জীবনের প্রতি এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কারিগরি নাম হচ্ছে ‘অ্যানিমিজম’ বা। সর্বপ্রাণবাদ। এটি ‘গাইয়া’ নামের একটি আধুনিক তত্ত্ব থেকে খুব একটা দূরে নয়, যা এই গ্রহটিকে ধ্বংস আর স্বার্থপর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট বস্তু হিসাবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সত্তা হিসাবে দেখে, যাকে পরিবারের সদস্য আর বন্ধুদের মতোই যত্ন। করতে হবে একই ভালোবাসা দিয়ে। এর মানে প্রকৃতি এর নিজস্ব প্রাণশক্তিতে জীবন্ত এবং মানুষের মতোই এটি গুরুত্বপূর্ণ। জাপানিরা এটি তাদের হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসাবে কিন্তু তাদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়নি, প্রকৃতিকে তাদের অবশ্যই ভালোবাসতে হবে। তাদের এমন কিছু বলা হয়নি যে, পৃথিবী এরকম, সেটি তাদের বিশ্বাস করতেই হবে। পৃথিবীর এই প্রকৃতি আবিষ্কার করা উপলক্ষ্যে তারা কোনো একটি দিন বিশেষভাবে উদ্যাপনও করেন না। এই বিষয়ে তাদের কোনো বিশ্বাস নেই। শুধুমাত্র দেশটির সেই প্রবিত্র আত্মা বা কামি’র জন্য ভালোবাসা, যে-ভালোবাসাটি তারা সুন্দর জায়গাগুলোয় বিশেষ মন্দির নির্মাণ করে প্রকাশ করেছিলেন। প্রতিটি মন্দিরের ছিল বৈশিষ্ট্যসূচক একটি প্রবেশপথ, যা নির্মিত হয়েছিল দুটি উল্লম্ব আর দুটি আড়াআড়িভাবে সংযোগকারী খুঁটি দিয়ে। আজও জাপানে এধরনের মন্দিরের সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি। এবং সেগুলো এখনো সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
৬০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো একটি সময় চীনের অধিবাসীরা জাপানে–আসার আগ পর্যন্ত, পৃথিবীর প্রতি তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিটির এমনকি কোনো নামই ছিল না। চীনারা দেশ-দখল বা ধর্মপ্রচার করার মতো কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে জাপানে আসেননি, তবে তারা কনফুসিয়াসের মতাদর্শ, তাওবাদ এবং বৌদ্ধবাদ সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। আর এই ধর্মগুলোর প্রতিটি পরবর্তীতে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হয়তো এর কারণ ছিল যে-বিশ্বাস আর আচারগুলোর সংস্পর্শে চীনারা আসতেন, তারা সেগুলোকে শ্রেণিবিন্যস্ত করতে ভালোবাসতেন। অথবা, দেশে যে নতুন ধর্মগুলো তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেগুলো থেকে এটি পৃথক করতে হয়তো জাপানিরা ভেবেছিলেন এই পবিত্র আত্মপূর্ণ দেশটির প্রতি যে ভালোবাসা তারা অনুভব করেন, সেটি সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে এমন একটি নাম তাদের প্রয়োজন। সুতরাং তারা এটির নাম দিয়েছিলেন ‘শিন্টো’, ‘শিন’ মানে দেবতারা, ঘেটা এসেছে তাওবাদের শব্দ, পথ বা উপায় থেকে। শিনের টাও। দেবতাদের পথ, শিন্টো। ভালোবাসা’ শব্দটিও এটি ভালোভাবে প্রকাশ করার জন্যে যথেষ্ট ছিল।
শিন্টো ধারণাটি দ্বারা মুগ্ধ হতে, যে দেবতারা আদিম কাদা ঘেঁটে নিপ্পনের দ্বীপগুলো সৃষ্টি করেছিলেন, তাদের বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি পৃথিবীর মধ্যদিয়েই আরো গভীরতর কিছু দেখে, কখনো খুব সূক্ষ্মভাবে সৃষ্ট মর্মস্পর্শী চিত্রকর্ম দেখলে যা অনুভব করে, এটি তা প্রকাশ করে। সাধারণত পৃথিবীর প্রতি এর ভালোবাসা উদ্যাপনের জন্যে এর যা দরকার সেটি হচ্ছে হাইকুর মাত্র তিনটি পঙক্তি।
গ্রীষ্মে একটি নদী অতিক্রম করছি
কত সুখকর,
হাতে স্যান্ডেলগুলো নিয়ে!
১৭. ধর্ম যখন ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছিল
মানব-ইতিহাসে ধর্ম বহু উদ্দেশ্যপূরণে সহযোগিতা করেছে। আধুনিক বিজ্ঞান সৃষ্টিরহস্য ব্যাখ্যা করার আগে, ধর্মীয় স্বপ্নদ্রষ্টারা তাদের ব্যাখ্যাগুলো প্রস্তাব করেছিলেন, তার কয়েকটি আমরা ইতিমধ্যে খানিকটা আলোচনা করেছি। কিন্তু কীভাবে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল সেটি ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা ছাড়াও, ধর্ম ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে কেন’ এটি যেভাবে আছে সেভাবে সংগঠিত হয়েছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, মানুষ কেন এই গ্রহের প্রাধান্য বিস্তারকারী প্রজাতি এবং এটি নিয়ে যা খুশি তারা তাই করেছে, বাইবেল তাদের বলেছে, এর কারণ হচ্ছে ঈশ্বরই এই সবকিছু ঠিক এভাবেই সাজিয়েছেন। ঈশ্বরই আমাদের এই পৃথিবীর দায়িত্বে স্থাপন করেছেন এবং এটি জয় আর নিয়ন্ত্রণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছে কেন চামড়ার রঙের নানা মাত্রার ওপর ভিত্তি করে মানবতাকে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভাজিত করা হয়েছে, হিন্দুশাস্ত্র উত্তর দিয়েছে, এই মহাবিশ্বের নেপথ্যে বিরাজমান বুদ্ধিমত্তা একটি উদ্দেশ্যে সবকিছুই এভাবে সাজিয়েছেন। এটি হচ্ছে কার্মা।
এই উত্তরগুলো পরিস্থিতি আসলে কেমন শুধুমাত্র সেটি বলছে না, এছাড়াও আমাদের এইসব কিছু মেনে নিতেও নির্দেশ দিয়েছে। পৃথিবী যেভাবে সংগঠিত, সেটি যথার্থ দাবি করে সেখানে এটি স্বর্গীয় অনুমোদনের সিলমোহরও বসিয়ে দিয়েছে : এভাবেই স্বয়ং ঈশ্বরই সব পরিকল্পনা করেছেন। আর সে-কারণেই এই জীবনে তাদের ভাগ্যকে মেনে নিতে মানুষকে প্ররোচিত করতে ধর্ম খুবই দক্ষ, সেই ভাগ্যটি যতই দুর্বিষহ হোক না কেন, বিশেষ করে যখন এটি তাদের এই জন্মের পরবর্তী জন্মে, অথবা পরবর্তী জন্মেরও পরবর্তী জন্মে, আরো উত্তম কোনো জীবন পাবার আশা দেয়।
এবং এছাড়াও সমাজের আরোপিত নিয়মনীতিগুলো যেন মানুষ মেনে নেয়, সেটি নিশ্চিত করতেও ধর্ম দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আপনি যদি চান সবাই পরস্পরের সাথে সৌহাদ্যপূর্ণ সংহতির সাথে বসবাস করবেন, তাহলে তাদের একগুচ্ছ রীতিনীতি আর আচার থাকতে হবে, যা তারা সবাই মেনে চলবেন– একটি নৈতিকতা’। মিথ্যা কথা না বলা, চুরি না করা, হত্যা না করা। এইসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে যে-কোনো বুদ্ধিমান সমাজ নিজেকে রক্ষা করে।
