এক পাসওভারের সময় এমনই একজন মেসাইয়া দাবিকৃত ব্যক্তি যিশুকে, ‘ধর্মদ্রোহী’ হিসাবে দণ্ডিত করা ইহুদি মন্দিরের প্রধান পুরোহিত আর ‘অনাকাঙিক্ষত সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা গ্যালিলির শাসক হেরড অ্যান্টিপাসের সমর্থনে রোম কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু সেই সমস্যাটি যিশুখ্রিস্ট বা মেসাইয়া যিশু নামে পরিচিত এই ব্যক্তিটিকে ক্রুশবিদ্ধ করার পরে শেষ হয়ে যায়নি। আর সেই সময়ে এই কাহিনিতে প্রবেশ করেছিলেন সল।
যিশুর অনুসারীরা তার মৃত্যুর পর তাদের মেসাইয়াকে নিয়ে কথা বলা বন্ধ করেননি। বরং তারা আরো সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। তারা বলেছিলেন তাদের কাছে প্রমাণ আছে যে, ঈশ্বরই এই মেসাইয়াকে পাঠিয়েছিলেন চূড়ান্ত ইতিহাস পরিসমাপ্তি হবার সেই দিনটির জন্যে ইজরায়েলকে প্রস্তুত করতে। তার মৃত্যুর পর, তিনি তাদের কাছে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন এলাকায় ‘আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং তিনি তাদের একতাবদ্ধ থাকতে এবং তার শেষ চূড়ান্ত আগমনের জন্যে অপেক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এটি সেই মন্দিরের ইহুদি যাজকদের ভীষণ ক্ষুব্ধ করেছিল, তারা ভেবেছিলেন যিশুকে হত্যা করার মাধ্যমে এই বিপজ্জনক সমস্যাটিকে চিরকালের জন্যে তারা উৎপাটন করতে পেরেছেন। সুতরাং মন্দির পুলিশের একটি বিশেষ শাখার নেতৃত্ব দেবার জন্য তারা সল দ্য ফারিসিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তিনি আরো বড় কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করার আগেই এই তথাকথিত খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের আটক করতে খুঁজে বের করেন। এমন কাজের জন্যে সল মরিয়া হয়ে অপেক্ষায় ছিলেন, এবং তিনি অতি উৎসাহের সাথে খ্রিস্টান-নিপীড়নে নেমে পড়েছিলেন।
এই সময়ে তার একটি বর্ণনা আমাদের কাছে আছে। তিনি আকারে ছোটখাটো ছিলেন, তার মাথায় টাক ছিল, পা দুটি খানিকটা ধনুকের মতো বাঁকা ছিল। তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, শারীরিকভাবে তিনি অনাকর্ষণীয় ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে বিশেষ কিছু একটা ছিল। আর তার চোখে সেটি দেখা যেত। তীব্র আবেগময় কোনো অনুসন্ধানীর গভীরতা ছিল তার চাহনিতে। অস্থির প্রাণশক্তিতে তিনি বলীয়ান ছিলেন। এবং তিনি বিতর্ক করতে পারতেন। এই সেই মানুষ যিনি এখন খ্রিস্টান-শিকারির ব্যাজ পরে আছেন। কিন্তু স্মরণ করুন, তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল ফারিসি। যখন কিনা রক্ষণশীল সাডুসিরা বিশ্বাস করতেন না। যে, মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে কারো ফিরে আসা সম্ভব হতে পারে, সুতরাং খ্রিস্টানদের এই দাবি উদ্ভট অবাস্তব বলে তারা আগেই প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল খুব স্পষ্ট : কোনো মানুষই মৃত্যুর পর আবার প্রাণ ফিরে পেয়ে উঠে দাঁড়াতে পারে না, আর খ্রিস্টানদের এই মেসাইয়া যিশুও মানুষ ছিলেন, যিশুও মৃত্যুর পর জীবিত ফিরে আসেননি।
তবে ফারিসিরা এভাবে বিষয়টি নিয়ে যুক্তি দেবেন না। তারা বিশ্বাস করতেন সত্যিই একদিন ঈশ্বর শেষবিচারের জন্যে মৃতদের জাগিয়ে তুলবেন। তারা শুধু বিশ্বাস করতে পারেননি যে, তিনি ইতিমধ্যে যিশু-নামক এই ব্যক্তিকে মৃত্যু থেকে
জাগিয়ে তুলেছেন। এবং সলও এমন কিছু বিশ্বাস করতেন না। আর সে-কারণেই। তিনি সেইসব ধর্মদ্রোহীদের পেছনে তাড়া করে খুঁজেছিলেন, যারা এমন কিছু বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার মনে কি বিষয়টি নিয়ে খানিকটা সংশয় ছিল? আর সে-কারণেই তিনি এত প্রবলভাবে খ্রিস্টান-বিরোধী ছিলেন? সারা দেশ ঘুরে খ্রিস্টানদের তাড়া করে বেড়ানোর অর্থ কি তাহলে তার নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোরই একটি প্রচেষ্টা ছিল?
এবং আসলেই তিনি দৌড়েছিলেন। তিনি খবর পেয়েছিলেন জেরুজালেম থেকে একশো মাইল উত্তরে দামাস্কাস শহরে যিশুর অনুসারীরা ইতিমধ্যেই অবস্থান করছেন। এরপর তারা কোথায় গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবেন? দামাস্কাসে এদেরকে খুঁজে বের করতে প্রধান-যাজকের কাছে তিনি অনুমতি নিয়েছিলেন। যখন তিনি দামাস্কাসের পথে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ করে খুব উজ্জ্বল একটি আলো তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল, তিনি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলেন। তারপর তিনি একটি কণ্ঠ শুনতে পান, যে-কণ্ঠটি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন তুমি আমাকে নির্যাতন করছ?’ আতঙ্কিত পল এর উত্তরে আর্তনাদ করে বলেছিলেন, কে তুমি’? আমি যিশু, যাকে তুমি নির্যাতন করছ’, কণ্ঠটি তাকে বলেছিল। তারপর সেই কণ্ঠটি তাকে উঠে দাঁড়াতে বলেছিল, এবং তাকে দামাস্কাসে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছিল, পরবর্তীতে তাকে কী করতে হবে সেটি যথাসময়েই জানানো হবে। যখন সল দাঁড়াতে পেরেছিলেন তখন তিনি তার চোখ দিয়ে কিছুই দেখতে পারছিলেন না। তার এই অন্ধত্বকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মিথ্যা বলে এখনই বাতিল করে দেবেন না, স্মরণ করুন মানুষের মন কী করতে পারে। একটি কথা আছে, তাদের মতো এত অন্ধ আর কেউ নেই, যারা ইচ্ছা করেই কিছু দেখেন না। সলের এই অন্ধত্ব ছিল, এখন যে-বিষয়টি সত্য বলেই তিনি জানেন, সেটিকে দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করারই একটি উপসর্গ। তার সহকারীদের সহায়তায় তিনি দামাস্কাসে পৌঁছান, এবং সেখানে তার থাকার জন্যে একটি ঘর ভাড়া করে দেওয়া হয়েছিল। অন্ধ আর সংশয়গ্রস্ত, সেখানে তিনি তিনদিন ছিলেন, যখন তিনি কিছু খেতে বা পান করতেও পারেননি, এরপরে কী হবে তার জন্যই শুধু অপেক্ষা করছিলেন।
