কারণ এটি প্রথম লেখা নয়। প্রথম বা সবচেয়ে পুরনো যে লেখার বিষয়ে আমরা নিশ্চিত, সেটি হচ্ছে একটি চিঠি, ৫৫ খ্রিস্টাব্দে, যিশুর মৃত্যুর পঁচিশ বছর পরে যে-চিঠিটি পল গ্রিক শহর করিন্থের নতুন খ্রিস্টান ধর্মান্তরিতদের উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন। এখানে যিশুর জীবনে কী ঘটেছিল সেটি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখানো হয়নি, শুধুমাত্র তার মৃত্যুর পর তার সাথে কী ঘটেছিল সেটি ছাড়া। এর বার্তাটি ছিল, মৃত্যু তাকে শেষ করে দেয়নি। এটি তাকে নিয়ে গেছে ঈশ্বররূপে তার একটি নতুন জীবনে, যেখান থেকে এই পৃথিবীতে তার ফেলে-যাওয়া সহচরদের সাথে তিনি যোগাযোগ রাখতে সক্ষম। পল বহুশত মানুষের একটি তালিকা করেছিলেন, মৃত্যুর পর যিশু যাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যার মধ্যে অবশ্যই দামাস্কাসের পথে তার নিজের অভিজ্ঞতাটিও ছিল।
সুতরাং নিউ টেস্টামেন্ট প্রথমেই যিশুখ্রিস্ট সম্বন্ধে আমাদের যা জানায়, সেটি হচ্ছে মৃত্যু তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি। তার আবির্ভাবগুলোই প্রমাণ করেছে যে, মৃত্যু তার জন্যে কোনো পরিসমাপ্তি ছিল না। এটি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত নতুন যুগের একটি সূচনা ছিল মাত্র, পৃথিবীতে নতুন একটি রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঈশ্বরের অভিযানের প্রথম পদক্ষেপ। এবং যিশুর অনুসারীদের জন্যেও তাদের মৃত্যুই চূড়ান্ত পরিণতি হবে না। যদি তারা মারা যান, তারাও তাদের মৃত্যুর পর একটি নতুন জীবন অর্জন করবেন। তাদের এমনকি নাও মরতে হতে পারে। যিশুর পুনরুত্থান প্রমাণ করেছে যে, অবশেষে ঈশ্বর দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। ঈশ্বরের ক্রটিহীন নতুন রাজ্য, যার বর্ণনা যিশু দিয়েছেন, সেটি খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবং তখন সবকিছুই বদলে যাবে। এমনকি মৃত্যুও।
৫৫ খ্রিস্টাব্দে করিন্থবাসীদের উদ্দেশ্যে লেখা পলের সেই চিঠিতে আমরা প্রথম যিশুর একটি চিত্র দেখতে পাই। এটি তার মৃত্যুপরবর্তী সময়ে কী ঘটেছে, শুধু সেই সময়টাকেই বর্ণনা করেছিল। তবে তার আগের জীবন সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের গসপেলের কাহিনিতে প্রবেশ করতে হবে, যেগুলো লেখা হয়েছিল আরো পরে। প্রথম যেটি লেখা হয়েছে সেটি লিখেছিলেন মার্ক, ৬০ খ্রিস্টাব্দের শেষে অথবা ৭০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে। ম্যাথিউ আর লুকের সুসমাচার এসেছে ৮০ আর ৯০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোনো সময়ে। আর জনের শেষ সুসমাচার লেখা হয়েছিল ১০০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে কোনো একটি সময়ে। এই সময়গুলো লক্ষ করা দরকার। আপনি সময়ের হিসাবে যতই কোনো একজন নবীর জীবনকালের সময় থেকে বেশি দূরে চলে যাবেন, ততই তার কাহিনিতে নানা বাড়তি বিষয় যুক্ত হবে, এটি আরো বেশি বানানো আর অলংকৃত হয়ে উঠতে থাকে। যিশুর সাথেও এমনই ঘটেছিল। আমি সেই বিতর্কে প্রবেশ করতে চাই না। যে, তিনি কোথায় এবং কত সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ঠিক কীভাবে মৃত্যুর পর তার পুনরুত্থানের ঘটনাটি ঘটেছিল। অথবা ঠিক কয়জন ফেরেশতা বেথলেহেমে তার জন্মের সময় আর জেরুসালেমে তার পুনরুত্থানের সময় উপস্থিত ছিলেন। আমি তার সম্বন্ধে সাধারণভাবে গৃহীত কিছু বাস্তব তথ্যের সাথেই কেবল নিজেকে যুক্ত রাখব। আর বিশ্বাস করানোর জন্য সেগুলো যথেষ্ট পরিমাণে শক্তিশালী।
মার্ক সরাসরি মহাপ্রলয়ের কোনো নাটকের একটি দৃশ্যের সামনে আমাদের হাজির করেছিলেন। একজন বন্যমানুষ, যিনি লোকাস্ট বা পঙ্গপাল আর বন্যমধু খেয়ে বাঁচতেন আর উটের পশমে নির্মিত কাপড় পরিধান করতেন, একদিন মরুভূমি থেকে বাইরে এসে তিনি ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। তাকে তারা। নাম দিয়েছিলেন জন দ্য ব্যাপটাইজার’, কারণ তিনি মানুষকে জর্ডান নদীর পানিতে নিমজ্জিত করতেন, পাপের জন্যে যারা অনুতপ্ত ও একটি নতুন সূচনা চান। তারই একটি চিহ্ন হিসাবে। তারা তাদের ফেলে-আসা জীবনটি পানিতে নিমজ্জিত করে, নতুন জীবনে ভেসে উঠতেন। জন নিজেকে মেসাইয়া হিসাবে কখনোই দাবি করেননি। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, যিনি আসল মেসাইয়া, তার প্রত্যাবর্তনের পথ প্রস্তুত করতেই তার আগমন। মার্ক তারপর আমাদের জানান, জনের হাতে ব্যাপটাইজ হতে গ্যালিলির নাজারেথ থেকে একজন ব্যক্তি জর্ডানে এসেছিলেন। ইতিহাসে এখানেই আমরা প্রথম যিশুর দেখা পাই। ততদিনে তার বয়স হয়েছিল। ত্রিশ। এরপরে যা ঘটেছিল সেটাই ছিল তার কাহিনির সত্যিকার সূচনা।
যখন জন তাকে পানির নিচে কয়েকটি দীর্ঘ সেকেন্ড নিমজ্জিত করে আবার তাকে পানির উপর টেনে তুলেছিলেন, যিশু চোখ-ধাঁধানো একটি আলো দেখতে পেয়েছিলেন এবং শুনেছিলেন ঈশ্বর তাকে তার প্রিয় ‘পুত্র’ নামে সম্বোধন করছেন। যদিও আমরা নিশ্চিত নই সেটাই সেই বিশেষ মুহূর্ত ছিল কিনা, যখন এই ইয়েসুস বা যিশু জানতে পেরেছিলেন যে, তিনি হচ্ছেন সেই প্রতিশ্রুত মেসাইয়া। তবে অবশ্যই সেই মুহূর্ত থেকে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। আবার স্মরণ করে দেখুন, নবীরা আসলে কী করে থাকেন। তারা একটি কণ্ঠ শোনেন যখন ঈশ্বর তাদের সাথে কথা বলেন এবং তারা বাকি সবাইকে তারা যা কিছু শুনেছিলেন সেটি জানান। আর অপরপক্ষের সাথে এটাই তাদের সাংঘর্ষিক একটি অবস্থানে নিয়ে আসে, যারা দাবি করেন ঈশ্বর সম্বন্ধে ইতিমধ্যে যা কিছু জানার আছে তার সবকিছুই তারা জানেন। তারা হলেন ধর্মবিশেষজ্ঞ। গ্যালিলির গ্রামের কোনো এক ছেলের কাছ থেকে তারা এ বিষয়ে শিক্ষা নেবার কথা ভাবতেই পারেন না। যিশু আর ইহুদিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিদের মধ্যে সংঘর্ষের তিনটি অবস্থান আমাদের এইসব ক্ষমতাবান গোষ্ঠীগুলো সম্বন্ধে যা কিছু জানা প্রয়োজন সবই জানাচ্ছে, যারা তাকে তার মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
