নিজেদেরকে যতই ঐক্যবদ্ধ দাবি করুক না কেন, সব ধর্মই হচ্ছে বিভিন্ন দল-উপদলের একটি জোট, যারা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে তাদের বিশ্বাসের প্রতি অনুগত। কখনো খুবই ভিন্ন উপায়ে। সলের সময় জুডাইজম বা ইহুদিবাদও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ধর্মের সবচেয়ে সাধারণ বিভাজনটি মূলত রক্ষণশীল আর প্রগতিশীলদের মধ্যে থাকে। তারা যেহেতু জানেন, তাদের ধর্মটি এসেছে সেই নবীদের কাছ থেকে, যারা ঈশ্বরের কণ্ঠ শুনেছেন, এবং তারপর যিনি তার নির্দেশনাগুলো মানুষকে জানিয়েছিলেন, রক্ষণশীলরা তাদের বিশ্বাসকে মূল ঐশী প্রত্যাদেশের প্রথম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে রাখেন। কিন্তু প্রগতিশীলরা পরবর্তীতে আসা নতুন ব্যাখ্যা, পরিবর্তন আর ধারণাগুলো গ্রহণ করতে চান। প্রথম শতাব্দীতে জুডাইজমে এইসব পরস্পরবিরোধী প্রবণতাগুলো প্রতিনিধিত্ব করতেন সাডুসি বা রক্ষণশীলরা আর ফারিসি বা প্রগতিশীলরা, সে-দলেরই একজন সদস্য ছিলেন সল।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি মূলত ছিল মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের ওপর বিশ্বাস সংক্রান্ত ধারণায়, যে-বিষয়টি ইহুদিবাদের সূচনাপর্বে আলোচনায় আসেনি। আব্রাহামের আবিষ্কার ছিল, শুধুমাত্র একজনই ঈশ্বর আছেন। মোজেসের আবিষ্কার ছিল ঈশ্বরের সেই নির্বাচন আর চুক্তি : ইহুদিরা তার বিশেষভাবে চিহ্নিত জনগোষ্ঠী এবং তার প্রদত্ত আইনগুলোর সংরক্ষক। এটাই ছিল ইহুদিবাদের মূল সার, যার প্রতি সাডুসি বা রক্ষণশীলরা কঠোরভাবে অনুগত ছিলেন। তারা সেই ধারণাগুলোকে অবিশ্বাস করতেন, ব্যাবিলনের নির্বাসিত থাকার সময় যে-ধারণাগুলো তারা আত্তীকৃত করেছিলেন বলে মনে করা হয়, যেমন, মৃতদের পুনর্জন্ম এবং শেষবিচারের দিনে তাদের মধ্যে শাস্তি অথবা পুরস্কার বিতরণ। ব্যাবিলন থেকে আরেকটি আমদানি রক্ষণশীলরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, সেটি হচ্ছে ফেরেশতাদের অস্তিত্বের ওপর তাদের বিশ্বাস। দাবি করা হয়, ফেরেশতারা ঈশ্বর আর মানবজাতির মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন। পৃথিবীতে তাদের সন্তানদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যে অশরীরী বুদ্ধিমত্তা অথবা অশরীরী মন হিসাবে বর্ণিত ফেরেশতাদের ঈশ্বর ব্যবহার করেন। সাভুসি বা রক্ষণশীলরা ছিল আরেকটি অপ্রয়োজনীয় আমদানি। তার খবর পৌঁছে দেবার জন্যে ঈশ্বরের কোনো বার্তাবাহকের দরকার নেই। তিনি ইতিমধ্যে সর্বত্র বিরাজমান এবং তাদের নিশ্বাসের চেয়েও যিনি আরো বেশি তাদের নিকটবর্তী।
তবে ফারিসিরা বিষয়টি এভাবে দেখেননি। তারা প্রগতিশীল ছিলেন, ঈশ্বর তার অস্তিত্বের রহস্যময়তা আর তার পৃথিবী-সংক্রান্ত উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে তার সন্তানদের শিক্ষা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন এমন প্রস্তাবনাটি তারা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কেন? তারা প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, কেন তাদের বিশ্বাস করা উচিত হবে, ঈশ্বর তার নির্বাচিত মানুষগুলোকে যা জানাবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, শতবছর আগেই তিনি সেইসব জ্ঞান বিতরণ করার কাজটি শেষ করে ফেলেছেন? তাহলে তিনি কি একজন জীবন্ত ঈশ্বর নন, যিনি এখনও নতুন নবীকে আহ্বান করতে সক্ষম, যাকে তিনি তার মানুষদের জানাতেন নতুন সত্য শিক্ষা দিতে পারেন?নবী ডানিয়েল কি তাদের বলেননি যে, ঈশ্বর ইজরায়েলের সুরক্ষার দায়িত্ব দিয়েছেন ফেরেশতা মাইকেলকে এবং তাদের জন্য অভূতপূর্ব। একটি খারাপ সময়ের পর, তারা মুক্তি পাবেন, এবং মৃতরা তাদের কবর থেকে জেগে উঠবে, কেউ অনন্ত জীবনে আর কেউ অনন্ত লজ্জায়? এবং রোমানদের শাসনের অধীনে যে দুর্দশার অভিজ্ঞতা তাদের হচ্ছে, সেটাই কি ডানিয়েলের বর্ণনার সাথে মিলে যাচ্ছে না? তারা কি সবাই ডানিয়েলের প্রতিশ্রুত চূড়ান্ত সমাপ্তি আর পৃথিবীতে এইসব ঘটনাগুলো ঘটাতে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী একজন ‘মেসাইয়া’র আগমনের জন্য অপেক্ষা করছেন না?
ইজরায়েলে তখন সময়টি ছিল ধর্মীয় আর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। জেরুজালেম বহু গোষ্ঠীর মানুষ দিয়ে অতিমাত্রায় জনবহুল হয়েছিল, যারা সেই মানুষটিকে খুঁজছিলেন, যিনি সেই মেসাইয়ার যুগটি তাদের পরিত্রাণের উদ্দেশ্য নিয়ে আসবেন। কিন্তু সবার প্রতিশ্রুত মেসাইয়া হিসাবে দাবি করা এমন কারোর জন্য সেখানে একটি ত্রিমুখী বিপদ অপেক্ষা করেছিল। তখন ইসরায়েল শাসন করছিল রোমসাম্রাজ্যের খুবই অধৈর্য একগুচ্ছ কর্মকর্তা, যারা বিদ্রোহের সামান্যতম সম্ভাবনা খুব নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে প্রস্তুত ছিলেন। অন্তত তাদের কাছে এই মেসাইয়া হচ্ছে রোমশাসনের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহীর পোশাকি নাম। এবং তারা জানতেন কীভাবে বিদ্রোহীদের দমন করতে হয়।
আর যে যাজক-পুরোহিতরা মূল মন্দিরটি পরিচালনা করতেন, তারাও এই প্রতিশ্রুত মেসাইয়া দাবি করা এমন কারোর জন্যে ভীতিকর আরেকটি প্রতিপক্ষ ছিলেন। রোমানদের কাছে তিনি হয়তো রাজনৈতিক বিদ্রোহী হতে পারেন, কিন্তু ইহুদি পুরোহিতদের কাছে তারা ছিলেন ঈশ্বরবিরোধী একজন ধর্মদ্রোহী, যিনি ঈশ্বরের ইচ্ছা কী সেই বিষয়ে তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। এবং তারা জানতেন কীভাবে ধর্মদ্রোহীদের শায়েস্তা করতে হয়।
হেরড রাজপরিবারের সদস্যরা, রোম-কর্তৃপক্ষ ইজরায়েলকে চারটি এলাকায় বিভাজিত করে সেগুলো দেখাশুনা করার জন্যে যাদের দায়িত্ব দিয়েছিল, তারাও এই নিজেকে প্রতিশ্রুত দেবতা হিসাবে দাবি করা এমন মেসাইয়ার জন্য সমানভাবে বিপজ্জনক আরেকটি প্রতিপক্ষ ছিলেন। তাদের ক্ষমতার সামান্য অবশিষ্টাংশ আঁকড়ে বেঁচে থাকা এইসব ছোটখাটো রাজপরিবারের সদস্যদের নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্যে এমন কোনো মেসাইয়া অবশ্যই একটি হুমকি ছিল। এবং তাদের জীবনযাত্রার প্রতি হুমকি হতে পারে এমন কাউকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায় তারা সেটি জানতেন।
