক্ষ ছিল প্রতীকী আচরণে। রোমান-কর্তৃপক্ষ যখন জিসাসকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, সৈন্যরা তার মাথার উপর একটি কাঁটার মুকুট পরিয়ে দিয়েছিল এবং তার গায়ে রাজকীয় বেগুনি রঙের একটি চাদর জড়িয়ে দিয়েছিল। সবাই দেখো, ইহুদিদের রাজা’, তারা উপহাস করেছিলেন যখন তারা সেই পাহাড়ের উপর তাকে নিয়ে গিয়েছিল ক্রুশবিদ্ধ করার স্থানে। কুশের সাথে পেরেক দিয়ে বিদ্ধ করে ধীরমৃত্যু, রোমের সবচেয়ে হিংস্রতম শাস্তি ছিল। এই শাস্তিতে দণ্ডিতরা মরে যাবার আগে বেশ কয়েকদিন ধরে তীব্র যন্ত্রণায় এভাবে ঝুলে থাকতে পারতেন। ৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন স্পার্টাকাস ক্রীতদাসদের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রোমে, খুব হিংস্রভাবে দাসদের সেই বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল। এবং বিদ্রোহ দমন করা হয়ে গেলে, রোমান সেনাপতি ক্রাসাস, ছয় হাজার বিদ্রোহী দাসকে ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, এবং রোম থেকে কাপুয়া যাবার মহাসড়কের পাশে ক্রুশের উপর তাদের বহু মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যিশুর জন্যে মৃত্যু বেশ দ্রুত এসেছিল। তিনি ক্রুশের উপর মাত্র ছয়ঘণ্টা বেঁচেছিলেন, এর কারণ সম্ভবত সৈন্যরা তাকে এত হিংস্রভাবে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে ছিল, তিনি অর্ধমৃত ছিলেন যখন তারা তাকে ক্রুশের কাঠের উপর পেরেক দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিল।
ক্রুশবিদ্ধ হয়ে ঝুলে থাকার সময় তিনি কী ভাবছিলেন? ঈশ্বর তাকে যা বলেছিলেন বলে তিনি মনে করেছিলেন, তিনি কি তার সেই ভাবনায় প্রতারিত হয়েছিলেন? নাকি, তিনি তার মৃত্যুকে মেনে নিয়েছিলেন ঈশ্বরের পরিকল্পনার একটি অংশ হিসাবে? দুটি প্রস্তাবনাই করা হয়েছে। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, যিশু খুব স্থিরবিশ্বাসে পৌঁছেছিলেন, যখন তিনি কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার প্রক্রিয়ায় তীব্রতম বিপদের মুহূর্তে পৌঁছাবেন, ঈশ্বর কেবল তখনই হস্তক্ষেপ করবেন। এটি সেই তত্ত্ব থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়, যা দাবি করেছে যিশুকে কোনো একটি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতেই জুডাস চেষ্টা করেছিলেন। যিশুও কি ঈশ্বরকে এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করতে চাইছিলেন? তিনি কি ভেবেছিলেন, এমন একটি রাজ্যের দাবি করার মাধ্যমে, যে-রাজ্য এই পৃথিবীতে অভূতপূর্ব, এবং এর জন্যে মরতে প্রস্তুত হবার মাধ্যমে, ঈশ্বর স্বয়ং ইতিহাসে তার সমস্ত শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হবেন, সব শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিবেন? যদি সেটাই তিনি প্রত্যাশা করে থাকেন, এমন কিছু ঘটেনি। রোমানদের শোষণ থেকে তাদের কেউ উদ্ধার করেনি। তার সেই যন্ত্রণা লাঘব করার জন্যে কোনো পদক্ষেপ নিতে ইতিহাসে ঈশ্বর হঠাৎ করে প্রবেশ করেননি। শুধুমাত্র সেখানে কুশই ছিল এবং নিশ্চয়তা ছিল যে, তিনি এর উপরেই মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন। তিনি কী অর্জন করতে পেরেছিলেন? কিছুই না। মার্ক আমাদের বলেন, তার শেষনিশ্বাস ত্যাগ করার আগে তিনি হতাশ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ঈশ্বর, আমার ঈশ্বর, কেন তুমি আমাকে পরিত্যাগ করলে?’
অন্য গসপেল লেখকরা এই ক্রুশবিদ্ধ হবার ঘটনাটিকে খানিকটা ভিন্নরূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। তারা প্রস্তাব করেছিলেন, সবসময়ই পরিস্থিতিটি যিশুর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তার মৃত্যু শুরু থেকেই ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ ছিল। তিনি জানতেন এটাই তার সাথে ঈশ্বরের যে সমঝোতা হয়েছিল তারই একটি অংশ। এবং যখন জনের গসপেলটি লেখা হয়েছিল, এটাই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত কাহিনিতে পরিণত হয়েছিল। জনের বিবরণে যিশুর শেষ উচ্চারণটি হতাশ কোনো আর্তনাদ নয়, বরং বিজয়ের উল্লাস : ‘কাজটি সম্পন্ন হয়েছে’!
এমন কিছু অনুভূত হয়নি যে তার কোনো অনুসারীরা এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে সেটি প্রত্যাশা করতে পেরেছিলেন। অনুগত নারীদের একটি ছোটদল ছাড়া, তারা সবাই তাকে পরিত্যাগ করেছিল, যখন রোমের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে এসেছিল। কারণ তারা ভয় পেয়েছিল পরবর্তীতে এই শাস্তি হয়তো তাদেরকেও দেওয়া হবে। ভোর হবার আগে আশাহীন ঘণ্টাগুলোয় তারা দরজায় পুলিশের টোকা শোনার জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু সেটি কখনোই আসেনি। তবে যা এসেছিল সেটি তাদের বিস্মিত করেছিল। স্বয়ং যিশু এসেছিলেন, যদিও তাদের হয়তো বলার কোনো ক্ষমতাই ছিল না, ঠিক কীভাবে তারা জেনেছিলেন যিশু এসেছে। করিন্থবাসীদের প্রতি লেখা পলের চিঠিতে তিনি এই বিস্ময়টির বিবরণ দিয়েছিলেন। এবং তিনি পূর্ণ একটি তালিকা দিয়েছিলেন সেইসব মানুষদের নামসহ, যাদের সামনে যিশু আবির্ভূত হয়েছিলেন তার মৃত্যুর পর। সবশেষে, তিনি বলেছিলেন, ‘যিশু আমার সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এবং আমরা দামাস্কাস অভিমুখে সেই রাস্তায় ফিরে যাই, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল। এটি ছিল পরবর্তী বিস্ময়, যা তার অ্যাপোস্টলদের হতবাক করে দিয়েছিল।
যিশুর এই আবির্ভাবগুলো পিটার ও অন্যান্য অ্যাপোস্টলদের ক্রমশ আরো সাহসী করে তুলেছিল। যিশুর গ্রেফতারের পর তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু পরে তারা আবার একত্রিত হয়েছিলেন এবং তাদের নেতা হিসাবে পিটার আবার তার সাহসিকতার পরিচয় দিতে শুরু করেছিলেন। যদিও তারা নিশ্চিত ছিলেন না ভবিষ্যতে কী হবে, তবে তারা স্বদেশি ইহুদিদের বলতে শুরু করেছিলেন যে কী ঘটেছিল। আরো বেশি সাহসিকতার সাথে তারা তাদের সেই বিশ্বাসটির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, যিশু, যদিও তিনি এমন একটি মৃত্যুর শিকার হয়েছিলেন, বাইবেল যাকে বলে অভিশপ্ত, কিন্তু তিনি ছিলেন তাদের সেই প্রতিশ্রুত মেসাইয়া। মৃত্যুর পর তার ফিরে আসার এই ঘটনাগুলোই ছিল তার প্রমাণ।
