একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যে-ধর্মগুলো ব্যক্তিগত স্তরে এর অনুসারীদের সহায়তা করে, সেই ধর্মগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি এবং বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। কারণ, পৃথিবী পূর্ণ এমন বহু মানুষ দিয়ে, যারা পরিত্রাণ খুঁজছেন। আর রহস্যময় এই ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো দেখিয়েছে মানবসমাজে এই প্রবণতা কাজ করছে। বহু ব্যক্তিই সেখানে স্বেচ্ছায় যোগ দেন। আর এটি ‘গোষ্ঠীগত পরিচয় হিসাবে ধর্মধারণাটিতে একটি পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল এবং ব্যক্তিগত ধর্মান্তরিতকরণের ধারণাটি এটিকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। আর তাদের অনুসারীদের পরিত্রাণ পাবার আবেগীয় অভিজ্ঞতা দিতে যে-উপায়গুলো এই গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করত, তা বিশেষ একটি ছক সরবরাহ করেছিল, তখনও জন্ম হয়নি এমন বহু ধর্মই, যা পরবর্তীতে অনুকরণ করেছিল। একটি দেবতার ধারণা, যিনি কিনা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তারপর আবার বেঁচে উঠেছেন, সেটি মানবপ্রকৃতির কোথাও-না কোথাও আবেদন রাখে, বিশেষ করে যদি এটি তাদের নিজেদের সমাধি থেকে বের হয়ে আসার একটি উপায় প্রস্তাব করে।
এইসব নতুন ধারণা আর প্রবণতাগুলো ধর্মের ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে শীর্ষ অভিব্যক্তিটিকে স্পর্শ করতে আরো কয়েক শতাব্দী সময় লেগেছিল। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল আর প্রাধান্যবিস্তারকারী ধর্মটির আবির্ভাবের জন্য দৃশ্যপটটি ততদিনে প্রস্তুত হয়েছিল। যখন খ্রিস্টধর্ম এর সবচেয়ে সফলতম পর্বে ছিল, এটি নিজেকে চিহ্নিত করেছিল ক্যাথলিক’ নামে। ‘ক্যাথলিক’ শব্দটি এসেছে গ্রিকভাষা থেকে, এর মানে বিশ্বজনীন’। এবং এর ভিত্তিমূলক বিশ্বাস ছিল একজন ঈশ্বরের মৃত্যু আর আবার তার পুনর্জাগরিত হওয়া। পরের কিছু অধ্যায়ে আমরা সেই বিষয়গুলো অনুসন্ধান করব, কীভাবে এই ধর্মটি, যা খুব ক্ষুদ্র একটি ইহুদি উপগোষ্ঠী হিসাবে এর যাত্রা শুরু করেছিল, সেটি আসলেই পৃথিবীর প্রথম সত্যিকারের বিশ্বজনীন ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল– ক্যাথলিক চার্চ-আর কীভাবে এটি এর নিজের জন্যে এই খেতাবটি অর্জন করেছিল।
১৮. ধর্মান্তরিত
ধর্মান্তরিত ব্যক্তি ধর্মের নাটকে আরো একটি নিয়মিত বৈশিষ্ট্যসূচক চরিত্র। ‘কনভারসন’ (ধর্মান্তরিতকরণ) শব্দটির মানে উলটো ঘুরে যাওয়া এবং বিপরীত দিকে তাকানো। অধিকাংশ মানুষই জীবদ্দশায় তাদের মতামত পরিবর্তন করেন, কিন্তু সাধারণত সেটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, ক্রমশ সময়ের সাথে একটি ধারণা থেকে সরে আসা। কিন্তু ধর্মীয় রূপান্তর কদাচিৎ এমন হয়ে থাকে। ধর্মান্তরিত ব্যক্তি চোখের পলকেই রূপান্তরিত হতে পারেন। খুব দ্রুত তারা সম্পূর্ণভাবে বদলে যেতে পারেন। এটি এতই আকস্মিক একটি ব্যাপার যে, তারা বলেন এটি অনেকটাই আবার নতুন করে জন্ম নেওয়ার মতো একটি ব্যাপার।
এই জন্ম নেওয়ার সাদৃশ্য উদাহরণটি যথাযথ, কারণ এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রসব যতই দ্রুত হোক না কেন, একটি শিশুর ভূমিষ্ঠ হবার উপযোগী হতে সময় লাগে। একই সাথে ধর্মান্তরিত হবার সেই মুহূর্তটি আকস্মিক মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে প্রায়শই এটি দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি, যা আসলেই বহুবছর ধরেই চলমান ছিল। ধর্মান্তরিতের আত্মা বিভাজিত, তারা এমন কিছুর বিরুদ্ধে সগ্রাম করছেন, যার প্রতি তাদের অনুভূত সেই আকর্ষণটি তারা স্বীকার করতে পারেন না। যদি তারা পরাজয় মেনে নেন, এটি তাদের জীবনকে এমন একদিকে নিয়ে যাবে, যা তারা চান না। সুতরাং তারা যুদ্ধ করেন, সেই জিনিসটির বিরুদ্ধে, যে-জিনিসটির কাছে তারা আত্মসমর্পণ করতে কামনা করছেন।
খ্রিস্টধর্মে বহু ধর্মান্তরিতদের মধ্যে যাদের জীবন সম্পূর্ণভাবেই বদলে গিয়েছিল তাদের সাথে যা ঘটেছিল সেই কারণে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন সল নামের একজন ইহুদি ব্যক্তি। সল পরবর্তীতে একজন খ্রিস্টান হয়েছিলেন এবং পল নামে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার ধর্মান্তরিতকরণের ঘটনাটি এতই বিখ্যাত যে, ঘটনাটি যেখানে ঘটেছিল সেটি, আকস্মিকভাবে মন পরিবর্তন করা বোঝাতে একটি শব্দ-সংকেত হিসাবে আমাদের ভাষায় প্রবেশ করেছে। আমরা যখন জীবনের এমন কোনো মুহূর্তের বর্ণনা দিতে চাই, যখন এটি সম্পূর্ণ বিপরীতে এর দিক পরিবর্তন করেছিল, তখন একটি ‘দামাস্কাস রোড’ অভিজ্ঞতার কথা বলি, কারণ দামাস্কাসগামী রাস্তার উপরেই সল অবশেষে খ্রিস্টধর্মের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন, যে-বিশ্বাসটির অনুসারীদের তিনি নিজেই বহুবছর ধরে নিপীড়ন করে আসছিলেন।
আমরা সঠিকভাবে জানি না সল কখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ধারণা করা হয় এটি খ্রিস্টযুগ শুরু হবার দ্বিতীয় বছরের শুরুর কোনো একটি সময় ছিল। তার মৃত্যুর সঠিক তারিখ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের একটি ধারা বলছে ৬২ আর ৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো একটি সময়, তিনি রোমে তার ধর্মবিশ্বাসের জন্যে শহীদ হয়েছিলেন। আমরা জানি তিনি বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে অবস্থিত তৎকালীন রোমান প্রদেশ সাইলিসিয়ার একটি শহর টারসাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের বলা হয়েছিল, তিনি ছিলেন ইহুদি এবং তার পিতার কাছ থেকেই তিনি রোমের নাগরিকত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। সম্ভবত তার রোমান নাম ছিল পল। পেশায় তিনি তাঁবু-নির্মাতা ছিলেন, তবে তিনি শিক্ষিত ছিলেন এবং খুব ভালো গ্রিক পড়তে আর লিখতে পারতেন। তিনি যে চার্চগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই চার্চগুলোর উদ্দেশ্যে লেখা তার চিঠিগুলো সবচেয়ে প্রাচীনতম খ্রিস্টীয় ডকুমেন্ট, যা আমাদের কাছে আছে। সম্ভবত জেরুজালেম শহরের একজন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক গামালিয়েলের তত্ত্বাবধানে তিনি তার শিক্ষার একটি অংশ পেয়েছিলেন। এবং তিনি বলেছিলেন তার এই শিক্ষক ছিলেন একজন ‘ফারিসি’।
