কনফুসিয়াসের ভাবনা ছিল ভিন্ন। তিনি যুদ্ধবাজ রাজাদের বলেছিলেন, শুধুমাত্র জনগণের কল্যাণ করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আর সেটি অর্জন করতে হলে তাদের সেই ধরনের মন্ত্রীদের নির্বাচন করতে হবে, যারা নৈতিকতায় শিক্ষিত এবং সহিংসতা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই দ্বন্দ্ব নিরসনে দক্ষ। নেতারা তার কথা শুনেছিলেন এবং কনফুসিয়াসের প্রজ্ঞাকে সম্মান করেছিলেন, তার ভাবনাগুলোকে নীরবে সমর্থন করে। কিন্তু কেউই তার ধারণাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কনফুসিয়াসের যেমন প্রজ্ঞা ছিল, তেমনি ছিল ধৈর্য। তিনি তার বাকি জীবনটি তার অনুসারীদের কাছে ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করে ব্যয় করেছিলেন, এবং তিনি আশা করেছিলেন, একজন প্রকৃতভাবে শিক্ষিত শাসক এই সবকিছুই একদিন ব্যবহারিক স্তরে প্রয়োগ করবেন। তিনি ৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মারা যান। কিন্তু তার অনুসারীরা তার শিক্ষাকে বই হিসাবে সংকলিত করেছিলেন, সুতরাং তার ধারণাগুলো টিকে ছিল। আর সেই ধারণাগুলোর সময়ও একদিন এসেছিল। কমন এরা শুরু হবার ১০০ আগে একজন সম্রাটের আবির্ভাব হয়েছিল, যিনি এই ধারণাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন, এবং সেগুলোই চীনের প্রধান দর্শন ছিল, ১৯১২ সালে সাম্রাজ্যপ্রথার চূড়ান্ত বিলুপ্ত হবার আগ অবধি। এমনকি বর্তমানের চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে কনফুসিয়াসের মূলনীতিগুলোর শক্তিশালী একটি অবস্থান আছে।
কনফুসিয়াসের মূল ধারণাটি ছিল কর্কশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের বিরুদ্ধে অথবা একক স্বার্থপর মানুষগুলোর বিরুদ্ধে, যারা সমাজ ও এর বিধিনিষেধগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কনফুসিয়াস শিখিয়েছিলেন, জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমরা বহু সম্পর্কের জালে আটকে থাকি, আর আমরা এই সম্পর্কগুলো ছাড়া বেঁচে থাকতে অক্ষম। সমাজের জন্যে যা ভালো সেটি একক ব্যক্তির জন্যে ভালো। এমনকি কখনো এর অর্থ হচ্ছে, কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে অস্বীকার করা। জীবন সম্বন্ধসূচক, সমাজ হচ্ছে একটি শরীর, আমরা প্রত্যেকেই এর সদস্য-অঙ্গ। একক কোনো অঙ্গ টিকে থাকতে পারে না, যদি শরীর থেকে সেটি পৃথক হয়ে যায়।
এবং সহমর্মিতা হচ্ছে সেই আঠা, যা সবাইকে একসাথে যুক্ত করে রাখে। এই সহমর্মিতা মানে হচ্ছে ‘একত্রে দুঃখভোগ করা’। সহমর্মীরা অন্যদের অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন, তাদের নিজেদের অনুভূতি অনুসরণ এবং তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করে। কনফুসিয়াসের কাছ থেকেই। আমরা সেই অভিব্যক্তিটি, যা পরিচিত ‘গোল্ডেন রুল’ নামে, তার প্রাচীনতম প্রকাশটি পেয়েছিলাম। এটি ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুটি রূপেই আসতে পারে : অন্যদের সাথে ঠিক সেভাবেই আচরণ করুন, আপনি যেমন চান অন্যরা আপনার সাথে করুক; অথবা অন্যদের সাথে এমন কিছু করবেন না যা আপনি চাইবেন না কেউ আপনার সাথে করুক।
অন্যদের প্রতি সহমর্মিতা আর সহানুভূতির সেই প্রাণশক্তির ধারণাটি বোঝাতে কনফুসিয়াস যে-শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন সেটি ছিল ‘রেন। চীনাদের প্রয়োগবাদী মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তত্ত্ব হিসাবে রেনকে বোঝার চেষ্টা না করে বরং এটি কর্মে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। আপনি যদি অন্য কারো জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বিসর্জন দেন, আপনি তাহলে ‘রেন অনুশীলন করছেন। আপনি কোনো ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট কিনতে দোকানে যাচ্ছেন, যা কেনার জন্যে আপনি বহু মাস ধরে সঞ্চয় করেছেন, এবং আপনি সেটি না-কিনে একজন শরণার্থী ব্যক্তিকে তা দান করে দিলেন, তখন আপনি ‘রেন’ অনুশীলন করছেন। ‘রেন’ হচ্ছে সবচেয়ে মহৎ আচরণ, যা কিনা কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব হতে পারে। এটি হচ্ছে নিজের আগে অন্যকে গুরুত্ব দেওয়া। এবং এই ‘রেন’ প্রাণশক্তিটি কনফুসিয়াস রাজনীতিবিদ আর নেতাদের মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তারা যেন নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয় বরং জনগণের কল্যাণ কীভাবে হবে সেই বিষয়ের ওপর সর্বাগ্রে মনোযোগ দেন। এবং তিনি আশা করেছিলেন যে, সাধারণ নাগরিকরা সেই একই উদারতার প্রাণশক্তির উদাহরণ অনুসরণ করবেন, যখন তারা কোনো নেতাকে বিচার করবেন, যিনি খুব কঠিন সময়ে রাজ্য শাসন করার জন্যে সংগ্রাম করছেন।
পারস্পরিক ভিন্নমত বা বিতর্ক আর সংঘর্ষ ব্যবস্থাপনায় কনফুসিয়াসের দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় প্রতিপক্ষকে কীভাবে ধৈর্য আর সহমর্মিতার সাথে বিবেচনা করতে হয়। একারণে, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে, এটি একটি সুনির্দিষ্ট শৈলীর শিষ্টাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট। শিষ্টাচার আর ধৈর্য হচ্ছে এমন মনের পরিচয়, যা মানব সম্পর্কগুলোর জটিলতা এবং সেটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা বিষয়ে সচেতন। পাশ্চাত্যের ব্যস্ত মন অপেক্ষা আজও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় শিষ্টাচার অনেক বেশি উপস্থিত ধৈর্যশীল কোনো প্রাচ্য মনে।
কিন্তু কনফুসিয়াসের এই শিক্ষাগুলোকে কি একটি ধর্মের চেয়ে বরং একটি দর্শন হিসাবেই বোঝার জন্যে উত্তম ছিল না? এই দুটি শব্দের মধ্যে পার্থক্য সংজ্ঞায়িত করলে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের সুবিধা হবে। ‘ফিলোসফি’, আরো একটি গ্রিক-শব্দ, এর মানে হচ্ছে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা, এর সব সম্ভাব্য রূপে। এবং যে-রূপটি নৈতিক দর্শন হিসাবে জানি, সেটি এই পৃথিবীতে বাস করার সেরা আর প্রাজ্ঞতম উপায় কী হতে পারে সেটি অধ্যয়ন করে। অন্যদিকে ধর্ম মূলত আগ্রহী এই পৃথিবীর ওপারে যে-জগৎ আছে সেই বিষয়ে, এবং আমাদের জন্যে এটি কেমন হবে, যখন আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে।
