যিশুর একজন স্থানীয় অনুসারী আনানিয়াস, সল যে-ঘরে উঠেছিলেন সেখানে তার দেখাশুনা করার জন্যে এসেছিলেন। তার দৃষ্টিশক্তি আবার ফিরে এসেছিল। এবং সাথে সাথেই তিনি একটি বিপজ্জনক কাজ করেছিলেন, তিনি স্থানীয় একটি সিনাগগে যান এবং উপস্থিত প্রার্থনাকারীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করে জানান যে, যিশুই ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র, সেই মেসাইয়া, যার জন্যে তারা অপেক্ষা করছেন। তিনি তাদের জানান, এটি তিনি জানতে পেরেছেন কারণ স্বয়ং যিশু তার সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
কল্পনা করুন যিশুর অনুসারীদের ওপর এই ঘটনাটির প্রভাব কেমন ছিল। তাদের সবচেয়ে বড় একজন নির্যাতনকারী, এখন তাদেরই একজন বলে নিজেকে দাবি করছেন। এটি কি তার চালাকির কোনো কৌশল? সল কি তাদের সংগঠনে প্রবেশ করতে চাইছেন ছদ্ম-বিশ্বাসীর পরিচয়ে, যেন এর সদস্যদের চিহ্নিত করতে তার সুবিধা হয়? তারা স্পষ্টতই এই নতুন ধর্মান্তরিতকে নিয়ে বেশ অস্বস্তি অনুভব করেছিলেন।
এরপর তার করণীয় নিয়ে সল নিজেও খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না। তবে তিনি যে-সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটি তার জন্যে বৈশিষ্ট্যসূচকই ছিল। তাদের বিশ্বাস সম্বন্ধে জানতে ও সদস্য হতে চার্চের নেতাদের মুখাপেক্ষী না হয়ে বরং তিনি একাই আরবের মরুভূমির দিকে চলে গিয়েছিলেন, তার সাথে যা ঘটেছিল সেটি নিয়ে ভাবতে এবং প্রার্থনা করতে। খ্রিস্টীয় ধর্মবিশ্বাসের ওপর তার আর কোনো প্রশিক্ষণের দরকার ছিল না, তিনি ভেবেছিলেন, দামাস্কাস রোডে তার সামনে উপস্থিত হয়ে যিশু তার যা দরকার সবকিছুই তাকে দিয়েছেন। যিশুর এই পুনরুত্থান একটি বার্তা ছিল। সেটি ভালো করে বোঝার চেষ্টা করুন, গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুই আপনি বুঝতে পারবেন।
যিশু আন্দোলনের নেতাদের, বা তিনি যেভাবে বলেছিলেন, অন্য নেতাদের সাথে দেখা করতে জেরুজালেমে আসতে সলের আরো তিনবছর সময় লেগেছিল, ততদিনে তিনি পল নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ তিনিও নিজেকে যিশুর একজন সহচর হিসাবে দাবি করেছেন, অর্থাৎ তার বার্তা ছড়িয়ে দেবার জন্যে যাকে যিশু ‘প্রেরণ’ করেছেন। এবং বিষয়টি নিয়ে সবার মধ্যে দ্বন্দ্ব দ্রুত নিরসন হওয়াই ভালো।
যিশুর ঘনিষ্ঠ অন্য সহচররা ভেবেছিলেন, বিষয়টি বেশ অদ্ভুত নয় কি, এই ভুইফোঁড়, যে কিনা যিশুর সাথে কখনোই সাক্ষাৎ করেননি, এই পৃথিবীতে তার জীবন সম্বন্ধে যিনি কিছুই জানেন না, তারপরও তিনি কিনা যিশুখ্রিস্টের পুনরুত্থানের ঘোষণা প্রচার করছেন? আমরা ঈশ্বরপুত্র যিশুকে চিনতাম, যদিও তিনি আমাদের হতবুদ্ধি করেছিলেন। এভাবে কাউকেই আমরা তার মতো করে এর আগে কখনোই কথা বলতে শুনিনি। তিনি কি সেই মেসাইয়া, আমরা তাঁর কথা শুনে ভেবেছিলাম? সেটি জানতে আমরা তার অনুসারী হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা যেমন প্রত্যাশা করেছিলাম তেমন কিছু ঘটেনি।
বেশ, তাহলে এই যিশু নামের মানুষটি কে ছিলেন? আর আসলেই তার সাথে কী ঘটেছিল?
১৯. মেসাইয়া
জিসাস (ইয়েসুস) ক্রাইস্ট বা যিশুখ্রিস্ট সম্বন্ধে প্রথম জানার বিষয়টি হচ্ছে যে খ্রিস্ট বা ক্রাইস্ট তার কোনো পদবী নয়। এটি একটি খেতাব। ‘ক্রিস্টোস’ শব্দটি হচ্ছে ‘মেসাইয়া’ শব্দটির হিব্রু প্রতিশব্দের গ্রিক অনুবাদ। তিনি ছিলেন জিসাস দ্য মেসাইয়াহ বা যিশুখ্রিস্ট। তবে সবাই যেহেতু বিষয়টি নিয়ে একমত ছিলেন না, তার নামটি বেশ বিতর্কিত ছিল, আর সেই বিতর্কটি তাকে তার মৃত্যু অবধি অনুসরণ করেছিল। যখন রোমানরা তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করেছিল, তারা এই নাটকটি অব্যাহত রেখেছিলেন। তার মাথার উপর ক্রুশে একটি পরিহাস-সূচক চিহ্ন খোদাই করে দেওয়া হয়েছিল : ইহুদিদের রাজা, ইয়েসুস নাজারেনাস, রেক্স জুডাইওরাম, নাজারেথের ইয়েসুস (ইহুদিদের রাজা)। তিনি তাদের কাছে শুধুমাত্র ঠাট্টার পাত্র ছিলেন মাত্র, আরেকজন পাগল ইহুদি যে-কিনা পৃথিবী পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছেন।
একেবারে শুরু থেকে তাকে নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত ছিল : কোথা থেকে তিনি এসেছেন, তার পিতামাতা কারা ছিলেন, তিনি নিজে কী, সেটি নিয়ে কী ভাবেন, তার মৃত্যুর পর তার সাথে কী ঘটেছিল। বিতর্ক এখনো চলমান। তাকে নিয়ে বহু হাজার কোটি শব্দ রচনা করা হয়েছে। সবচেয়ে প্রাচীনতমটি আছে খ্রিস্টীয় বাইবেল বা নিউ টেস্টামেন্টে (নতুন নিয়ম), নামটি এভাবে দেওয়া হয়েছিল ইহুদি বাইবেল বা ওল্ড টেস্টামেন্ট (পুরাতন নিয়ম) থেকে এটিকে পৃথক করতে। আর এই পার্থক্যটি ইঙ্গিত দেয় কীভাবে তার প্রথম অনুসারীরা তাকে দেখেছিলেন। তাদের কাছে তিনি কোনো নতুন ধর্ম শুরু করতে আসেননি, তিনি ইহুদিদের পুরনো ধর্মটিকে পূর্ণ করতে এসেছিলেন। ঈশ্বর আব্রাহাম আর মোজেসকে আহ্বান করেছিলেন প্রথম অঙ্গীকার বা টেস্টামেন্ট বা নিয়মটি প্রতিষ্ঠা করতে। এরপর তিনি যিশুকে একটি নতুন অঙ্গীকারপত্র প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেটাকেই মেসিয়ার যুগে সম্পূর্ণতার চূড়ান্ত সীমানায় নিয়ে যাবার জন্যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
তার জীবন সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের নিউ টেস্টামেন্টের আশ্রয় নিতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যেভাবে এটি সংকলিত আর সংগঠিত করা হয়েছে সেটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এটি শুরু হয়েছিল চারটি বই দিয়ে, যাদের বলা হয় ‘গসপেল’, যে-শব্দটির অর্থ শুভসংবাদ বা সুসমাচার। আর এই গসপেলগুলোর ধারাবাহিক ক্রমবিন্যাস হচ্ছে এরকম : ম্যাথিউ বা মথি, মার্ক, লুক এবং তারপর জন অনুসারে সুসমাচার (মথি, মার্ক, লুক ও জনের লেখা নতুন নিয়মের চারটি শাস্ত্রীয় সুসমাচার)। তারপরে আরেকটি বই, যার নাম ‘দ্য অ্যাক্টস অব দ্য আপোস্টোলস’, এরপরে আছে বেশকিছু চিঠি, যেগুলোর অধিকাংশেরই লেখক ছিলেন পল, ধর্মান্তরিত যে-ব্যক্তির সাথে আগের অধ্যায়ে আমাদের দেখা হয়েছিল। বেশ, তাহলে কেন আমি আগের অধ্যায়টি ম্যাথিউ’র লেখা দিয়ে শুরু করিনি, খ্রিস্টীয় বাইবেলে যা হচ্ছে প্রথম লিখিত অংশ?
