কিন্তু এই প্রশ্নগুলো কনফুসিয়াসের মতাদর্শের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটির মূলত ঘনীভূত মানবসমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে, কীভাবে আমরা এই পৃথিবীতে আমাদের জীবন ব্যবস্থাপনা করতে পারি, অনাগত জীবনের জন্যে পুণ্য সঞ্চয়। কিংবা শাস্তি এড়াতে, পাপ এড়িয়ে বাঁচার উপরে নয়। জীবনে ভালোভাবে বাঁচতে হবে শুধুমাত্র এই জীবনের খাতিরেই, মরার পরে আমাদের সাথে কী হতে পারে তার একটি ভূমিকা হিসাবে নয়।
তবে কনফুসিয়াসের মতাদর্শটির একটি দিক আছে, যা এটিকে ধর্মীয় জগতের বলয়ে নিয়ে এসেছিল : মৃত্যুর প্রতি এর দৃষ্টিভঙ্গি এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি এটির গভীর শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের আচার। কিন্তু এই দিকটিকেও সেই দর্শনের সম্প্রসারিত একটি রূপ হিসাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে, যে-দর্শনটি সমাজের পরস্পর সংযুক্ত সদস্য হিসাবে মানুষকে বিবেচনা করে। এমনি মৃত্যুও আমাদের সেই সম্পর্ককে ছিন্ন করতে পারে না। সেকারণে কনফুসীয় সমাজে মৃতদের জন্যে বেশ তীব্রভাবেই শোক অনুভব করা হয় এবং তাদের স্মৃতি নিরন্তরভাবে লালন করা হয়। একটি মৃত্যুর পর শোকপর্বটি এর স্থায়িত্বে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মৃতের সন্তানের জন্যে এটি দুই বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে, যে-সময়ে তারা কোনো কাজ করেন না, যৌনমিলন করেন না, সাধারণতম খাওয়া ছাড়া আর কোনোকিছু খাওয়া, ভালো কোনো কাপড় পরেন না বা সাধারণভাবে জীবনকে উপভোগ করেন না।
কিন্তু কনফুসিয়াস মনে করতেন, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা আর তাদের। মৃত্যুপরবর্তী শোক প্রকাশ করা ছাড়াও আরো অনেক কিছু করার আছে। মৃতের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়নি। ঠিক তেমন আমরা তাদের সাথে কোনো সংযোগও হারায়নি। তারা হয়তো জীবনের এই দৃশ্য ত্যাগ করেছেন এবং জীবনের অন্যপ্রান্তে কোথাও চলে গেছেন কিন্তু আমাদের জীবনে তাদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি তারা ধরে রাখেন। চোখের আড়ালে তারা আছেন, এর মানে এই না যে, তারা আমাদের মনের আড়ালেও আছেন। আর সে-কারণে একটি জনপ্রিয় কনফুসীয় বসন্তকালীন ছুটি হচ্ছে ‘ক্লিয়ার অ্যান্ড ব্রাইট ফেস্টিভাল’, যখন পরিবারের জীবিত সদস্যরা তাদের পূর্বসূরিদের সমাধিতে যান তাদের সাথে সংযোগ করতে, পরস্পরের সান্নিধ্য আবার উপভোগ করতে। শিষ্টাচার আর সবার জন্যে শ্রদ্ধা, এমনকি যদি তারা মৃতও হয়ে থাকেন, ছিল কনফুসিয়াসের মতাদর্শটির একটি স্বাতন্ত্র বিধায়ক বৈশিষ্ট্য (কিংমিঙ্গ অথবা চিং মিং ফেস্টিভাল, এছাড়াও এটি পরিচিত ইংরেজিতে টম্ব-সুইপিং ডে বা কবর পরিষ্কার করার দিন, কখনো চাইনিজ মেমোরিয়াল ডে অথবা অ্যানসেস্টর ডে)।
কিন্তু চীনে কখনো এই মতাদর্শটি শুধুমাত্র এককভাবে এর পূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারেনি। এটি জীবনের প্রতি পারস্পরিক প্রতিস্থাপনযোগ্য তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির একটি ছিল। অপর দুটি ছিল, তাওইজম এবং বুদ্ধধর্ম। পরের অধ্যায়ে আমরা তাওবাদ নিয়ে আলোচনা করব এবং বৌদ্ধধর্মের দিকে আবার একবার আমরা নজর দেব জানতে, কী হয়েছিল এই ধর্মটির সাথে, যখন প্রথম শতাব্দীতে এটি অবশেষে চীনে পৌঁছেছিল।
১৫. সবচেয়ে ভালো উপায়
কনফুসিয়াসের মতবাদ হয়তো বুঝতে সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু এটি বেশ গুরুতর একটি বিষয় ছিল। খুব একটা আনন্দ করার কিছু সেখানে ছিল না। আরেকটি চীনা মতাদর্শ, তাওইজম বা তাওবাদের (ডাওইজম) ক্ষেত্রে এটি ঠিক এর উল্টো। তাওবাদ বুঝতে আপনাকে বেশ সংগ্রাম করতে হবে কিন্তু একবার যখন আপনি বুঝতে পারবেন, এটি বেশ উপভোগ্য মনে হবে। অন্য ধর্মের ঋষিদের মত, তাও’ মতাদর্শ যারা উদ্ভাবন করেছিলেন, তারা কিছু একটা খুঁজে পেয়েছিলেন, আর তারা সেটি কোথায় খুঁজে পেয়েছিলেন সেই বিষয়টি তাদের স্বতন্ত্র করেছিল। হিন্দু ঋষিরা দেখেছিলেন, পৃথিবী আর সেখানে আমাদের জীবন হচ্ছে একটি বিভ্রম বা মায়া, আর মুক্তি পেতে সেই মায়াটিকে আমাদের মন থেকে দূর করতে হবে। ইহুদি নবীরা দেখেছিলেন, ঈশ্বর এই পৃথিবীর সবকিছুরই ইতি টানবেন একদিন, এবং এর বাসিন্দাদের পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব থাকাকালীন কৃতকর্মের জন্যে বিচার করবেন। কারণ এই দুটি ধর্মের জন্যে পৃথিবী এবং সেখানে মানুষের অবস্থানটি ছিল একটি সমস্যা, আর সেই সমস্যাটিকে সমাধান করতে হবে। এবং তারা এই পৃথিবীর বাইরে গিয়েছিলেন এর উত্তর খুঁজতে।
তাওবাদীরা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন। তাদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা পৃথিবীর দিকে তাকিয়েছিলেন। আর তারা যা কিছু দেখেছিলেন সেটাই ভালোবেসেছিলেন। এই মহাবিশ্বের সংঘটন, সংহতি আর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, যেভাবে এটি একত্রে সবকিছু ধারণ করে আছে, তাদের আলোড়িত করেছিল। অবশ্যই এর মানব-অংশটি ছাড়া! কারণ শুধুমাত্র মানুষই এই মহাবিশ্বের সাথে একীভূত বা সমকালীন হয়ে নেই, কারণ আত্মসচেতন মন মানুষকে প্রাকৃতিক সব ছন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আর প্রকৃতির সাথে এই সংহতি এবং এর ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন কাটানোর প্রক্রিয়াটির পুনরুদ্ধার করার মধ্যেই আছে প্রকৃত শান্তি। কিন্তু বিষয়টি তারা যেভাবে প্রকাশ করেছিলেন, সেটি অনুসরণ করা অনেকের জন্যেই বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। মানুষকে মহাবিশ্বের তাও’ অনুসারে বাঁচার জন্যে তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু এই ‘তাও কী, সেটি তারা ব্যাখ্যা করেননি। এটি আরো বেশি জটিল হয়ে উঠেছিল যখন তারা অন্যদের বলেছিলেন, তারা তাও’ শিখতে পারবেন না, যদি-না তারা ইতিমধ্যেই জানেন তাও’ আসলে কী। এবং বিষয়টি আরো কঠিন হয়ে ওঠে, যখন তারা বলেছিলেন, যারা জানেন তাও’ কী, তারা সেই বিষয়ে কোনোকিছু উচ্চারণ করেন না, এবং যারা এটি নিয়ে কথা বলেন তারা তাও’ কী সেটি আসলেই জানেন না। এটি পড়ে তাও’ আসলে কী, সেটি বুঝতে আপনি সম্ভবত গভীর চিন্তায় পড়ে গেছেন। যে-কোনো যৌক্তিক মানুষের মতো আপনি কোননা বিষয়ের ব্যাখ্যা চান। বিষয়টি সম্বন্ধে আপনি একটি স্বচ্ছ ধারণা পেতে চান। আপনার মন সেটাই দাবি করে। তবে তাওবাদীরা দয়ালু হাসি হেসে এবং কোনোকিছু না বলে শুধুমাত্র আপনার বিরক্তিটাই বাড়িয়ে দেবে!
