কিন্তু ধর্ম নিয়ে চীনের অধিবাসীদের নিজস্ব কিছু ভাবনাও ছিল, আর সেটি বর্ণনা করার সবচেয়ে প্রায়োগিক আর ব্যবহারিক শব্দ হচ্ছে ‘প্রাথম্যাটিক’, আরেকটি গ্রিকশব্দ যার সুস্পষ্ট একটি অর্থ আছে। এটি এসেছে সেই শব্দ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে কোনো কর্ম বা কাজ, এখান থেকে ইংরেজি ‘প্র্যাকটিকাল’ শব্দটি এসেছে। এর অর্থ প্রায়োগিক আচরণ, তত্ত্ব নয়, এর বিপরীত এটি অনুশীলন, সেই কাজটি করা, সঠিক বিশ্বাস করার চেয়ে এখানে গুরুত্বপূর্ণ সঠিক কাজ করা।
এমনকি চীনের আদি বহুঈশ্বরবাদও ছিল ব্যবহারিক এবং বাস্তবতাপূর্ণ একটি জীবনাচরণের সূত্র। প্রকৃতির শক্তিগুলো কিংবা আবহাওয়ার খামখেয়ালিগুলো চীনে দেবতাদের প্রতিনিধিত্ব করত। এবং তাদের আচার-অনুষ্ঠানে চীনারা তাদের দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করতেন, অনুকূল পরিস্থিতি দিয়ে যেন তারা আশীর্বাদ করেন, এবং যা-কিছু তাদের ক্ষতি করতে পারে সেগুলো যেন তারা জীবন থেকে নির্মূল করেন। তাদের সবচেয়ে বড় দেবতা, স্বর্গের দেবতাদের যিনি দেবতা, বৃষ্টি পাঠাতেন, যা শস্যক্ষেতে পানি সরবরাহ করে এবং যা তাদের জীবনধারণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। কিন্তু যখন বৃষ্টি হতো, তখন বন্যাও হয়। বন্যার জন্যে যে দেবতা দায়ী, তিনি ছিলেন ‘গং গং’। আর যেখানে মাঝে মাঝে বন্যা হয় সেখানে অনাবৃষ্টিও হয়। বা ছিলেন এই অনাবৃষ্টির দেবতা। আর মানুষের কাছে খাদ্যের চেয়ে আর কী এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা তাদের বাঁচতে সহায়তা করত? মিলেট বা জওয়ারের দেবতা ‘হু জি’, যা ক্ষেতের শস্যবহনকারী ঘাসের গুরুত্ব ইঙ্গিত করত তাদের জীবনে।
এইসব শক্তিগুলোকে একটি ভারসাম্যে ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি করাই বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহারিক একটি কাজ। ধর্ম কোনো একটি মতবাদের ওপর বিশ্বাস করার বিষয় ছিল না বরং কিছু করার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এইসব শক্তিগুলোকে ব্যবস্থাপনা করার জন্যে এটি যথেষ্ট বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন একটি উপায় ছিল, যেন সেই শক্তিগুলো মানবসমাজের জন্য ভালো কিছু দিতে পারে।
প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী এই দেবতাদের ব্যবস্থাপনা করা ছাড়াও, চীনারা একগুচ্ছ দুষ্ট আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন, যাদের তারা এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করতেন : ড্রাগন, দৈত্য, পরী, ভ্যাম্পায়ার, নোম, গবলিন ইত্যাদি। আর এইসব দুষ্ট আত্মাগুলোকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবার জন্যে তারা মূলত আতশবাজি আবিষ্কার করেছিলেন, আজও চীনদেশের মানুষরা চোখ-ধাঁধানো আতশবাজি পোড়ানোর প্রদর্শনী দেখতে ভালোবাসেন।
এইসব অতিপ্রাকৃত শক্তিদের মোকাবেলা করার জন্যে চীনাদের হয়তো তাদের নিজস্ব ব্যবহারিক উপায় ছিল, কিন্তু সেই বহুঈশ্বরবাদে খুব অল্পকিছুই মৌলিক ছিল। তাদের ঈশ্বরগুলো মানবজাতির গভীর ইতিহাসের সাধারণ কল্পনারই অংশ ছিল, সেই মনগুলো যাদের একসময় কল্পনা করেছিল যে, মন অদ্ভুত বিস্ময়ে এই মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়েছিল, যেখানে তারা নিজেদের আবিষ্কার করেছিল। কমন এরা শুরু হবার পরে, পঞ্চম আর ষষ্ঠ শতাব্দীতে এসে আমরা জীবনের প্রতি চীনাদের এই ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে একটি নতুন স্পষ্টতা আর দিকনির্দেশনা অর্জন করতে দেখি। যে-সময়ে বৌদ্ধ আর জৈনরা ভারতীয় ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করছিলেন এবং ব্যাবিলনে ইহুদি নির্বাসিতরা তাদের ঈশ্বরের প্রকৃতি নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিলেন, তখন চীনের চিন্তাবিদদের মধ্যে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মেজাজ লক্ষ করতে পারি। বর্তমানের এই পৃথিবীর সমস্যা সমাধানে চীনের প্রাজ্ঞ এই ঋষিরা তাদের সৃজনশীল মন ব্যবহার করেছিলেন। যে জীবনটি আসছে সেই মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে তারা ভাবেননি। এইসব চিন্তাবিদদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটিকে আমরা এখন কনফুসিয়াস নামে চিনি।
কনফুসিয়াস নামটি হচ্ছে কং ফুজি বা মাস্টার বা দার্শনিক কং নামটির নতুন একটি সংস্করণ। এই কং ফুজি নামটি দেওয়া হয়েছিলে কং কিউ নামের একজন চিন্তাশীল কর্মকর্তাকে, যিনি সেই সময়ে চীনকে বহুবিভক্ত করা রাজ্যগুলোর কোনো একটি রাজ্যে সরকারি চাকরি করতেন। তার জীবন সম্বন্ধে খুব সামান্য কিছু আমাদের জানা আছে। কিন্তু তার লেখায় আমরা একজন প্রাজ্ঞ আর উদারমনা ব্যক্তির সাক্ষাৎ পাই, মৃত্যুর বহুদিন পরেও যিনি তার সর্বোচ্চ প্রভাব বজায় রেখেছেন। তার জন্ম হয়েছিল চীনের খুব বিশৃঙ্খল একটি সময়ে, কমন এরা শুরু হবার ৫৫১ বছর আগে। যখন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যগুলোর রাজারা পরস্পরের সাথে বিরতিহীন যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর চিন্তাবিদ আর রাজনীতিবিদরা যেমন এই সময়ে মানবতাকে সমস্যায় রাখা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সংগ্রাম করেন, তাদের সময়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাও চীনের সমস্যা থেকে উত্তরণে বেশকিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। আর যে-সমাধানগুলো তারা প্রস্তাব করেছিলেন সেগুলো আমাদের সময়ের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আমরা যা শুনি তার থেকে খুব-একটা ভিন্ন। কিছু নয়। সহিংসতার জবার দাও সহিংসতা দিয়ে, আগুনের উত্তর আগুন। শত্রুরা আমাদের যতটা তীব্রভাবে আঘাত করে, তার চেয়ে আরো তীব্রভাবে তাদের প্রতি আক্রমণ করো। আরো বড় বন্দুক আর প্রাণঘাতী বোমা বানাও। এবং কঠোর সাহসী নেতাদের খুঁজে বের করো, যারা খারাপ লোকগুলোকে শায়েস্তা করতে পারেন। পুরো ইতিহাস জুড়েই, রাজনৈতিক কৌশলগুলো সাধারণত পড়তে সাম্প্রতিক সময়ের হলিউড ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মতোই মনে হবে।
