কনফুসিয়াসের ব্যতিক্রম, সার্বিকভাবে সমাজের মঙ্গল কামনায় যিনি মানুষের প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন, লাওৎ সে সমাজের মধ্যে প্রতিটি মানুষকে যতটা সম্ভব ততটাই স্বাধীনতা দিতে চেয়েছিলেন। জীবনের প্রতি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গি, আবারও ইন এবং ইয়াং, প্রত্যেকটিরই কিছু আছে এর সমর্থনে বলার জন্যে। কিন্তু যেহেতু তারা ইতিহাসের সেরা সংগঠক আর কদাচিৎ তারা বিশ্রাম নেন, লিগালিস্টরাই সাধারণত ধর্ম আর সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করেন, এবং অন্যদের ওপর তাদের ইচ্ছাগুলো চাপিয়ে দিতে থাকেন। এবং যদি তাদের প্রয়োজন হয় সেটি করার জন্যে তারা এমনকি যুদ্ধ শুরু করতেও প্রস্তুত থাকেন। লাওৎ সে ঘুদ্ধ ঘৃণা করতেন, মানব সংহতি যা ধ্বংস করে। হয়তো যদি মানুষ তার কথা শুনত, তাহলে পৃথিবীতে যুদ্ধ কম হতো আর জীবন আরো উপভোগ্য হতো।
সুস্পষ্টভাবে এর ধর্মীয় ধারণাগুলো গ্রহণ না করেও তাওবাদ থেকে আপনি অনেক কিছু শিখতে পারবেন, কিন্তু আমাদের ভুল হবে যদি আমরা এর ধর্মীয় ধারণাগুলোর অস্তিত্ব উপেক্ষা করি। ৫২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লাওৎ সে’র মৃত্যুর পরেও তাওবাদের বিকাশ অব্যাহত ছিল। আর তাও শেখানো ছাড়াও তাওবাদে বহু দেবতারা ছিলেন। এর সবচেয়ে প্রধান দেবতারা, যাদের স্বর্গীয় গণ্যমান্য বলা হয়, বিশ্বাস করা হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাদের সৃষ্টি হয়েছিল যখন পৃথিবী অস্তিত্বশীল হয়েছিল। এইসব প্রধান দেবতাদের রাজসভা বসে স্বর্গে, তাদের সাহায্য করার জন্যে আছে অপেক্ষাকৃত নিম্নমর্যাদার দেবতাদের দিয়ে তৈরি গৃহস্থালী কর্মচারীরা। মহাবিশ্বের সাথে আসা দেবতারা ছাড়াও, মানুষও দেবতা বা ‘অমর’ হতে পারে। অমরত্বের এই মর্যাদা পেতে হলে প্রথমে তাদের ভেতর থেকে সব ত্রুটি বের করে দিতে হবে ধ্যান আর কামনা প্রশমনের নিয়মমাফিক অনুশীলন করে, পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া বুদ্ধের কঠোর অনুশীলনের মতো। পার্থক্যটি হচ্ছে তাওবাদীরা মহাবিশ্বে বিশ্বাস করেন, তাদের জন্যে আত্মার বিজয় মানে নির্বাণের মহাসাগরের উপর এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়, বরং দেবতা হিসাবে ব্যক্তিগত অমরত্ব লাভ করা। আরেকটি বৈশিষ্ট্য যা তাওবাদকে অন্যসব ধর্ম থেকে পৃথক করেছে সেটি হচ্ছে এটি নারীদের অবস্থান দিয়েছে। দেবীসহ, তাওবাদের নারী যাজক এবং বিদ্বান ছিলেন, যারা এর বিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এর প্রস্তাবিত দর্শনের প্রতি সততা প্রদর্শন করে তাওবাদ টিকে আছে ‘ইন’-এর রমণীয় এবং ইয়াং’-এর পৌরুষের মূলনীতির দ্বারা।
কনফুসিয়াসের মতাদর্শ আর তাওবাদ দুটোই চীনের স্থানীয়, কিন্তু তৃতীয় ধর্মটি, বৌদ্ধধর্ম, এটি ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছিল। বুনো অশ্বখগাছের নিচে বুদ্ধের বোধিলাভের সেই মুহূর্ত থেকে তার শিক্ষা প্রচারিত হতে শুরু করেছিল তর বিস্তার লাভ করেছিল ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, কোরিয়া, জাপান ও আরো অনেক দেশে। যখন এর পরিধিতে এটি বিস্তৃত হয়েছিল, একই সাথে এটি বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হতেও শুরু করেছিল বুদ্ধের বাণীর প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যাগুলোর সূত্র অনুসরণ করে। থেরাভাদা বৌদ্ধবাদ-এর মূল আন্দোলনের কঠোরতার প্রতি আনুগত্য ধরে রেখেছে এখনো। এই ধারায়, মোক্ষলাভের সবচেয়ে দ্রুততম পথ হচ্ছে সন্ন্যাসী হওয়া। এটি পরিচিত হীনযান বৌদ্ধবাদ নামে। এটি আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদের বোধিসত্ত্ব লাভের লক্ষ্যে ছোটা রেসিং গাড়ির মতো। মহায়না (মহাযান) বৌদ্ধবাদ হচ্ছে বাসের মতো, সাধারণ মানুষদের জন্যে, বোধিসত্ত্ব অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে যারা তাদের নিজস্ব গতিতে অগ্রসর হন।
আর এই দুটি ধারার মধ্যে দ্রুততাই শুধুমাত্র পার্থক্য নয়। আমরা ইতিমধ্যে লক্ষ করেছিলাম, ধর্মে একটি মহাবিভাজন হচ্ছে সেই দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে, যারা ছবি বা মূর্তি ভালোবাসেন এবং যারা সেটি ঘৃণা করেন। বুদ্ধ স্বয়ং সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কিন্তু লোকপ্রিয় ধর্মগুলো ভালোবাসে কোনোকিছুর দিকে শ্রদ্ধা নিয়ে তাকাতে আর বৌদ্ধদের জন্যে স্বয়ং বুদ্ধ ছাড়া আর কী ছবি মূর্তিই বা থাকতে পারে তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্যে? বুদ্ধের মূর্তিগুলো, প্রায়শই বিস্ময়করভাবেই সুন্দর, মহায়নাধারার অনুসারীদের মন্দিরে প্রধান মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর বৌদ্ধধর্মের এই রূপটিই ‘সিল্ক রোড’ ধরে চীনে প্রবেশ করেছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে। এটি চীনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং চীনা ধর্মগুলোকে পরিবর্তিত করেছিল। এবং সেইসাথে এগুলোর প্রভাবে এটি নিজেও পরিবর্তিত হয়েছিল।
ধর্মের প্রতি চীনারা তাদের ব্যবহারিক প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গিটি অব্যাহত রেখেছিল। ভিন্নধারাগুলোর সেরা অংশগুলোর সংমিশ্রণ নিয়ে তারা কোনো অস্বস্তি বোধ করেনি। এভাবে তারা একটি একক বিশ্বাসের প্রতি কঠোরভাবে আনুগত্য প্রকাশেও কোনো বাড়াবাড়ি করেনি। সুতরাং যখন বৌদ্ধবাদের সাথে তাওবাদের দেখা হয়েছিল, আর সেই সাক্ষাতে উভয়েই পরিবর্তিত হয়েছিল। একটি পরিণতি হচ্ছে ‘জেন বৌদ্ধবাদ, ‘জেন’ শব্দটির উৎস ধ্যান বা মেডিটেশন বোঝাতে ব্যবহৃত চীনা শব্দটি। মনে আছে, তাও বোঝা বা পাওয়া কত কঠিন একটি কাজ? ‘জেন’ এর সেই ঠাট্টাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিটি ঋণ করেছিল।
