সুতরাং আপনার জীবনের সেই সময়গুলো স্মরণ করা এখানে মূল্যবান প্রমাণিত হতে পারে, যখন কোনো একটি কাজ কঠোর পরিশ্রমের সাথে করার কারণেই সেই কাজটি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু যখনই সেটি করার চেষ্টায় হাল ছেড়ে দেবেন, এটি তখনই সম্ভব হয়ে ওঠে। একটি ভালো উদাহরণ হচ্ছে, সুইমিংপুলের সেই মুহূর্তটি, যখন প্রথমবারের মতো আপনি সাঁতার কাটতে শুরু করেছিলেন। অথবা কোনো গ্রীষ্মের বিকালে, যখন আপনি ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন, আসলেই আপনি রাস্তা দিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে ভারসাম্য হচ্ছে মুখ্য বিষয়। শুধুমাত্র তারাই, যাদের ইতোমধ্যেই এটি আছে, আসলেই জানেন এটি কী। আমরা হয়তো এটিকে বলতে পারি তাও অব সাইক্লিং’। তাওবাদ কামনা করে, যেভাবে আমরা বাঁচি আর সবকিছুর সাথে সম্পর্কিত থাকি, সেখানে যেন আমরা সেই ভারসাম্যটি খুঁজে পাই, আর এটি শুধুমাত্র অন্য মানুষের সাথেই না, পুরো মহাবিশ্বের সাথে।
আর জীবনের প্রতি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের নেপথ্যের ব্যক্তিটি ছিলেন কনফুসিয়াসের চেয়ে বয়সে খানিকটা বড় সমসাময়িক একজন, যার নাম লাওজি অথবা লাওৎ সে। কমন এরা শুরু হবার ৬০০ বছর আগের (খ্রিস্টপূর্বাব্দ) আশেপাশে কোনো একটি সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে তিনি চীন সম্রাটদের কোনো একজনের লাইব্রেরিতে কাজ করতেন। জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিটি কী, সেটি ব্যাখ্যা করতে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি ধর্ম আর দর্শনের ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত আর শ্রদ্ধেয় বইটি লিখেছিলেন, যার নাম লাওৎ সু (বুক অব দ্য ওয়ে’)।
এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো হচ্ছে ভারসাম্য’ আর ‘সম্পূরকতা। লাওৎ সে দেখেছিলেন প্রকৃতি, সবকিছুরই এর সম্পূরক একটি বিপরীত আছে। তিনি এইসব পরস্পরের বিপরীতদের নাম দিয়েছিলেন, ইয়াং’ এবং ‘ইন’। প্রতিটি ইনের সম্পূরক ইয়াং আছে এবং প্রতি ইয়াং-এর তেমন-এর পরিপূরক ইন আছে। এই পার্থক্যটিকে স্পষ্ট করতে, তাও মতাদর্শের অনুসারীরা একটি বৃত্ত এঁকে সেটিকে সমান দুটি অংশে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন একটি বক্ররেখা এর মধ্যে দিয়ে এঁকে। একটি সাদা, অপরটি কালো। এবং প্রতিটি স্বতন্ত্র অর্ধাংশ একটি বিন্দু ধারণ করে যা এর বিপরীত, কালো বিন্দু সাদা অর্ধাংশে এবং সাদা বিন্দু কালো অর্ধাংশে। এটি অন্যদের মাঝে আমাদের নিজেদের খুঁজে পেতে উপদেশ দেয়, কালোর মধ্যে সাদা আর সাদার মধ্যে কালো, পৌরুষে রমণীয়তা আর রমণীয়তায় পৌরুষ; শত্রুর মধ্যে বন্ধু আর বন্ধুর মধ্যে শক্র, আমার ধর্ম আপনার ধর্মের মধ্যে, আপনার ধর্ম আমার ধর্মের মধ্যে; এটি কনফুসিয়াসের ধারণাগুলোর সাথে খুব একটা ভিন্ন নয়, এটি যখন আমাদেরকে অন্যদের জায়গায় কল্পনা করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু লাওৎ সে এখানে একটি আনন্দপূর্ণ নিজস্ব স্পর্শ রেখে গেছেন। তিনি চাননি যে আমরা শুধুমাত্র বৈচিত্র্য সহ্য করি, তিনি চেয়েছিলেন আমরা যেন এই বৈচিত্র্য উপভোগ করি। এই পৃথিবী হচ্ছে একটি বিশাল অর্কেস্ট্রা, যেখানে শত শত ভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র সম্মিলিতভাবে সুন্দর সংগীত সৃষ্টি করছে। ভারসাম্য, সময় আর ঐক্যতান, এই সবকিছুই তাও-এর চিহ্ন।
লাওৎ সে লক্ষ করেছিলেন, আরেকটি উপায়ে মানুষ তাদের ভারসাম্য হারায় সেটি হচ্ছে, যখন তারা অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন বোধ করে। নিজস্ব ছন্দে বাঁচতে না দিয়ে তারা সারাক্ষণই তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করে। আর এর সবচেয়ে চূড়ান্ত একটি উদাহরণ হচ্ছে সেই মানুষটি, যার কাছে তার নিজের উপায়টি হচ্ছে সবকিছু করার জন্যে একমাত্র শ্রেষ্ঠ উপায়; ডিশওয়াশারে বাসন। ঢোকানোর উপায় থেকে দেশ পরিচালনা অবধি। এই ধরনের মানুষগুলো সারাক্ষণই বিরক্তির মধ্যে থাকেন, কারণ বাস্তবতা সেই বিশেষ নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণ করে না, যে-নিয়মটি তারা এর ওপর জোর করে আরোপ করতে চান। লাওৎ সে তাদের বলেছিলেন, উদ্বিগ্ন না হয়ে শরীর আর মন শিথিল আর দুশ্চিন্তামুক্ত করতে, এবং একটি গাছের জীবন থেকে কিছু শিখতে। গাছকে কারো বলতে হয় না, কীভাবে কোন কাজ করতে হবে। এটি এর প্রকৃতিকেই অনুসরণ করে। তাহলে মানুষরা কেন সেই একই কাজ করতে পারছে না। এত উৎকণ্ঠিত হওয়া থেকে কেন তারা নিজেদের থামাতে পারছে না, আর সবকিছুকে তাদের নিজস্ব গতিতে চলতে দিচ্ছে না? লাওৎ সে জীবনের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে বলেছিলেন ‘উ-ওয়ে’, ‘কিছু করা–কোনোকিছু না করে’, সবকিছুকে তাদের মতো থাকতে দিয়ে, সবকিছুকে তাদের নিজস্ব গতিতে ঘটতে দিয়ে। তিনি সব নিয়মকানুন অপছন্দ করতেন এবং যেভাবে অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণকামী কোনো সংগঠক সবাইকে জীবন-চক্রে তাদের নিজস্ব বিন্দুতে নিয়ে আসেন, তাদের ভিন্নতাকে উদযাপন করার বদলে।
জীবনের প্রতি এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন এমন কেউ হচ্ছেন একজন অ্যানার্কিস্ট (নৈরাজ্যবাদী), আরেকটি গ্রিকশব্দ যার অর্থ, যে সরকারের বিরুদ্ধে। তাওবাদীদের জন্য এটি চূড়ান্তভাবে সরকারের বিরোধিতা নয়, এটি মূলত সরকারের ভারসাম্য আর ক্ষমতার সমন্বয় দেখতে চায়। সমাজে আইনপ্রণেতাদের প্রাধান্যবিস্তারকারী ভূমিকার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া, এবং তাদের সেই উপায়গুলোকে অপছন্দ করা, যার মাধ্যমে তারা সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তুলতে চান। অ্যানার্কিস্টের বিপরীত হচ্ছে ‘লিগালিস্ট’, এমন কেউ যিনি বিশ্বাস করেন, মানবপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে আইন। কোনোকিছু সমাজের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? বেশ, সেটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। সবসময় লিগালিস্টদের এটাই স্লোগান।
