.
‘কীভাবে আমি শান্তি পেতে পারি, আর এইসব কামনাগুলোকে দমন করতে পারি? আমাকে শেখাও। আমাকে বলল, কীভাবে পবিত্র বইগুলো আমার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছে এবং কীভাবে আমি এখান থেকে মুক্তি পেতে পারি?
‘বাহির…ভিতর….বাহির…ভিতর’।
‘কী’?
‘স্থির হয়ে বসুন, খুব স্থির… আপনার শ্বাসপ্রশ্বাস লক্ষ করুন : শ্বাস বাহিরে ফেলুন, ভেতরে নেন, আবার শ্বাস বাহিরে ফেলুন, আবার ভিতরে নেন…’।
আমি আমার সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি আর আপনি আমাকে শ্বাস নেবার অনুশীলন শেখাচ্ছেন! আমার অন্যকিছু দরকার, যা দিয়ে আমার মনটাকে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব…
বেশ, ঠিক আছে, এই ডেইজি ফুলটির দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকুন, ভালো করে লক্ষ করুন…।
কী?
.
জৈন বৌদ্ধবাদে তাওবাদের কৌতুকপ্রবণতা আছে, এবং যে সংস্কৃতিগুলোতে যুক্তিবাদের প্রাধান্য খুব বেশি, তারা সেখান থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে।
বৌদ্ধবাদ থেকে তৃতীয় যে-ধারাটির উদ্ভব হয়েছিল সেটি গভীর একটি প্রভাব ফেলেছিল পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় একটি দেশের ওপর। তান্ত্রিক বৌদ্ধবাদ (বজ্রযান), বোধি অর্জন করার এই ধারাটি ব্যাপকভাবে একজন শিক্ষকের সহায়তা নিবেদন করে এবং এই ধরনের বৌদ্ধবাদ তার শিকড় গেড়েছিল তিব্বতে। হিমালয়ের অন্যপ্রান্তে, চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত তিব্বত পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম একটি এলাকা। এটিকে বলা হয় পৃথিবীর ছাদ, কারণ দেশটি মূলত সুবিশাল পর্বতমালা আর মালভূমির উপর অবস্থিত। এর এই দুর্গম্য এমন একটি বৌদ্ধবাদকে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা এই পুরো দেশটিকে রূপান্তরিত করেছিল একটি বিশাল সন্ন্যাস-আশ্রমে। শিক্ষক সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে, যারা পরিচিত ‘লামা’ নামে, তিব্বত এমন একটি জাতিতে পরিণত হয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিল বৌদ্ধবাদের আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলাগুলো।
এবং তিব্বতের লামারা বৌদ্ধবাদের একটি বিশেষ ধারার স্বতন্ত্র আর বৈশিষ্ট্যসূচক ব্যবহার করেছিলেন। যখন কোনো একজন সন্ন্যাসী বোধি অর্জন করেন, তিনি তার নির্বাণ পাবার সেই সুযোগটি বিনিময় করতে পারেন, এবং অন্যদেরকে তাদের মোক্ষলাভে সহায়তা করতে ‘জীবন্ত বুদ্ধ’ হিসাবে পৃথিবীতে আবার ফিরে আসতে পারেন। তিব্বতের বৌদ্ধধারায় কিছু উচ্চপর্যায়ের লামাদেরকে তাদের নিজেদের পুনর্জন্ম নির্বাচন করার জন্যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই মানুষটি, যাকে তারা তাদের উত্তরসূরি হিসাবে নির্বাচন করবেন, তাকে খুঁজে বের করতে হবে। লামার মৃত্যুর পর তার বদলি কাউকে খুঁজে পেতে কখনো বেশ কয়েক বছর ব্যয় করতে হয়। যখন শনাক্ত করার পর, তিনি বেশ কিছুসংখ্যক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তাকে লামার পুর্নজন্ম নেওয়া রূপ হিসাবে কোনো একটি সন্ন্যাসাশ্রমে প্রতিস্থাপিত করা হয়। এই উত্তরাধিকারের ধারার সবচেয়ে পরিচিত বর্তমানের দালাই লামার ঘটনাটি। যার হাসিমুখ পশ্চিমে এখন খুব পরিচিত রূপ পেয়েছে, যিনি পঞ্চাশের দশকে চীনাদের তিব্বত আগ্রাসনের পর সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি প্রথম দালাই লামার তেরোতম পুনর্জন্ম এবং হয়তোবা শেষ। এর মানে এই না যে, তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের অবসান হয়েছে। ধর্মের নানা উপায় আছে, এর নির্যাতনকারীদের চেয়েও বেশিদিন টিকে থাকার। এটি হচ্ছে কামারের নেহাই, যা বহু হাতুড়ির ক্ষয়ের কারণ হয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধবাদ থেমে থাকেনি, যখন এটি চীনে প্রবেশ করেছিল। এটি আরো পূর্বদিকে এর যাত্রা অব্যাহত রেখেছে যতক্ষণ-না এটি জাপানে পৌঁছেছিল, যেখানে এটি আমাদের আলোচনার পরবর্তী ধর্মটির সাক্ষাৎ পেয়েছিল, সেই ধর্মটি হচ্ছে ‘শিন্টো’।
১৬. কাদা মন্থন
যখন আগের অধ্যায়ে তিব্বত নিয়ে আমি আলোচনা করছিলাম, তখন এটিকে দূরবর্তী আর দুর্গম দেশ হিসাবে বর্ণনা করেছিলাম। আমি অসতর্কভাবেই কথাটা বলেছিলাম। অন্ধ মানুষ আর হাতিদের সেই নীতিগর্ভ গল্পটি, পৃথিবীটাকে আমরা যেভাবে দেখি, সেটি তেমনই, এমন কিছু অনুমান করে নেবার ব্যাপারে আমাদের। সতর্ক করে দিয়েছিল। আমার কাছে তিব্বত বহু দূরবর্তী হতে পারে। কোনো তিব্বতীয়দের এটি তাদের মাতৃভূমি, এবং তাদের জন্যে স্কটল্যান্ড বহু দূরের একটি দেশ। জাপান নিয়ে আমি প্রায় সেই একই ভুলটি করতে যাচ্ছিলাম। এটি চীন থেকে বহুদূরে, সাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। এমনকি চীনের অধিবাসীরা, তাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী, ৬০০ খ্রিস্টাব্দের আগে এই। দেশে পা রাখেনি। সুতরাং জাপান বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, এমন কিছু ভাবতে আমরা প্রলুব্ধ হতে পারি। তাহলে কেন আমরা ভাবছি না, বাকি পৃথিবীটাই বরং জাপান থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল? বহু দীর্ঘ সময় ধরেই জাপানের অধিবাসীদের জানা ছিল না যে, একটি পৃথিবী আছে যেখান থেকে তাদের দেশটি বিচ্ছিন্ন। তারা ভেবেছিলেন জাপানটাই হচ্ছে সম্পূর্ণ পৃথিবী। শুধুমাত্র জাপান তাদের দেশই নয়, জাপান তাদের ধর্মও ছিল। এবং তারা তাদের দেশটিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সুতরাং জাপানের ধর্ম বোঝার আগে, তাদের স্বদেশ সম্বন্ধে জাপানিদের অনুভূতিটি কেমন সেটি আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে।
‘জাপান’ শব্দটির মধ্যেই এই রহস্যটির সমাধানের খানিকটা ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই নামটি এসেছে দেশটিকে চীনারা যে নাম দিয়েছিল, সেই নামটি উচ্চারণ করার ইউরোপীয় প্রচেষ্টা থেকে। স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের দেশটিকে ‘নিপ্পন’নামেই ডাকেন, যার অর্থ, উদিত সূর্যের দেশ, যে বর্ণনাটি যথার্থ। পূর্বদিকে তাকালে প্রশান্ত মহাসাগরে ঝলমলে শূন্যতাই প্রথমে তাদের চোখে পড়ত, যেখান থেকে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, এই দ্বীপপুঞ্জের ৬৮৫২টি দ্বীপে এর সোনালি আলো ঢেলে দিতে। সুতরাং আদৌ বিস্ময়কর নয়, নিপ্পনবাসীদের সৃষ্টিকাহিনিতে সূর্যের প্রধান একটি ভূমিকা ছিল। প্রতিটি ধর্মেরই একটি সৃষ্টিতত্ত্বের কাহিনি আছে, যেগুলো পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, কীভাবে এটি এর অস্তিত্ব পেয়েছে, সেই বিষয়ে নিজস্ব একটি সংস্করণ প্রস্তাব করেছে। জাপানের আলোচনায় আবার ফিরে আসার আগে, সেই সৃষ্টিতত্ত্বের কাহিনিগুলোর কয়েকটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার এখন সময় হয়েছে।
