ভারতের বহু সৃষ্টিপুরাণ আছে। এদের একটি দাবি করে যে, সময় অস্তিত্বশীল আর পৃথিবী সৃষ্টি হবার আগে একটি বিশাল সত্তা ছিল, যার নাম পুরুষ, যিনি বিস্ফোরিত হয়েছিলেন এবং চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া এর উপাদানগুলো দিয়েই সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি হিন্দু জাতপ্রথার সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও।
আব্রাহামের জন্মস্থান, মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা বলতেন, একেবারে শুরুতে দুটি বিশালাকৃতির দানব ছিল, ‘আপসু বা মিষ্টি পানি আর ‘টিয়ামাট’ বা লবণাক্ত পানি। তারা পরস্পরের সাথে মিলিত হয়েছিল এবং অন্য দেবতাদের আর সমুদ্র দানবদের জন্ম দিয়েছিল। এবং যেভাবে মাঝে মাঝে সাগর শুষ্ক সমতল এলাকা প্লাবিত করে, নারীসঙ্গী টিয়ামাটও সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। তার নিজের পরিবারই তার বিরোধিতা করে এবং তাকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিল। তারা তার মৃতদেহকে দ্বিখণ্ডিত করে স্বর্গ আর পৃথিবী সৃষ্টি করে। স্বর্গ নির্মিত হয়েছিল দেবতাদের বাসস্থান হিসাবে। আর তাদের সেবা করার জন্যেই মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং নিচে পৃথিবীতে দেবতারা তাদের সেই ভূত্যদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
মিশরে একই ধরনের কাহিনি আছে, যেখানে আবারও পানির গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা আছে। একেবারে শুরুতেই ছিল শুধুমাত্র সাগর। তারপর, যখন এই মহাপ্লাবনের নিমজ্জন ক্রমশ সরে যেতে শুরু করেছিল, একটি পাহাড় পানির উপরে জেগে উঠেছিল। একটি বর্ণনায় বলা হচ্ছে, তখন সূর্যদেবতা ‘রা’, সেই দৃশ্যে এসে অন্য দেবতাদের এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। আরেকটি সংস্করণে পৃথিবীর দেবতা পিটাহ, যিনি প্রথমে এসেছিলেন, এবং সবকিছুর সূচনা করেছিলেন।
আমরা যদি উত্তরে স্ক্যানডিনেভিয়ার দিকে যাই, সেই একই পানির কাহিনি পাব। একেবারে শুরুতেই ছিল শূন্যতার একটি অতল গহ্বর। এটি পানি দিয়ে পূর্ণ। হয়েছিল, তারপর পানি জমে বরফে রূপান্তরিত হয়েছিল। তারপর আবার এটি গলতে শুরু করেছিল, আর গলিত পানি থেকে একটি বিশাল দানব ইমিয়ারের আবির্ভাব হয়েছিল। তারপর তার বগল থেকে একজোড়া নারী ও পুরুষ বেরিয়ে এসেছিলেন। যখন এইসব ঘটনা ঘটছিল, একটি গরু বরফ স্তর চেটে খুব পাতলা করে দেবার কারণে আরো একটি দানব সেখান থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিল। এই দানব থেকেই দেবতা ওডিনের জন্ম হয়েছিল। এইসব দেবতাদের পেশাগত জীবনে সাধারণত যা হয়ে থাকে, প্রচুর যুদ্ধ আর হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ওডিন ও তার ভাই ইমিয়ারকে হত্যা করে তার শরীর থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেছিল। তার মাথার খুলি দিয়ে স্বর্গ এবং রক্ত থেকে সাগর সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর তার শরীরর হাড়গুলো হয়েছিল পাহাড়, চুল থেকে সৃষ্টি হয়েছিল গাছ। ইত্যাদি আরো নানা খুঁটিনাটি বিষয় আছে, কিন্তু আপনি মোটামুটি বুঝতে পারছেন। আমি কী বলতে চাইছি।
এইসব দাঙ্গাহাঙ্গামার গল্প থেকে ইহুদি বাইবেলের সৃষ্টিকাহিনির দিকে তাকালে আমরা খানিকটা স্বস্তি অনুভব করতে পারি, এটির সূচনা কমন এরা শুরু হবার ৯০০ বছর আগের কোনো একটি সময়। জেনেসিসের দুটি সংস্করণ আছে, প্রতিটি খুব দৃঢ়ভাবে একেশ্বরবাদী, এবং দুটিতেই সমুদ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জেনেসিসে বর্ণিত সেই ‘দ্য ডিপ’, যা নিয়ে ঈশ্বর খুব উৎকণ্ঠিত চিন্তায় মগ্ন ছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি এই কাজটি করেছিলেন ছয়দিনে এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সপ্তম দিনে কিছু না করাও ছিল তার জন্যে একটি সৃজনশীল কাজ, যা সবার জন্যে সাবাথকে একটি ছুটির দিন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
জাপানের এই কাহিনিটি এসেছে জেনেসিসের সমসাময়িক সময় থেকে এবং আবারো সাগর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একেবারে শুরুতে ছিল শুধু সমুদ্র। তারপর দেবতা ইজানাগি এবং দেবী ইজানামি তাদের দীর্ঘ বর্শা দিয়ে সাগরের নিচে কাদা মন্থন করেছিলেন এবং সেই কাদা থেকেই জাপানের বহুসংখ্যক দ্বীপগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। এই স্বর্গীয় দম্পতি তিন সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন : সূর্যের দেবী, তার দুই ভাই, চাঁদ দেবতা আর ঝড়ের দেবতা। সূর্যদেবীর নিজেরও সন্তান হয়েছিল, তার নাতি নিপ্পনের প্রথম সম্রাট হয়েছিলেন।
কিছুক্ষণের জন্য এই গল্পগুলো নিয়ে ভাবা যুক্তিযুক্ত হতে পারে, কারণ ধর্ম কীভাবে কাজ করে সেটি বুঝতে এই গল্পগুলো আমাদের সহায়তা করে। এগুলো সত্য, নাকি মিথ্যা? এটি নির্ভর করবে এই গল্পগুলোর উদ্দেশ্য কী সেটি নিয়ে আপনি কী ভাবেন তার ওপর। নবী নাথান রাজা ডেভিডকে যে-গল্পটা বলেছিলেন, সেটি কি মনে আছে? সেটি কি সত্য, নাকি মিথ্যা ছিল? বাস্তবিক তথ্যবিচারে সেটি মিথ্যা একটি গল্প ছিল। কোনো ধনী ব্যক্তি ছিলেন না, যিনি কিনা গরিব সেই অসহায় ব্যক্তির ভেড়াটি চুরি করেছিলেন। কিন্তু নৈতিকতার অর্থে এটি সত্য। গল্পটি উদ্ভাবন করা হয়েছে ডেভিডকে তার অপকর্মটি সম্বন্ধে ভাবাতে, এবং এটি কাজ করেছিল। এর শৈল্পিক সত্যতা আছে, বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই। বিজ্ঞান বাস্তব তথ্য বা ফ্যাক্ট নিয়ে আগ্রহী, যেভাবে কোনোকিছু কাজ করে। শিল্পকলার আগ্রহ হচ্ছে নিজেদের জীবনে সেই সত্যটাকে আমাদের কাছে অনাবৃত করে তোলা। আর সে কারণে কোনো কাহিনি আপনাকে কাঁদাতে পারে, যখন আপনি এটিকে নিজের অভিজ্ঞতার সমরূপ হিসাবে শনাক্ত করতে পারবেন : এটাই তো আমি! ধর্ম একটি শিল্পকলা, এটি বিজ্ঞান নয়।
