সুতরাং কোনো সৃষ্টিপুরাণ সত্য বা মিথ্যা কিনা, সেই প্রশ্নটি করা উচিত নয়, বরং যে-প্রশ্নটি করতে হবে, সেটি হচ্ছে এটি আসলে কী বোঝাতে চাইছে, এটি আমাদের কী বলতে চাইছে, এই বিভাজনটি বহু ধর্মীয় মানুষই পুরোপুরি কখনোই বুঝে উঠতে পারেন না। এবং আমরা পরে দেখব, তাদের কেউ কেউ নিজেদেরকে নির্বোধ হিসাবে উপস্থাপন করেন, যখন তারা বাইবেলে বর্ণিত সৃষ্টিকাহিনি শিল্পকলার কাজ নয়, বরং বিজ্ঞানের একটি কাজ হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।
যেসব সৃষ্টিকাহিনির কথা উপরে আলোচনা করেছি তার কোনোটাই বাস্তবতার অর্থে সত্য নয়, কিন্তু এগুলো প্রত্যেকটি কোনো-না-কোনো একধরনের অর্থ ধারণ করে। বাইবেলের গল্পটি বোঝা অপেক্ষাকৃত সহজ, এমনকি যদি আপনি তার সাথে একমত নাও হতে পারেন : এই মহাবিশ্ব নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, এটি সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর। এবং মেসোপটেমিয়া আর স্ক্যান্ডিনিভিয়ার কাহিনির সেই সহিংস সংঘর্ষ পৃথিবীর নিরন্তর সহিংসতা আর নিষ্ঠুরতারই প্রতিনিধিত্ব করে।
এই গল্পগুলো এসেছে মানুষের মন থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই গল্পগুলো কি ঈশ্বর নিজেই মানুষের মনে স্থাপন করেছিলেন, নাকি মানুষই এটি পুরোপুরিভাবে সৃষ্টি করেছে। যেভাবেই আপনি এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার চেষ্টা করুন না কেন, এই কাহিনিগুলো কাহিনি হিসাবেও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এবং সেখানে কিছু অংশ থাকে যেগুলো প্রাচীন কোনো সময়ের ঘটনার স্মৃতি হিসাবে বহন করে আনা হয়েছে : একটি বিস্ফোরণ, যা সব পরিবর্তনের সূচনা করেছিল, একটি সমুদ্র যা সব প্রাণীর জন্ম দিয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের সৃষ্টিকাহিনি বলছে, মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে প্রায় চোদ্দ বিলিয়ন বছর আগে ঘটা একটি ‘বিগ ব্যাং’ থেকে। এবং আমাদের গ্রহে কীভাবে জীবনের সূচনা হয়েছিল সেই বিষয়ে এর সেরা অনুমানটি হচ্ছে, এটির সূচনা হয়েছিল সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে কোনো একটি সময়ে। তরুণ পৃথিবীকে আবৃত করে থাকা সমুদ্রগুলো ছিল নানা রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ, যা সৃষ্টি হয়েছিল আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের সময়, এবং এই রাসায়নিক দ্রব্যগুলো ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ায় প্রথম প্রাণের আবির্ভাব হয়েছিল। কয়েক বিলিয়ন বছর পর আমরা ধীরে ধীরে এই দৃশ্যে প্রবেশ করেছি। পৃথিবীর নিজের ইতিহাসের স্মৃতি ঐসব শিল্পীদের মনের মধ্যে চুঁইয়ে প্রবেশ করেছিল, যারা সময়ের মধ্যে দিয়ে সেই অতীতের দিকে তাকিয়েছিলেন সবকিছুর অর্থ খুঁজতে? আমার কাছে বিষয়টি অসম্ভব মনে হয় না। এর কারণ হতে পারে পুরো মহাবিশ্বই খুব অদ্ভুত এবং প্রায় যে-কোনোকিছুই এখানে কল্পনা করা সম্ভব।
নিপ্পন দেশের মানুষদের এই সৃষ্টিপুরাণের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী বিষয়টি হচ্ছে যখন দেবতারা সাগরের নিচে তাদের বর্শার ফলা দিয়ে কাদা ঘেঁটেছিলেন, তারা একটি পৃথিবী তৈরি করেননি, তারা শুধু জাপান সৃষ্টি করেছিলেনঅথবা তারা একটি জগৎ বানিয়েছিলেন, যেখানে জাপান ছাড়া কিছু ছিল না। আর এভাবেই তাদের সুন্দর দ্বীপপুঞ্জের প্রতি যে-ভালোবাসাটি তারা অনুভব করেন সেটি ব্যাখ্যা। করেছিলেন। দ্বীপ জাতিগুলো নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকার বিষয়টি এড়াতে পারে না। তাদের এমন কোনো স্থলসীমানা ছিল না যার মধ্যদিয়ে মানুষের আনাগোনা হতে পারে, সুতরাং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দেবতাদের দ্বারা তাদের ধর্মীয় তাড়নাগুলো কদাচিৎ প্রভাবিত হবার সুযোগ পেয়েছে। আদি জাপানি ধর্ম সম্বন্ধে আমরা যতটুকু জানি, সেটি এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এবং আমরা যদি স্মরণ করি, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ছাড়া আর কখনোই জাপান কারো পরাধীন হয়নি, তাহলে আমাদের বিস্মিত হবার কোনো কারণ নেই এমন কিছু। যদি আবিষ্কার করি : তাদের দ্বীপ জাতিকে জাপানিরা যে তীব্রভাবে ভালোবাসে শুধুমাত্র সেটাই নয়, তারা বিশ্বাস করতেন এটি অদ্বিতীয়। আর খুব দূর-অতীতে সম্ভবত তারা ভেবেছিলেন, জাপানের বাইরে আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
দেবতারা জাপান শুধু সৃষ্টিই করেননি, এটি তাদের নির্বাচিত বাসভূমিও ছিল। অন্য ধর্মগুলো বিশ্বাস করে, দেবতারা ইচ্ছা হলেই পৃথিবীতে আসতে পারেন, কিন্তু তাদের মূল বাসস্থান, আকাশের বহু উপরে একটি বিশেষ এলাকা, যাকে স্বর্গ বলা হয়। আর জাপানিদের কাছে তাদের সুন্দর দ্বীপপুঞ্জটি ছিল সেই বিশেষ এলাকা, তাদের কাছে স্বর্গ আর পৃথিবী ছিল একই জায়গা। স্বর্গ পৃথিবীর মধ্যে আর পৃথিবী স্বর্গের মধ্যে। কিছু ধর্ম যেভাবে মানুষের শরীরকে অমর আত্মার শারীরিক বাসস্থান। হিসাবে দেখে থাকে, ঠিক সেভাবেই জাপানিরা তাদের দেশ সম্বন্ধে ভাবতেন। জাপানের দ্বীপপুঞ্জটি ছিল কামি’ নামের পবিত্র আত্মাদের বাস্তব অভিব্যক্তি, যারা প্রকৃতিতে সর্বত্র বিরাজমান। প্রাণীদের মধ্যে তাদের বসবাস, জাপানের পর্বতমালাতেও তারা অবস্থান করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর পবিত্রটি হচ্ছে মাউন্ট ফুজি। এই কামি আত্মাদের দেখা মেলে গাছ আর নদীতেও।
আমি বলেছিলাম যে, এটাই ছিল তাদের ধর্ম, কিন্তু সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। এটি পৃথক একটি ধারণা প্রস্তাব করেছিল, একটি বিশ্বাস যা তারা তাদের চিন্তায় ধারণ করে। আপনি নিজস্ব সত্তা-সংক্রান্ত বোধ, আপনি কে সেটি নয় বরং নিজের সম্বন্ধে আপনি চিন্তায় যা ধারণ করেন অথবা যা বিশ্বাস করেন, সেটিকে ধর্ম হিসাবে বর্ণনা করলে ঠিক যেমন ভুল হবে। জাপানিরা অনুভব করেছিল যে, তারা একটি মহান সত্তার জালে আবৃত হয়ে আছেন, যার গঠনগত উপাদান হচ্ছে তাদের দেশটির ভূখণ্ড, তারা নিজেরা এবং সেই আত্মারা, যা সবকিছুই জীবন্ত করে তোলে। এটি এমন কিছু না যে তারা বিশ্বাস করতেন। এটি শুধুমাত্র তারা যেমন ছিলেন।
